আড়াইশ কোটি টাকা মেরে গায়েব ৩ অ্যাপস|316867|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০
আড়াইশ কোটি টাকা মেরে গায়েব ৩ অ্যাপস
ইমন রহমান

আড়াইশ কোটি টাকা মেরে গায়েব ৩ অ্যাপস

ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু হেনা মো. আহসান হাবিব। কিছুদিন আগে ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউবের একটি ভিডিও ক্লিপে দেখতে পান, টু লাইক ও গোল্ড রাশ নামের ওয়েবসাইটে ঢুকে শুধু বিজ্ঞাপন দেখেই টাকা আয় করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে ভিডিও ক্লিপটির ডেসক্রিপশনে দেওয়া লিংকের মাধ্যমে আইডি কিনতে হবে। এরমধ্যে টু লাইক আইডি দিয়ে লগ-ইন করে দিনে ৫৩টি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে ১৪০০ টাকা এবং গোল্ড রাশ আইডি দিয়ে ৫০টি বিজ্ঞাপনে ক্লিক করে ১৫০০ টাকা আয় করা সম্ভব বলে ওই ভিডিও ক্লিপে উল্লেখ ছিল। এমন সহজেই ঘরে বসে টাকা আয়ের লোভে পড়ে গত ২২ জুলাই ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট ‘বাইন্যান্স’-এর মাধ্যমে টু লাইকের একটি আইডি ২৮ হাজার এবং গোল্ড রাশের একটি আইডি ৪০ হাজার টাকায় কেনেন হাবিব। এরপর থেকে প্রতিদিন বিজ্ঞাপনে ক্লিকের মাধ্যমে টাকা আয় করছিলেন। প্রতিদিন কাজ শেষে টাকা উত্তোলনও করতেন। এই দুই আইডি থেকে আয় করা ডলার ‘বাইন্যান্স’ থেকে উত্তোলন করতেন তিনি। এরইমধ্যে গত ১৫ আগস্ট টু লাইক ও গোল্ড রাশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে প্রতিটি আইডি অর্ধেক টাকায় পাওয়া যাবে, সময় মাত্র দুই দিন। এমন অফার দেখে ১৬ আগস্ট আরও পাঁচটি আইডি কেনেন হাবিব। কিন্তু পরদিন ১৭ আগস্ট সকালে টু লাইক ও গোল্ড রাশ-এর ওয়েবসাইটে ঢুকতে গিয়ে দেখেন ওয়েবসাইট দুটি আর নেই। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত আরও যারা ওই দুই ওয়েবসাইটে বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন হাবিব। কথা বলে জানতে পারেন তারাও ওয়েবসাইট দুটিতে আর ঢুকতে পারছেন না। তখন অনলাইন প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন হাবিব। এরপর তিনি যে দুটি ইউটিউব চ্যানেলের বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারিত হয়েছেন তার মালিকের বিরুদ্ধে যশোরের কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।

ভুক্তভোগী আবু হেনা মো. আহসান হাবিব দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘মি. টিস বাংলা’ ও ‘ইনকাম বাংলা’ নামে দুটি ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দেখে তিনি টু লাইক ও গোল্ড রাশে বিনিয়োগে উৎসাহ পান। এই ওয়েবসাইট দুটিতে বিনিয়োগ করে তার পরিচিত আরও অনেকেই প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করায় কেউ প্রকাশ্যে এসে অভিযোগ করছেন না।

আহসান হাবিবের করা মামলার তদন্তে নেমে গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভার থেকে ইউটিউব চ্যানেলের মালিক শোভন ইসলাম (২৪) এবং ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর থেকে প্রিন্স হোসেনকে (২১) গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। এরপরই তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সিআইডি জানতে পারে, আহসান হাবিবের মতো লাখো গ্রাহক প্রতারণার শিকার হয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।

সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চক্রটি অনলাইনে একইসঙ্গে টু লাইক, গোল্ড লাইন, গোল্ড রাশ নামে কথিত তিনটি অ্যাপসের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত আড়াইশ কোটি টাকা। তারা ইউটিউবে ডলার আয়ের লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে মাত্র দেড় মাসে সারা দেশে লাখের বেশি সদস্য সংগ্রহ করে। যাদের বেশিরভাগই তরুণ। এরপর হঠাৎই করেই গায়েব হয়ে যায় জালিয়াতির জন্য খোলা এসব অ্যাপস ও ওয়েবসাইট। সম্প্রতি ‘সানটন’ নামের আরেকটি কথিত অ্যাপস ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একই ধরনের প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।

হাবিবের মতো লাখো গ্রাহক প্রতারণার শিকার হলেও দেশে নিষিদ্ধ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করায় তারা সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি দপ্তর বা আদালতে অভিযোগ করতে পারছেন না। সম্প্রতি ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনের ডাক দিয়েও পুলিশি ঝামেলার ভয়ে কেউ আসেননি বলে এক ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে জানান। দেশের কোনো আর্থিক প্লাটফর্মে লেনদেন না হওয়ায় এবং প্রতারণার জন্য খোলা অ্যাপসগুলো গায়েব হয়ে যাওয়ায় প্রতারকরা কোথা থেকে এই প্রতারণার জাল বুনেছে তাও বুঝতে পারছে না সিআইডি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির সাইবার ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার (সি-৪) এর অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইবার জগতে যেকোনো আর্থিক বিনিয়োগ সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। যারা টু লাইক, গোল্ড লাইন, গোল্ড রাশ নামে অ্যাপসে টাকা বিনিয়োগ করেছে, তারা তলে তলে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করেছে। আমরা জানতে পেরেছি এখানে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাত্র দেড় মাসে অন্তত আড়াইশ কোটি টাকা নিয়ে গায়েব হয়ে গেছে একটি চক্র।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের বিনিয়োগে কিছু লোক স্বল্প সময়ে লাভবান হলেও দীর্ঘসময়ে বেশি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া এ ধরনের বিনিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের মাইক্রোক্রেডিট অথরিটির সব নীতিমালার বাইরে।’

যেভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতারক চক্র প্রথমে টু লাইক, গোল্ড রাশ বা গোল্ড লাইন এই তিনটির মধ্যে যেকোনো একটি অ্যাপস অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ইনস্টল করতে বলে। এরপর সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলতে বলে। এসব কথিত অ্যাপসের ওয়েবসাইটও ছিল। সেখানে কোন প্যাকেজে কাজ করবে তার অপশনও ছিল। একেকটি প্যাকেজের একেক দাম। সবচেয়ে দামি প্যাকেজ ৭৪ হাজার এবং সর্বনিম্ন দামের প্যাকেজ ২০ হাজার টাকার। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে দিনে সর্বোচ্চ আয় করতে দুই থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগত। এখানে তারা এমএলএম-এর মতো একজনের টাকা অরেকজনকে দিয়ে কাজটি করে।

লেনদেনের ক্ষেত্রে বিকাশ, নগদ, রকেট বা দেশের অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার হয়নি। প্রতারকরা বাইনান্স (ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ) নামের একটি প্লাটফরম ব্যবহার করেছে। বাইনান্সে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে প্রথমে টাকার সমপরিমাণ ডলার ঢোকায় গ্রাহক। বাইনান্স অ্যাপের ভেতরেই পরামর্শ দিয়ে দেয় কারা অনলাইনে ডলার বিক্রি করে। এদের মাধ্যমে গ্রাহক তার বাইনান্স ওয়ালেটে টাকার বিনিময়ে ডলার ঢোকায়। এরপর টু লাইক, গোল্ড রাশ বা গোল্ড লাইন অ্যাপসে বিনিয়োগকারীকে বাইনান্স-এর কিউআর কোডটি দিয়ে দেয় চক্রটি। সেই অ্যাকাউন্টে প্যাকেজ অনুযায়ী টাকার সমপরিমাণ ডলার পাঠিয়ে দেয় গ্রাহক। বিনিয়োগকারী ওই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই বাইনান্স অ্যাকাউন্ট থেকে সমপরিমাণ ডলার চলে যায়। এরপরই অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে যায়। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনে ক্লিকের কাজ করা শুরু করে গ্রাহক। দিন শেষে অর্জিত ডলার গ্রাহক তার বাইনান্স অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে এবং ক্যাশ আউট করার সুযোগ থাকে।

এদিকে দেশের কিছু ইউটিউব চ্যানেলের মালিক প্রতারণার ওই পুরো প্রক্রিয়াকে প্রমোট (প্রচার) করেছেন। টাকা মেরে অ্যাপসগুলো গায়েব করা হলেও এখনো অসংখ্য ইউটিউব চ্যানেল এই অ্যাপসগুলো থেকে টাকা কামানোর উপায় সংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচার করছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে ইউটিউব ঘেঁটে ও দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টু লাইকিতে ক্লিকেই ডলার আয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার করছে জিকস টিচ, প্রফুল্ল ড্রিম, ইজি সোশ্যাল টিপ, টিচ অল২৪সহ বেশ কিছু ইউটিউব চ্যনেল। গোল্ড রাশ-এর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে অ্যাপস কারিকুলাম বিডি, অনলাইন জবস বিডি, টি টিচ বাংলা, বিডি আর্ন মানি, টেকনিক্যাল ৩৬০ ডিগ্রি ও মানি মিনিং টিচ নামের ইউটিউব চ্যানেল। গোল্ড লাইন-এর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ক্রিয়েটিভ টিভ, এসআর মাল্টি মিডিয়া, টিচ বিডি প্রো ও মুরসালিন অফিশিয়ালসহ অসংখ্য ইউটিউব চ্যানেল। প্রতিদিন ৫০০+ টাকা আয়, প্রতিদিন ইনকাম ১ থেকে ৫০০০, অ্যাকাউন্ট খুললেই ২ ডলার, প্রতি মাসে ১৪ হাজার টাকা প্রভৃতি লোভনীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করছে এসব ইউটিউব চ্যানেল।

ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন দেশে নিষিদ্ধ উল্লেখ করে সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অফিশিয়াল নির্দেশে বলা আছে, যে কোনো ব্যাংকিং ট্রানজেকশনের একটি গভর্নিং বডি আছে। ফলে যদি এখানে কোনো প্রতারণা বা কোনো ধরনের ক্রাইম ঘটে তাহলে এটাকে ডিটেক্ট (শনাক্ত) করা সম্ভব। কারণ ব্যাংক টু ব্যাংকের একটি আন্তঃযোগাযোগ আছে। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো গভর্নিং বডি নেই, তাদের সঙ্গে চুক্তি নেই সেহেতু এখানে বিনিয়োগ অথবা কোনো ধরনের লেনদেন করে কেউ প্রতারিত হলে সেটার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের কোনো এজেন্সির কাছে সাহায্য চাইলেও তা মিলবে না।

এ প্রসঙ্গে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ সুপার (সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন) মো. মাহমুদুল ইসলাম তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোয়েন্দা সূত্রে আমরা জানতে পারি যে একটি চক্র মানুষকে লোভে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিয়ে গায়েব হয়ে গেছে। যখন এই টাকা আয়ের বিষয়টি প্রচারিত হয় তখন তিনটি ওয়েবসাইটে হিউজ পরিমাণ মানুষ বিনিয়োগ করে। এরপর গত মাসে হুট করে একইসঙ্গে ওয়েবসাইট ও অ্যাপস তিনটি গায়েব হয়ে যায়। যেহেতু কোনো ব্যাংকিং ট্রান্সজেকশন হয়নি, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এক্সচেঞ্জ হয়েছে, সেহেতু এখানে জানা সম্ভব হচ্ছে না টাকাটা কার কাছে গিয়েছে। এটি বাংলাদেশ থেকে কেউ করেছে নাকি বিদেশ থেকে কেউ করেছে তাও বোঝা যাচ্ছে না।’

এই সিআইডি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যেহেতু ইউটিউবের মাধ্যমে এই প্রতারকরা প্রচারণা চালিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করেছে সেহেতু ওইসব ইউটিউব চ্যানেলের প্রতি আমরা নজর রাখছি। তবে চ্যানেলের মালিকরা দাবি করছেন, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিজ্ঞাপন তৈরি করে প্রচার করেছে। এক্ষেত্রে তাদের যে ডলার পেমেন্ট করেছে তাও বাইনান্স-এর মাধ্যমে।’