‘গণতন্ত্রের বদনাম করে কৌশলে স্বৈরতন্ত্র উস্কে দিচ্ছে চীন’|316480|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৮:১৮
‘গণতন্ত্রের বদনাম করে কৌশলে স্বৈরতন্ত্র উস্কে দিচ্ছে চীন’
অনলাইন ডেস্ক

‘গণতন্ত্রের বদনাম করে কৌশলে স্বৈরতন্ত্র উস্কে দিচ্ছে চীন’

চীন নিজের অর্থনৈতিক উন্নতির নজির দেখিয়ে গণতন্ত্রের বদনাম করে বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ববাদী শাসন চাপিয়ে দেওয়ার জন্য আদর্শিক প্রচারণা চালাচ্ছে। এর জন্য বেইজিং শক্তিশালী উন্নত ও উন্নয়নশীল গণতন্ত্রের দেশগুলোকে টার্গেট করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী নিউজ ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ফরেন পলিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বেইজিং তার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে চলেছে এবং একে ‘মানবজাতির জন্য উপহার’ বলে অভিহিত করছে। কমিউনিস্ট নেতারা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাফল্য হিসেবে দেখিয়ে আসছেন এবং গণতন্ত্র এমন অর্থনৈতিক উন্নতি এনে দিতে পারবে না বলে প্রচার চালাচ্ছেন।

২০১৭ সালে, ১৯তম দলীয় কংগ্রেসের সময়, শি জিনপিং জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, বেইজিংয়ের রাজনৈতিক মডেল ‘অন্যান্য দেশ ও জাতির জন্য একটি নতুন বিকল্প যারা তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করার পাশাপাশি তাদের উন্নয়নকেও গতিশীল করতে চায়’- গণতান্ত্রিকীকরণের বাহ্যিক চাপ উপেক্ষা করেই।

অনেক বৈশ্বিক নেতাও চীনা মডেলকে জনগণের কাছে জবাবদিহি না করেই অর্থনৈতিক সাফল্যের সহজ উপায় বলে মনে করছেন। চীনের শীর্ষ কর্মকর্তারা সোচ্চার হয়ে বলছেন যে, যেকোনো দেশেরই তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিজেরাই বেছে নেওয়ার ‘অধিকার’ আছে, তা গণতন্ত্র হোক বা কর্তৃত্ববাদী।

কমিউনিস্ট শাসন সারা বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এটি আগ্রাসীভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাকে প্রমোট করে এবং এটিকে গণতন্ত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে প্রচার করে। কোল্ড ওয়ারের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্য দেশে স্বৈরতান্ত্রিক নেতাদের জোর করে বসানোর যে চেষ্টা করেছে তার চেয়ে চীনের এই কৌশলী প্রচেষ্টার প্রভাব বেশি পড়বে।

গণতন্ত্রের বদনাম করার এবং স্বৈরতন্ত্র উস্কে দেওয়ার চীনের এই প্রচেষ্টাকে তিনভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমত, বেইজিং উন্নত দেশগুলোতে চীন সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর গল্প তৈরির জন্য গুরুতর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে কমিউনিস্ট শাসনের পক্ষে প্রচারণা চালাতে সহায়তা করা এবং বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে সমালোচনাকারীদের চুপ করানো বা টার্গেট করা। যারা চীনের কমিউনিস্ট শাসনের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে তাদেরকে পুরষ্কৃত করা হয় এবং সমালোচকদের শাস্তি দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিচ্ছে চীন।

২০১৯ সালে সুইডেনে চীনের রাষ্ট্রদূত স্বীকার করেছিলেন, ‘আমরা আমাদের বন্ধুদেরকে ভাল মদ দিয়ে আপ্যায়ন করি, কিন্তু আমাদের শত্রুদের জন্য রয়েছে শটগান’।

বেইজিং তার বন্ধুত্বপূর্ণ সরকারগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজারে প্রবেশ, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা এবং অন্যান্য বিভিন্ন সুবিধা দেয়। কিন্তু যেসব সরকার চীনের স্বার্থের প্রতি বিরূপ, তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়।

কমিউনিস্ট শাসন চীনা ভিন্নমতাবলম্বীদের এবং তাদের পরিবারকে হুমকি দেয়, বিদেশে চীনা শিক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণ করে, বেইজিংয়ের জন্য আক্রমণাত্মক বলে মনে করা একাডেমিক বয়ানকে থামানোর চেষ্টা করে। চীন সম্পর্কে বিদেশীদের কীভাবে শিক্ষিত করা হয় তাও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বেইজিং।

দ্বিতীয়ত, চীন উন্নয়নশীল দেশগুলির দিকে নজর রাখে। চীনকে উন্নয়নশীল বিশ্বে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানানো হচ্ছে, কারণ সেই সব দেশের শীর্ষ শাসক বা অভিজাতরা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নিতে চায়, যা চীনকে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি এনে দিয়েছে।

চীন অ-গণতান্ত্রিক শাসন মডেলের জন্য অনুপ্রেরণার চেয়েও বেশি কিছু দেয়। এমন সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং সম্পদ সরবরাহ করে যার মাধ্যমে জনমতের তোয়াক্কা না করে চীনের বন্ধুরা কোনো দেশের সরকারে টিকে থাকতে পারে। যার ফলে স্বৈর শাসকরা সুশাসনের জন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলির দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ পায় এবং সহায়তা ও বিনিয়োগের জন্য ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার যে শর্ত থাকে তার প্রতিও বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে পারে।

বেইজিং কখনও কখনও চীনের ঘনিষ্ঠ নেতাদের সমর্থন করার জন্য অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়ও সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।

চীনের এই প্রচেষ্টাগুলো গণতন্ত্র বা মতাদর্শগতভাবে ভিন্ন শাসনকে উৎখাত করার জন্য নয়। তবে যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন যাতে চীন-বান্ধব নীতি এবং বিনিয়োগের আবহাওয়া বজায় থাকে সে লক্ষ্যেই চীন এই প্রচেষ্টা চালায়।

তৃতীয়ত, চীন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি প্রবর্তন করে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও টার্গেট করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীনের স্বার্থের পক্ষে ব্যবহার করার জন্য দেশটি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় যে প্রভাব অর্জন করেছে তার ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নে বেইজিং তার কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে, যাতে নাগরিকদের দমন করার জন্য প্রযুক্তির কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যবহারকে সহজ করে এমন নীতি প্রচার করা যায়।

চীন বর্তমান গণতন্ত্রভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে তার ক্ষমতার উত্থানের অন্তরায় হিসেবে দেখে এবং একে উৎখাত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় চীনের এই উদারপন্থী কৌশল উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানেরও ক্ষতি করছে। চীনের এই প্রচেষ্টাগুলি গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি এবং নীতিশাস্ত্রের ওপর আঘাতের সমান, বর্তমানে যার ভিত্তিতে বিশ্ব চলছে।