মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষাকে কর্মমুখী করার উদ্যোগ|315630|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষাকে কর্মমুখী করার উদ্যোগ
আশরাফুল ইসলাম রানা

মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষাকে কর্মমুখী করার উদ্যোগ

মুখস্থ করার সংস্কৃতি থেকে বের করে নিয়ে এসে হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ও সুনাগরিক গড়ে তোলাই প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের জীবনাচরণই বদলে যাবে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য, কর্মমুখী ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক আগামী জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নাগরিক গড়ে তোলা। প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক সরকারের নতুন উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক এ অধ্যাপক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে বলে এসেছি, প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থী বানানো হয়েছে। সৃজনশীলতার নামে সৃজনহীন করা হয়েছে। আবার যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয় সেটা শুধু নম্বরনির্ভর। অর্থাৎ শিক্ষার যে আসল উদ্দেশ্যে জ্ঞানমুখী, কর্মমুখী ও মানবিকবোধসম্পন্ন স্বনির্ভর মানুষ হওয়া সেটি এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। এখন নতুন যে পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে তার সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, ভালো। তবে এর জন্য শুধু কাঠামোগত উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। বড় আকারের পরিবর্তন আসায় এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে। ফলে শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকেই এ কাঠামোর জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।’

গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা অনুমোদন দেন। এরপর শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নতুন ব্যবস্থায় এসএসসির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ে যে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের প্রচলন রয়েছে সেটিও থাকছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। বর্তমানে ১৪টি বিষয় পড়তে হয়। ফলে কমে যাচ্ছে পরীক্ষায় পাসের নম্বর। এছাড়া নতুন ব্যবস্থায় আরও বড় যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। দশম শ্রেণির কারিকুলামে হবে এসএসসি পরীক্ষা। এ নীতিমালা ২০২৩ থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে। ২০২৫ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন শেষ করা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

কী থাকছে নতুন শিক্ষাক্রমে

প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা তৈরি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নিয়েছে। বেসরকারি গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কেএম এনামুল হক নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। গতকাল মঙ্গলবার তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা এ চারটি বিষয়ের ওপর একজন শিক্ষার্থীর মূল বিকাশ ঘটে। ফলে এ চার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা করা হয়েছে। যার মধ্যে আবার বেশ কিছু ধারা-উপধারা আছে। মূল্যবোধের মধ্যে আছে দেশপ্রেম, সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধা ও সমতা। নৈতিকতার মধ্যে আছে সততা, কঠোর পরিশ্রম, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, উদ্যোক্তা, ইতিবাচক মনোভাব, সৃজনশীলতা, মানবিক, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল। জ্ঞানের আওতায় আছে নিয়মানুবর্তিতা, আন্তঃচিন্তার বিকাশ ও গবেষণানির্ভরতা। চতুর্থত দক্ষতার আওতায় আছে মৌলিক দক্ষতা, গণন দক্ষতা, ডিজিটাল যোগাযোগ দক্ষতা।’

এনামুল হক বলেন, ‘এ পদ্ধতি পুরোটাই হয়েছে জ্ঞানভিত্তিক হাতে-কলমে শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে। বর্তমান পদ্ধতিতে গ্রামের অসচ্ছল বাচ্চারা মানবিক বিভাগে পড়ে। আর শহরের ধনীরা পড়ে বিজ্ঞানে। এতে বড় বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। আবার বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও স্কুল-কলেজগুলোতে যথেষ্ট ল্যাব, গবেষণা যন্ত্রপাতি বা দক্ষ শিক্ষক নেই। ফলে নামমাত্র শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছে। বর্তমান পদ্ধতি শিক্ষকদের লেকচারনির্ভর। কিন্তু নতুন পদ্ধতি হবে ফ্যাসিলিটি (সুবিধা) নির্ভর। অর্থাৎ ক্লাসে সময় ব্যয়ের চেয়ে শিক্ষার্থীকে বাইরের কাজে বেশি সময় দিতে হবে। ফলে তার গুণাবলিও বাড়বে অনেক বেশি।’

প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে পার্থক্য : নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে প্রচলিত পদ্ধতির পার্থক্য কী তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন এনটিটিবির সদস্য অধ্যাপক মশিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষার্থী সেন্টিমিটার কী সেটি মুখস্থ করে। সে ক্লাসে এসে পড়া দেয় এরপর পরীক্ষায় লিখে পাস করে। কিন্তু পরবর্তী জীবনে ওই শিক্ষার্থী আর বলতে পারে না সেন্টিমিটার কী। একই বিষয়ে যুক্তরাজ্যে একজন শিক্ষার্থীকে একটি ছোট্ট চারাগাছ দেওয়া হয়। সে এটি বাড়িতে নিয়ে যায়। তাকে মাপার ফিতা দেওয়া হয়। ক্লাসে তাকে বলা হয়, গাছটি বাড়ির সুবিধাজনক জায়গায় যেখানে রোদ আছে সেখানে রাখতে। দুয়েক দিন পরপর তাকে গাছে পানি দিতে বলা হয়। এরপর দুদিন পরপর তাকে মেপে দেখতে বলা হয় গাছটি কতটুকু বেড়েছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থী সেন্টিমিটার, উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ, গাছের খাদ্য প্রক্রিয়া, প্রকৃতির প্রতি মমতা, পরিচর্যা বিষয়ে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ অনেকগুলো বিষয়ে শিক্ষা পায়। যা তার সারা জীবনে কাজে লাগে।’

এনসিটিবির একাধিক সূত্র বলছে, নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। বর্তমান কাঠামো টেক্সট বই ও মুখস্থনির্ভর। এনসিটিবি মনে করছে, বর্তমান দুনিয়ায় যে প্রযুক্তি এসেছে তাতে কাউকে কোনো তথ্য মুখস্থ করে রাখার দরকার নেই। তবে এ তথ্য কীভাবে পাওয়া যায়, কীভাবে কাজে লাগাতে হয় সেগুলো হবে নতুন পদ্ধতি। এ শিক্ষা হবে অভিজ্ঞতানির্ভর, শিক্ষার্থীকে অনেক বেশি প্রজেক্ট, অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীকে তার আচরণে বড় পরিবর্তন আনাই হবে নতুন পদ্ধতির লক্ষ্য।

অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, ‘মানুষের সচেতনতার অভাবে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন জলাবদ্ধতা একটি। যত্রতত্র প্লাস্টিক, পলিথিন ফেলে আমরা নালা বন্ধ করে ফেলছি। নতুন শিক্ষাপদ্ধতি যেহেতু কর্মকাণ্ডনির্ভর হবে সেজন্য শিক্ষার্থীরা জলাবদ্ধতার পর প্রজেক্ট করবে। তারা নিজেরা এ সমস্যার সমাধানে কাজ করবে। তখন তারাই শিক্ষক, অভিভাবকদের বোঝাবে জলাবদ্ধতার জন্য নাগরিকদের কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়।’

এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, নতুন শিক্ষাক্রমে সরকারি ছুটির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও শুক্র ও শনিবার ছুটি থাকবে। তবে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিবস, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, জাতীয় শোক দিবস এবং বিজয় দিবসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হবে। এ দিবসগুলোতে সব শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসতে হবে, কিন্তু ক্লাস হবে না। দিবসের তাৎপর্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি থাকবে, যেগুলো ধারাবাহিক মূল্যায়নে যুক্ত হবে। ২০২৩ থেকে শুরু হয়ে ২০২৫ সাল নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি আজও উপেক্ষিত : এর আগে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে তা নির্ধারণে ২০১০ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল সরকার। কিন্তু ওই শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করাসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘ সময়েও বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং শিক্ষানীতি উপেক্ষা করে জাতীয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষা নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত করার সিদ্ধান্তও বাস্তবায়িত হয়নি। আবার শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা আইন জরুরি হলেও সেটি করতে পারেনি সরকার। শুধু আইনের খসড়া নিয়েই ১০ বছর ধরে আলোচনা চলছে। সার্বিক বিষয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘সরকার শিক্ষা নিয়ে অনেক নীতি নিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে এর মাশুল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আমরা মনে করি অতীতের ভুল সংশোধনের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে শিক্ষাক্রমে বাংলাদেশকে বলিষ্ঠ করার জাতীয়তাবাদী ও আন্তর্জাতিকতা সম্পন্ন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। যাতে শিক্ষার্থী একই সঙ্গে দেশ ও আন্তর্জাতিক স্তরের জন্য তৈরি হতে পারে।’ তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কোনোভাবেই যেন এ ভালো পদ্ধতির ওপর প্রভাব বিস্তার না করতে পারে সে বিষয়ে সরকারকে অনুরোধ করেন এ প্রবীণ শিক্ষাবিদ।