ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল শুভ মধু পূর্ণিমা|316732|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৪:২২
ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল শুভ মধু পূর্ণিমা
ভদন্ত বোধিরত্ন ভিক্ষু

ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল শুভ মধু পূর্ণিমা

আজ শুভ মধু পূর্ণিমা। বৌদ্ধ বিশ্বের জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দঘন একটি তিথি এবং এর আবেদন অত্যন্ত তাৎপর্যময়। বৌদ্ধদের ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস যাপনের দ্বিতীয় পূর্ণিমা তিথিতে এই পূর্ণিমা উৎসব উদযাপন করা হয়।

দান, সেবা  ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল মধু পূর্ণিমা তিথি। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিকে বলা হয় মধু পূর্ণিমা। এরূপ নামকরণের ক্ষেত্রে দানের একটি কাহিনী রয়েছে, যা বৌদ্ধ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এক সময় বুদ্ধ কৌশাম্বীতে অবস্থান করছিলেন। সে সময় ভিক্ষুদের মধ্যে বিনয় সম্পর্কিয় এক তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে কলহ-বিবাদের সৃষ্টি হয়। ক্রমে এই কলহ কৌশাম্বীর সকল আবাসিক ভিক্ষুর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভিক্ষুরা দু’দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এক সময় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বুদ্ধ ভিক্ষুদের আহ্বান করে কলহ-বিবাদ করা অনুচিত বলে বোঝাতে চেষ্টা করেন। রাগের বশবর্তী হয়ে কোনো বিষয়ে অনঢ় থাকা উচিত নয় বলে তিনি সকলকে জানান। এই উপদেশ প্রদানকালে বুদ্ধ তাদের দীর্ঘায়ু কুমারের কাহিনী বলেন। সে কাহিনীতে উল্লেখ আছে যে, কলহ ও রাগের প্রভাব জন্ম-জন্মান্তর প্রবাহিত হয়। কিন্তু এতে উভয়ের ক্ষতি ছাড়া কোনো মঙ্গল হয়না। এমনকি শুধু কলহজনিত রাগের কারণে কোনো ভালো কাজও উপযুক্ত সময়ে করা যায়না। তাই সবসময় কলহ-বিবাদ পরিত্যাগ করা উচিত। বুদ্ধের নানাবিধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কৌশাম্বীবাসী ভিক্ষুরা কলহ থেকে বিরত হলেন না। নিজেদের মধ্যে কলহ ত্যাগ করে প্রীতির সম্পর্ক তৈরী করতে পারলেন না।

তখন বুদ্ধ কৌশাম্বীবাসী ভিক্ষুদের সংসর্গ ত্যাগ করে নিজে একাকী নির্জন গহীন বনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। একসময় তিনি চলে গেলেন পারিল্যেয় নামক বনে। ভিক্ষুদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে তিনি সেখানে স্বাচ্ছন্দে অবস্থান করতে লাগলেন। বুদ্ধ বনের মধ্যে একটি ভদ্রশাল গাছের নিছে আশ্রয় নেন। সেখানে অবস্থান করছিল একটি হাতি। হাতিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের শুঁড় দিয়ে বুদ্ধের বসবাসের জায়গাটি পরিস্কার করে দেয়। হাতিটি বুদ্ধের জন্য নিয়মিত পানীয় জলও সংগ্রহ করে আনত। সেবাদানের জন্য সর্বদা তৎপর থাকতো। এভাবে হাতিটি নিজের ইচ্ছাতেই বুদ্ধের সেবাই নিয়োজিত থাকতো। বন্যপ্রাণী হাতির এরূপ সেবাপরায়ণতা দেখে বনের এক বানরও বুদ্ধকে সেবা করতে আগ্রহী হয়। সে চেতনায় বানরটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে বন থেকে মধু সংগ্রহ করে বুদ্ধকে দান করে। বুদ্ধ বানরের দেওয়া মধু সন্তষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেন। এতে বানর খুবই প্রীত হয়। মনের সুখে এক বৃক্ষ থেকে অন্য বৃক্ষে লাফাতে থাকে। বানরটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফানোর সময় হঠাৎ মাটিতে পড়ে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বুদ্ধ দিব্যচক্ষুতে দেখলেন যে, মধুদানের ফলে বানর মৃত্যুর পর দেবলোকে পূনর্জন্ম গ্রহণ করেছে। এই ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে। এই অনন্য ঘটনাকে স্মরণ করে বৌদ্ধরা এই পূর্ণিমা তিথিতে ভিক্ষু সংঘকে মধুদান করেন। এইসব কারনে ভাদ্র পূর্ণিমাকে মধু পূর্ণিমা বলা হয়ে থাকে। এছাড়া কৌসাম্বীর ভিক্ষুরাও নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে কলহ ত্যাগ করেন এবং পারস্পরিক মধুময় সম্পর্ক সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়। বৌদ্ধরা এই পূর্ণিমাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে থাকেন। এই দিন বৌদ্ধরা উপোসথ শীল পালন করে থাকে। বালক-বালিকা, নর-নারী, শিশু-কিশোর সকলেই মধু ও অন্যান্য দানীয় সামগ্রী নিয়ে বিহারে গিয়ে বুদ্ধ পুজা, সীবলি পুজা, শীল গ্রহণ, সংঘদান, মধু ও ভেষজ দান, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, ভিক্ষুসংঘকে পিণ্ডদানসহ নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।। দান, সেবা ও পুজার নিদর্শন হিসেবে এই পূর্ণিমার গুরুত্ব বৌদ্ধ ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে।

এদিনকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ দেশের সকল বৌদ্ধ বিহারকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। ভোরে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। পবিত্র ত্রিপিটক পাঠের মাধ্যমে দেশ, জাতি ও বিশ্বের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করা হয়। মানব কল্যাণে ও জীবজগতের হিতার্থে বুদ্ধ তাঁর কল্যাণময় বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা স্থান পরিভ্রমণ করেছেন। গিয়েছেন গভীর অরণ্যে, বন, জঙ্গল, পাহাড় ও গুহাতে। বুদ্ধজ্ঞান ও দুঃখ অনুসন্ধানের জন্য যেমন কোনো স্থান বাদ দেননি, তেমনি ধর্মবাণীও ছড়িয়ে দিতে কোনো স্থান বাদ দেননি। এ থেকে বুঝা যায়, শুধু বিশ্ব মানবজাতির জন্য তাঁর অমৃতময় বাণী প্রচারিত হয়নি, তার বাণীর পরশ জীব জগতের পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, এমনকি জীবজন্তুও পেয়েছিল অপার প্রীতি মমতা। এজন্যই তিনি সকল প্রাণীর শান্তি ও সুখ কামনা করে বলতে পেরেছিলেন, ‘সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তু’। অর্থাৎ, জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।

আজ শুভ মধু পূর্ণিমা আমাদের সেই মহৎ শিক্ষাই দিচ্ছে। আমরা যেন আমাদের মানবীয় গুণাবলিতে পুনরুজ্জীবিত-সিক্ত হই এবং দানে, ত্যাগে ও পরোপকারে বিশ্ব মানবতায় এগিয়ে যাই। বৌদ্ধদের এইসব উৎসব পুজা-পার্বণ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আমরা মানুষের জন্য, বিশ্ব মানবতার জন্য নানা ধরনের দান, সেবা ও ত্যাগের মহৎ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, সেখানে আমাদের সব ধরনের সংকীর্ণতা এবং হিংসা, দ্বেষ, লোভ ও চিত্তের হিংস্রতা দূরীভূত হয় এবং মৈত্রী, দয়া, দান, সেবা, উদারতা প্রভৃতি মানবিক গুণাবলিতে আমাদের মন যেন করুণাসিক্ত হয়। এগুলো ধর্মের সর্বজনীন শিক্ষা। এজন্যই বুদ্ধের শিক্ষা হল জীবনের সব ক্ষেত্রে অকৃত্রিম উদার চিত্ত হওয়া, বিবেক-বুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলা এবং দান-ত্যাগ-সেবায় নিজেকে পরিপূর্ণ করা। আসুন সবাই সেবা ও ত্যাগে জীবনকে মহিমান্বিত করি। শুভ মধু পূর্ণিমা সফল হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।

লেখক: এম.ফিল. গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর। আবাসিক, আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, ঢাকা।