‘তালেবান শাসনে নিরাপত্তা আছে কিন্তু টাকা নেই’|316495|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২১:০৭
‘তালেবান শাসনে নিরাপত্তা আছে কিন্তু টাকা নেই’
অনলাইন ডেস্ক

‘তালেবান শাসনে নিরাপত্তা আছে কিন্তু টাকা নেই’

উত্তর আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফের বলখ এয়ারফিল্ডে নামছে একটি রুশ নির্মিত এমআই-১৭ হেলিকপ্টার। তালেবান যোদ্ধারা বেশ উৎফুল্ল ভঙ্গীতে সেটির ছবি তুলছেন।

হেলিকপ্টারটির আরোহীদের মধ্যে আছেন উর্ধ্বতন তালেবান কর্মকর্তারা। তবে ককপিটে চালকের আসনে বসে আছেন তাদের সাবেক শত্রু, আফগান বিমান বাহিনীর পাইলট।

মৌলভী আবদুল্লাহ মনসুর হচ্ছেন এই এয়ারফিল্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত তালেবান অধিনায়ক। এয়ারফিল্ডে তার অধীনে এখন যেসব বিমান এবং সামরিক সাজ-সরঞ্জাম, তিনি সেগুলো আমাকে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাহিনী আফগানিস্তানের সাবেক সরকারকে এগুলো উপহার দিয়েছিল। এর মধ্যে আছে যুদ্ধ বিমান, আছে হামলা চালানোর মতো সামরিক হেলিকপ্টার।

আফগানিস্তানের সাবেক সরকারের আমলে এসব বিমান এবং হেলিকপ্টার দিয়েই তালেবানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হতো। কিন্তু এখন যুদ্ধ যেহেতু শেষ, তাই এগুলো এখন কী কাজে ব্যবহৃত হবে, তা স্পষ্ট নয়।

‘তবে ভবিষ্যতে যদি দরকার হয়, এগুলো আমাদের হাতে আছে’, বলছেন আবদুল্লাহ মনসুর।

গত অগাস্ট মাসের বিজয়ের আগে তালেবান যখন আফগানিস্তান জুড়ে তাদের অগ্রাভিযান অব্যাহত রেখেছিল, তখন আফগান বিমান বাহিনীর কয়েক ডজন পাইলট তাদের প্রাণের ভয়ে বিমান নিয়ে পালিয়েছিল। তবে অনেকেই আফগানিস্তানে থেকে গিয়েছিল। এখন তারা তালেবান নেতৃত্বের অধীনেই কাজ করছে। তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আমি মৌলভী মনসুরের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, যে শত্রুর বিরুদ্ধে তিনি একসময় লড়াই করেছেন, এখন তার সঙ্গেই কাজ করতে তার কেমন লাগছে।

‘আমাদের মনে সবসময় এই বিশ্বাস ছিল যে জয় আমাদের হবেই এবং আমরা আমাদের দেশকে মুক্ত করবো’, বলছেন তিনি।

‘কিন্তু আমরা এটাও জানতাম যে একদিন সকালে আমাদের এক সঙ্গে বসতে হবে এবং এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ তারাও তো আমাদের দেশেরই মানুষ’।

মৌলভী মনসুরের পাশে বসে আছেন হেলিকপ্টার পাইলট গুল রহমান। তিনি আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন বেশ সতর্কতার সঙ্গে।

গুল রহমান বলছেন, যখন তিনি তালেবানের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা শুনলেন, তখন আর কাজে ফিরতে তার ভয় করেনি।

‘এটা যে ঘটবে, তা অবশ্যম্ভাবী ছিল’, বলছেন তিনি।

‘আমাদের কখনোই মনে হয়নি চিরকাল আমাদের এরকম আলাদা পথে চলতে হবে.. আমরা রাজনীতিটা রাজনীতিকদের কাছেই ছেড়ে দিতে চাই এবং আমাদের দেশের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে চাই’।

তরুণ তালেবান যোদ্ধারা এয়ারফিল্ডের হ্যাঙ্গারের আশে-পাশে জটলা করছিল। তারা কৌতুহলের সঙ্গে দেখছিল দুটি এমডি-৫৩০ হেলিকপ্টার।

একজন তালেব যখন এক মেকানিককে তার যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করছিল, তখন সেখানে একটা চাপা উত্তেজনা টের পাওয়া গেল।

অভিযোগের সুরে এই তালেব বলছিল, ‘তুমি এই চাকুরি পেয়েছো তোমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং যোগাযোগের কারণে, তোমার যোগ্যতার কারণে নয়’।

তবে এরকম কথাবার্তা সত্ত্বেও সেখানে একটা সৌহার্দের পরিবেশই আছে বলে মনে হলো।

তবে আফগানিস্তানের পুরোনো শাসনামল থেকে নতুন শাসনামলে উত্তরণের ব্যাপারটি সব জায়গায় এত মসৃণভাবে ঘটছে না। দেশটি এখন অর্থনৈতিক সংকটের মুখে। তাদের বিদেশি মূদ্রার রিজার্ভ জব্দ করে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কীভাবে তালেবানকে বাদ দিয়ে আফগানদের সাহায্য করা যায়।

আফগানিস্তানে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর সামনে লম্বা লাইন। দেশের বিভিন্ন শহরে এখন পুরোনো জিনিসপত্রের বাজার গড়ে উঠেছে। সেখানে আফগানরা মরিয়া হয়ে সংসারের পুরোনো জিনিসপত্র বিক্রি করছে, যাতে অন্তত খাদ্য কেনার টাকা পাওয়া যায়।

শাগুফতা নামের এক নারী রাস্তার ধারে বসে ছিলেন। ঘর থেকে বিক্রির জন্য আনা পুরোনো কাপড়-চোপড় হাতড়াচ্ছিলেন।

অশ্রুসজল চোখে তিনি আমাকে বললেন, ‘এখন বেঁচে থাকাটাই যেন একধরণের অপমান, আমরা ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি’।

শাগুফতার শরীর বেশ দুর্বল, কারণ সকালে তিনি নাস্তা পর্যন্ত করেননি। আগের রাতেও কোন খাবার জোটেনি।

‘খাবার যা ছিল, তা বাচ্চাদের দিয়েছি। এখন আমি তাদের ভালো কাপড়-চোপড়গুলোও বিক্রি করে দিচ্ছি, কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে ওরা যেসব পোশাক পরে যেত.. যদি ভালো দাম পাই তাহলে সেই টাকা দিয়ে তেল, চাল এবং আটা কিনবো,’ বলছেন তিনি।

শাগুফতার গল্প আফগানিস্তানে যে গভীর বৈষম্য, সেটাকেই যেন তুলে ধরছে।

ছয় বছর আগে তার স্বামী আফগানিস্তানের পুলিশ বাহিনী থেকে অবসরে যায়। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে তারা সরকারের কাছ থেকে বলতে গেলে কোন পেনশনই পায়নি। শাগুফতা তার পাড়ায় কাপড় ধোয়া এবং কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন, সেটা দিয়েই কষ্ট করে তাদের সংসার চলতো। কিন্তু আর্থিক সংকট বাড়তে থাকায় সেই কাজও আর সেরকম পাওয়া যাচ্ছে না।

‘ইসলামিক আমিরাত ভালো, কারণ এখন চুরি-চামারি বন্ধ, কোন অপরাধ আর ঘটছে না’, বলছেন তিনি।

‘কিন্তু আমাদের সমস্যা একটাই। আমাদের কোন কাজ নেই, আমাদের হাতে কোন টাকা নেই’।

মাজার-ই-শরিফের পুরোনো জিনিসপত্রের বাজার বেশ জমে উঠেছে। এই বাজারে যাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হলো তাদের বেশিরভাগই সরকারি কর্মচারি। গত দুমাস ধরে সরকারি খাতের বেশিরভাগ কর্মচারী কোন বেতন পাননি।

আফগানিস্তানের সাবেক সরকারের আমলেই সমস্যাটি শুরু হয়েছিল, কিন্তু তাদের কোন ধারণা নেই - কখন তারা আবার বেতন পাবেন, কিংবা আদৌ পাবেন কীনা।

একজন শিক্ষিকা এরই মধ্যে তার ঘরের যা যা বিক্রি করা সম্ভব, তার সবকিছুই বিক্রি করে দিয়েছেন।

‘আমি আমার নিজের ঘরেই একজন দোকানদারে পরিণত হয়েছি এবং আমার সব জিনিস বিক্রি করে দিয়েছি.. বিক্রি করে যা পেয়েছি তা দিয়ে খাবার কিনছি। আমি যখনই এখানে আসি এবং লোকজনের অবস্থা দেখি, আমি বাড়ি ফিরে গিয়ে কাঁদি’।

এই নারী বলছেন, এত কিছুর পরও তিনি প্রতিদিন তার কাজে যাচ্ছেন।

এই বাজার থেকে রাস্তার উল্টো দিকেই মাজার-ই-শরিফের প্রধান হাসপাতাল। এটি এখন পরিচালনা করেন একজন তালেবান কর্মকর্তা। তবে তার ডেপুটি হিসেবে যিনি আছেন, তিনি আগের সরকারের আমল থেকেই ঐ পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে এখনো পর্যন্ত এই হাসপাতালের কর্মীদের বেতন দেয়া হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খরচ কোত্থেকে আসবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। অন্যদিকে ঔষধের যে বর্তমান মওজুদ, তা দিয়ে আর বড়জোর এক মাস চলবে।

আফগানিস্তানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে যেরকম মাত্রার সহিংসতা এবং রক্তপাতের আশংকা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তার চেয়ে কমই হয়েছে।

কিন্তু দেশটির প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে এখন তীব্র অভাব। বহু মানুষ এখন বেঁচে থাকার জন্য আগের চেয়েও বেশি কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত।

কাবুলে আমরা এক সাবেক পুলিশ সদস্যের দেখা পেয়েছিলাম, যিনি কোন রকমে দিন চালিয়ে নিচ্ছেন।

‘সরকারে কে থাকলো না থাকলো, তাতে আমার কিছু আসে যায় না’, বলছিলেন তিনি।

রাস্তার ধারে বসে তিনি এখন তালেবানের পতাকা বিক্রি করেন।

‘এখানে করার মতো আর কোন কাজ নেই’, বলছেন তিনি। ‘কাজেই আমি আর কী করতে পারি?’

 

বিবিসি বাংলা