ময়নাতদন্তে আটকা ৩২৫৪ মামলা!|315631|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
ময়নাতদন্তে আটকা ৩২৫৪ মামলা!
সরোয়ার আলম

ময়নাতদন্তে আটকা ৩২৫৪ মামলা!

চট্টগ্রামে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ নিপতারা। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। এক বছর পার হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পায়নি পুলিশ। ২০১৭ সালের ২৩ মে ঢাকার কাওলা এলাকায় রেললাইন থেকে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায় রেলওয়ে পুলিশ। চার বছরেও মেলেনি এই লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন।

অভিযোগ রয়েছে, সারা দেশে এ দুটির মতো অনেক লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে এসব ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, বাদী ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা বিপাকে পড়ছেন। চলতি বছরের সাত মাসে শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটনের (ডিএমপির) ৫০ থানার ৩ হাজার ২৫৪টি মামলার কার্যক্রম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অভাবে আটকা রয়েছে। বারবার তাগাদা দিয়েও প্রতিবেদন মিলছে না। ডিএমপির পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে ৪৬৬, ফেব্রুয়ারিতে ৪৭১, মার্চে ৫০৪, এপ্রিলে ৫২৮, মে মাসে ৪৭৫, জুনে ৪১৩ ও জুলাইয়ে ৩৯৭ লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে আছে। সংকট উত্তরণে আরও কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্তের সুযোগের পাশাপাশি বর্তমান ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় পর্যাপ্ত লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল (পিআরবি) অ্যাক্ট অনুযায়ী, যেকোনো ঘটনার সম্পৃক্ত লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। অথচ মাসের পর মাস পার হলেও প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না। ঢামেক মর্গে লোকবল সংকট ও লাশের বাড়তি চাপের কারণে সঠিক সময়ে প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য লাশ কম পাঠাতে গত ২৭ এপ্রিল মাসে ডিএমপি কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে ঢামেক কর্র্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমানে রাজধানীর থানা অনুয়ায়ী ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মিটফোর্ড) লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এর বাইরে ঢাকার আশপাশের জেলা থেকেও এসব মর্গে লাশ পাঠানো হয়।

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর অনেক সময় মামলার ভাগ্য নির্ধারণ হয়। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের একটি তালিকা করা হয়েছে। এতে এক মাসের বেশি আটকে রাখা ময়নাতদন্তের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গত কয়েক মাসে আরও কিছু প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী মামলার তদন্তকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঢামেক কর্র্তৃপক্ষ তাদের মর্গে রাজধানীর কোন কোন থানা থেকে লাশ পাঠানো হবে, তা জানতে ডিএমপিকে চিঠি দেয়। এরপর থানাগুলোকে নিকটবর্তী ডেডিকেটেড হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। যদিও আগে থেকেই থানাগুলোকে হাসপাতাল ভাগ করে দেওয়া রয়েছে।’

ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেবিকা রায় বলেন, ‘লোকবল সংকটের পাশাপাশি লাশের চাপ থাকায় প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়। অনেক সময় নির্ভুল ময়নাতদন্তও করা সম্ভব হয় না। আবার প্রতিবেদনকে পুঁজি করে অনেক অনৈতিক কাজের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য নির্ভুল প্রতিবেদনের জন্য লাশের চাপ কমাতে থানার বিন্যাস চেয়ে ডিএমপি কমিশনারকে আমরা চিঠি দিয়েছি। এখনো চিঠির কোনো জবাব পাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢামেকে বছরে গড়ে ৩ হাজার লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। অথচ একই সময় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১ হাজার এবং মিটফোর্ডে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। লাশ বেশির কারণে ঢামেক মর্গে জট দেখা দিয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢামেক কর্র্তৃপক্ষের চিঠির পর ডিএমপি চলতি বছরের শুরু থেকে এক মাসের বেশি সময় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে থাকা মামলার তালিকা করে। এতে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ঢাকা মেডিকেল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে ৩ হাজার ২৫৪টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আটকে রয়েছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত শেষ করলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়ায় আদালতে অভিযোগপত্র দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাধারণত অপমৃত্যু মামলা হলে সেসব লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকজন চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে জানান, ক্লাস-পরীক্ষাসহ একাডেমিক কাজের বাইরে সশরীরে লাশের ময়নাতদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এরপর বিভিন্ন মামলায় আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে হয়। জনবল সংকটে সময়মতো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষাগার ও মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে নমুনা দিতে হয়। সেখান থেকে প্রতিবেদন আসতে দেরি হয়। ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্যও অপেক্ষা বাড়ে। সব মিলিয়ে যথাসময়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয় না বলে জানান তারা।

তদন্তসংশ্নিষ্টরা বলছেন, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। এ প্রতিবেদন বিচারকাজে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বাদী-বিবাদীর ন্যায়বিচারও অনেকাংশে নির্ধারিত হয়। তবে প্রতিবেদন না পেলে মামলার তদন্তই থেমে থাকে। হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে দেরি হলেও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে সময়মতো প্রতিবেদন না পেলে অভিযোগপত্র দিতে দেরি হয়। এতে মামলাজট দেখা দেয়। কিন্তু অপমৃত্যুর ঘটনার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পেলে তদন্তই আটকে যায়। ময়নাতদন্তে অপমৃত্যু যদি হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হয়, মামলার তদন্তের মোড়ই ঘুরে যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত বা ভিসেরা প্রতিবেদন ছাড়া মামলার চার্জশিট কিংবা তা নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে হত্যা মামলার ক্ষেত্রে আসামি চিহ্নিত ও ধরা সহজ হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা অপঘাতে মৃত্যুর পর পুলিশ এসব লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্তের জন্য কর্র্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লাশ মর্গের হিমাগারে রাখে। এ সময়ের মধ্যে কোনো স্বজন মর্গে সুনির্দিষ্টভাবে লাশ শনাক্ত করলে পুলিশের সহায়তায় সেটি হস্তান্তর করা হয়। শনাক্ত না হলে নির্দিষ্ট সময় পর লাশ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম বিভিন্ন সরকারি কবরস্থানে দাফন করে।’

ঢামেকসহ কয়েকটি মর্গের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও স্বজনদের কোনো খোঁজ পাওয়া না গেলে লাশ আঞ্জুমানের মাধ্যমে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে লাশ নিয়ে আদালতের কোনো নির্দেশনা থাকলেই কেবল ওই ঘটনার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত লাশ মর্গের হিমাগারে রাখা হয়।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অপরাধ তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে আরও কিছু সরকারি হাসপাতালকে ময়নাতদন্তের সুযোগ করে দিতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে। এতে ময়নাতদন্ত জটের পাশাপাশি অনৈতিক কারবারও দূর হবে। মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।’