আসামে লাশের বুকে লাফিয়ে পড়া কে এই ফটোগ্রাফার?|317536|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২০:২০
আসামে লাশের বুকে লাফিয়ে পড়া কে এই ফটোগ্রাফার?
অনলাইন ডেস্ক

আসামে লাশের বুকে লাফিয়ে পড়া কে এই ফটোগ্রাফার?

কয়েক মাস আগে আসামে নতুন মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ক্ষমতায় এসেই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযান চালু করেছেন তিনি। অভিযোগ, উচ্ছেদের নামে সংখ্যালঘু মুসলিম এবং বাংলাভাষীদের ওপর আক্রমণের নতুন কৌশল নিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার রাজ্যের দারাং জেলার সিপাজহার গ্রামে তেমনই এক উচ্ছেদ অভিযানে যায় পুলিশ। উচ্ছেদ ঘিরে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় এলাকা। পুলিশের গুলিতে দুইজনের প্রাণ যায়।

ঘটনার যে ফুটেজ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, হাতে ক্যামেরা নেওয়া সিভিল পোশাকের এক ব্যক্তি গুলি লাগা সাধারণ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পরে অবশ্য ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে হাতি দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে বিতর্কের শিরোনামে এসেছিল আসাম সরকার। হাতি গুড়িয়ে দিয়েছিল গ্রামের বাড়ি। বৃহস্পতিবার দারাংয়ের সিপাজহার গ্রামেও রীতিমতো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উচ্ছেদ অভিযানে নামে পুলিশ। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর এলাকার মানুষ বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন।

পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে অস্ত্র ছিল। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, বিক্ষোভকারীদের হাতে লাঠি এবং পাথর ছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রথমে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে শূন্যে গুলি চালানো হয়। কাঁদানে গ্যাসের শেলও ফাটানো হয়। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা পাল্টা পুলিশের উপর আক্রমণ চালায়। ফলে বাধ্য হয়েই গুলি চালাতে হয়। তাতেই দুইজনের মৃত্যু হয়।

দারাং পুলিশ সুপার সুসন্ত বিশ্ব শর্মা, মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে যিনি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার ভাই, তিনি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রকে বলেছেন যে, পুলিশ ‘আত্মরক্ষায়’ যা করতে হয়েছিল তাই করেছে।

পুলিশ এ কথা বললেও, সংবাদমাধ্যমের হাতে যে ভিডিও পৌঁছেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তি লাঠি হাতে পালানোর চেষ্টা করছিল। পুলিশ তার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ওই ব্যক্তি মাটিতে পড়ে গেলে তার উপর বেশ কয়েকজন পুলিশ তুমুল লাঠিচার্জ করে। এর মধ্যেই ঢুকে পড়ে এক ফটোগ্রাফার। ওই ব্যক্তির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওই ফটোগ্রাফার।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ওই ফটোগ্রাফার পুলিশের সঙ্গেই ঘুরছিল এবং উচ্ছেদের ছবি তুলছিল। গ্রামবাসীরা তাকেও তাড়া করেছিল। পরে অবশ্য ওই ফটোগ্রাফারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মৃত যে দুই ব্যক্তির নাম পুলিশ ঘোষণা করেছে, তারা হলেন, সাদ্দাম হুসেন এবং শেখ ফরিদ। যে ব্যক্তির ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, এই দুইজনের মধ্যে তিনিও আছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে আল জাজিরা বলছে, ভিডিওতে যে ব্যাক্তির লাশের ওপর লাফিয়ে পড়তে দেখা গেছে তার নাম মইনুল হক।

অন্যদিকে, এক এএসআই পদমর্যাদার পুলিশ অফিসার সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গোটা ঘটনার তদন্ত করবেন হাইকোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

অসমীয়া প্রতিদিনের দিল্লি ব্যুরোর প্রধান আশিস চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘একের পর এক উচ্ছেদ অভিযানে এভাবেই বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে পুলিশ এবং প্রশাসন। মুসলিম এবং বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। সরকার তা সমর্থন করছে। বৃহস্পতিবারের ঘটনার পরেও মুখ্যমন্ত্রী তার সমালোচনা করেননি। কারণ, সমস্ত পরিকল্পনা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর’। পুলিশ কেন বুক লক্ষ্য করে গুলি চালালো, সে প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।

আসামের সাংবাদিক এবং বরাক বুলেটিনের অন্যতম প্রধান অনির্বাণ রায়চৌধুরী জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে (ডিডাব্লিউ) বলেন, ‘মুসলিম বিদ্বেষের কদর্য প্রকাশ এদিনের ঘটনা। যেভাবে পুলিশ গুলি চালিয়েছে, যেভাবে নিহত ব্যক্তির উপর আক্রমণ হয়েছে, তা ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। ৪৮০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। অথচ তাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। কার্যত অনাহারে দিন কাটাচ্ছে তারা। অথচ বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর টুইট দেখে মনে হচ্ছে, তিনি আনন্দিত’।

তবে আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে অন্তত ৮০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

আল জাজিরা জানায়, হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন আসাম সরকারের নির্দেশিত তথাকথিত ‘উচ্ছেদ অভিযান’ এর বিরুদ্ধে বাংলাভাষী অসমীয় মুসলমানদের প্রতিবাদের সময় সিপাজহারের এই সহিংসতা ঘটে।

বিজেপির বিরুদ্ধে আসামের জাতিগত ও ধর্মীয় বিভেদকে নির্বাচনী লাভের জন্য কাজে লাগানোর এবং রাজ্যের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অভিযান চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

সোমবার, মৌসুমী বৃষ্টি সত্ত্বেও সিপাজহার থেকে প্রায় ৮০০ পরিবারকে তাদের জমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং তাদের আবাসস্থল ধ্বংস করে সরকারী কর্মকর্তারা।

উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, তারা বেশ কয়েক বছর আগে ওই গ্রামে জমি কিনেছিলেন এবং উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদালতে গিয়েছিলেন। আদালত এখনও বিষয়টি শুনছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবারের সহিংসতার প্রতিবাদে আসাম, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এবং অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।

ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধী টুইট করেছেন, ‘আসামে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আগুন জ্বলছে’।

ভিডিওতে দেখুন...