মার্কিন ড্রোন হামলায় মারা গেছে ‘বিরল প্রতিভা’র সেই আফগান মেয়েটি|316490|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২০:১৩
মার্কিন ড্রোন হামলায় মারা গেছে ‘বিরল প্রতিভা’র সেই আফগান মেয়েটি
অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন ড্রোন হামলায় মারা গেছে ‘বিরল প্রতিভা’র সেই আফগান মেয়েটি

বামে মালাইকা, ডানে সুমাইয়া

গত ২৬ আগস্টের কাবুল বিমানবন্দরের ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করা আইএস-খোরাসান গ্রুপের ওপর ২৯ আগস্ট এক ড্রোন হামলা চালিয়ে কয়েকজন আইএস জঙ্গিকে হত্যার দাবি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায় আইএস সদস্য নয়, ওই ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে ৭ শিশুসহ ১০ আফগান সাধারণ নাগরিক। অথচ নিহত ওই পরবারের লোকেরা এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার হয়ে কাজ করেছে।

ওই হামলায় নিহতদের মধ্যে মালাইকা ও সুমাইয়া নামে ২ বছর বয়সী দুটি মেয়ে সহ ৭ জনই ছিল শিশু। আর সুমাইয়াকে তার পরিবার খুবই বিরল প্রতিভার অধিকারী বলে মনে করত।

নিহত ২ বছরের শিশু মালাইকার বাবা এমাল আহমাদি জানান, তার মেয়ে মালাইকা এবং পরিবারের আরও দুটি ছোট্ট শিশুর সঙ্গে তার ভাগ্নি আরভিন (৭) এবং বেনিয়ামিন (৬) এবং তার চাচাতো ভাই জেমারি আহমাদি ও তিন ছেলে ফারজাদ (১৩), জমির (২০) এবং ফয়সাল (১৬) ওই হামলায় নিহত হয়েছেন। সুমাইয়া জেমারি আহমাদির অতি আদরের ছোট্ট মেয়েটি ছিল।

বিস্ফোরণে নিহত তার ২ বছর বয়সী ভাতিজি সুমাইয়াকে স্মরণ করে এমাল আহমাদির আরেক চাচাত ভাই রামিন ইউসুফ বলেন, ‘আমার বাবা বলেছিলেন, সুমাইয়া ভবিষ্যতে খুবই নামকরা প্রতিভাবান নারী হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমরা আমাদের পরিবার থেকে এই ছোট্ট প্রতিভাকে হারিয়ে ফেললাম’।

তালেবানদের কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে আফগান বাহিনীতে সামরিক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন রামিন ইউসুফ। এই হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবার আসলে তাদের প্রিয়জনদের ফিরে পেতে চায়।

ইউসুফ বলেন, ‘এক মিনিটের মধ্যে আমরা সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি’।

কিন্তু, ‘ক্ষমা করা ছাড়া আমাদের কোনও বিকল্পও নেই’।

তিনি আরও বলেন, তার পরিবার আশঙ্কা করছে যে, নিজেদের অবস্থা নিয়ে কথা বলার পর তালেবানরা তাদেরকে টার্গেট করতে পারে। ফলে তারা আর কাবুলে থাকতে চান না।

ইউসুফ এবং আহমাদি উভয়েই বলেন যে, যদি সুযোগ দেওয়া হয় তবে তারা তাদের পরিবারকে ধ্বংসের জন্য দায়ী দেশ যুক্তরাষ্ট্রেই আশ্রয় নিতে চাইবেন।

ইউসুফ বলেন, এই পরিস্থিতিতে আমাদের আর কোনো উপায় নেই।

প্রথমে তিনি বলেছিলেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের সরাসরি তার পরিবারকে ফোন করা উচিত এবং ‘হামলায় নিহত প্রত্যেক সন্তানের মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে’।

এই হামলায় নিহত আহমাদির চাচাতো ভাই জেমারি আহমাদি, আমেরিকাভিত্তিক অলাভজনক সংস্থায় একজন সহায়তা কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মার্কিন ওই সংস্থা আফগানিস্তানে অপুষ্টি মোকাবেলায় কাজ করছিল। হামলার দিন জেমারি মাত্র কাজ থেকে ফিরে এসেছিলেন। তাকে দেখে তার ১৩ বছর বয়সী ছোট ছেলে ফারজাদ দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিল।

ফারজাদ সম্প্রতি গাড়ি চালানো শিখেছিল এবং তার বাবার গাড়িটি পার্ক করতে সাহায্য করতে চেয়েছিল। আর তখনই গাড়িটির ওপর মার্কিন ড্রোন আঘাত হানে এবং পরিবারের আটজন সদস্যসহ বাবা ও ছেলেকে হত্যা করে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি তদন্তে দেখা গেছে যে, ড্রোন হামলার দিন জেমারি আহমাদির দৈনন্দিন কিছু কাজ-কর্মের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন মার্কিন সামরিক গোয়েন্দারা। পানির ক্যানিস্টারগুলোকে তারা বিস্ফোরক ভেবে ভুল করেছিলেন। যার জেরে জেমারি ও তার পরিবারের ওপর ড্রোন হামলা চালানো হল।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করা সাবেক আফগান সেনা কর্মকর্তা আহমেদ নাসেরও নিহত হয়েছেন ওই হামলায়।

রামিন ইউসুফ জানান, মাত্র কয়েক দিন পরই জেমারির মেয়েকে বিয়ে করতেন ওই সাবেক আফগান সেনা কর্মকর্তা আহমেদ নাসের। রামিন ইউসুফ জানান, পরিবারটি সেই সপ্তাহেই একটি ছোট বিবাহ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছিল।

নাসের আশাবাদী ছিলেন যে, তিনি কাবুল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া শেষ উদ্ধার ফ্লাইটগুলোর কোনো একটিতে করে তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে পারবেন।

জেমারি আহমাদির পরিবার জোর দিয়ে বলছিল, জেমারি সন্ত্রাসী নন, একজন ভাল মানুষ, যিনি আমেরিকার প্রতি কোনো অসৎ ইচ্ছা বা বিদ্বেষ পোষণ করতেন না।

তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাদেনা ভিত্তিক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘নিউট্রিশন অ্যান্ড এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’ এর টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন।

এখন, জেমারির পরিচয় স্পষ্ট হওয়ার পর, আহমাদি পরিবার বলছে যে তারা ক্ষতিপূরণ পেতে চায়।

ড্রোন হামলা এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের দখল উভয় ঘটনার প্রেক্ষিতে তাদের জীবনের পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে ইউসুফ বলেন, ‘আমরা (আমাদের) সরকার, চাকরি, শিক্ষা, অর্থ, আমাদের পরিবারের সদস্যদের এবং আমাদের (আরামদায়ক) জীবন হারিয়েছি। মাঝে মাঝে মনে হয় যে, আমি হয়তো ঘুমের মধ্যে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছি’।