আমাদের আছেন রক্ত-মাংসের জেমস |319051|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ অক্টোবর, ২০২১ ১৩:৩৯
আমাদের আছেন রক্ত-মাংসের জেমস
আফজালুর ফেরদৌস রুমন

আমাদের আছেন রক্ত-মাংসের জেমস

মাহফুজ আনাম জেমস

জাতি হিসেবে ব্রিটিশদের আছে কাল্পনিক জেমস বন্ড, আমাদের আছেন রক্ত-মাংসের জেমস। যার গানে সিনায় সিনায় লাগে টান। তার পুরো নাম ফারুক মাহফুজ আনাম। তবে সংগীতপ্রেমীদের কাছে ‘গুরু’ নামেই পরিচিত।

অনন্য গায়কি, লিরিকের বিশেষ বাছাই দিয়ে রকস্টার থেকে তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘গুরু’তে পরিণত হয়েছেন জেমস। তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা মিডিয়া বা ব্র্যান্ড প্রমোশনের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। ভক্তদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সরাসরি; গানের মাধ্যমে। অবশ্য শুধু জেমস নয় আশি, নব্বই বা শূন্য দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিনোদনের সব মাধ্যমের তারকারা ‘নির্ভেজাল’ জনপ্রিয়তা ছিল কাজের মধ্য দিয়েই।

আজ ২ অক্টোবর, আজ জেমসের জন্মদিন, ৫৮ বছরে পা দিচ্ছেন সংগীত ভুবনের এই মহাতারকা।

লম্বা কোঁকড়ানো চুল নিয়ে গিটার হাতে যখন মানুষটা মঞ্চে ওঠেন তখন যে উন্মাদনা বা ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করা যায়, তা কতটা নির্ভেজাল ও বাস্তব এটা বুঝতে বাকি থাকে না কারো। বাংলাদেশের একদম পুরোনো থেকে উঠতি যত ব্যান্ড তাদের মাঝে জেমসের আছেন নিজস্ব উচ্চতায়। তার গান আমাদের হাসায়, কাঁদায় আবার নতুন করে ভাবতে শেখায়। এটাই হয়তো শিল্পী হিসেবে জেমসের সার্থকতা এবং শ্রোতা হিসেবে আমাদের প্রাপ্তি।

নব্বইয়ের দশক ছিল মূলত কনসার্ট, ব্যান্ড কালচার ও অডিও বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ। যার রেশ শূন্য দশকের মাঝামাঝিতেও দেখা যায়। ওই সময় প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও কনসার্ট হতো। রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়াম, ঢাকা কলেজ, টিএসসি, ধানমন্ডি উইমেন্স কমপ্লেক্স, কলাবাগান মাঠ, আবাহনী মাঠে নিয়মিত আসর বসতো। আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান, বিপ্লব আরও অনেকের নামের জোরে ভিড় সামলানো মুশকিল হয়ে যেতো। এই নামগুলোর মাঝে এখন শুধু জেমসই পথচলা অব্যাহত রেখেছে। এখনো শহুরে আড্ডা থেকে গ্রামের হাটে-বাজারে বাজে তার গান। এই লম্বা সময় ধরে জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি ধরে রাখা কম আশ্চর্যের নয়।

নওগাঁয় জন্ম হলেও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। সরকারি কর্মকর্তা বাবার সঙ্গে গান গাওয়া নিয়ে মনোমালিন্য, এরপর বাসা থেকে বের হয়ে আসা। আজিজ বোর্ডিংয়ে থেকে সংগীতে চলা, এখন থাকেন বারিধারার আলিশান ফ্ল্যাটে। মাঝে ৪০ বছরের লম্বা সময় তার সঙ্গী সংগীত।

অ্যালবামে জেমসের শুরু ১৯৮৬ সালে ফিলিংস ব্যান্ডের ‘স্টেশন রোড’ দিয়ে। এরপর ‘জেল থেকে বলছি’ (১৯৯৩), ‘নগর বাউল’ (১৯৯৬), ‘লেইস ফিতা লেইস’ (১৯৯৮) এবং ২০০০ সালে ফিলিংস নাম পাল্টে হয় নগর বাউল, প্রকাশ করেন ‘দুষ্টু ছেলের দল’ (২০০১) । ব্যান্ডের পাশাপাশি একক, মিশ্র অ্যালবাম ও প্লেব্যাকে উপহার দেন অজস্র জনপ্রিয় গান।

জেমসের একক অ্যালবামগুলোও পেয়েছে অসামান্য জনপ্রিয়তা। ‘অনন্যা’ (১৯৮৮), ‘পালাবে কোথায়’ (১৯৯৫), ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ (১৯৯৭), ‘ঠিক আছে বন্ধু’ (১৯৯৯), ‘আমি তোমাদেরই লোক’ (২০০৩), ‘জনতা এক্সপ্রেস’ (২০০৫), ‘তুফান’ (২০০৬) ও ‘কাল যমুনা’ (২০০৮) প্রতিটা অ্যালবামই জনপ্রিয়তার রেকর্ড ভেঙেছে। যত দিন গেছে জেমস যেন আরও পরিণত, আরও নতুন।

বাংলাদেশ, জেল থেকে আমি বলছি, মা, দুঃখিনী দুঃখ করো না, লেইস ফিতা লেইস, বাবা কত দিন, বিজলী, দুষ্টু ছেলের দল, মিরাবাঈ, পাগলা হাওয়া, গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়াসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন তিনি। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শ্রোতারাও তার প্রতিভার সঙ্গী হয়েছেন। বলিউডে অল্প কিছু গান করলেও কালজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

দেশের সিনেমায় কম গাইলেও দুইবার জিতেছেন জাতীয় পুরস্কার— ‘দেশা দ্য লিডার’ ও ‘সত্তা’ সিনেমায় জন্য। এ ছাড়া মেরিল প্রথম আলো, বাচসাসসহ অসংখ্য পুরস্কার জয় করেছেন। আর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো ভক্তদের অকৃত্রিম ভালোবাসা।

প্রজন্মের পর প্রজন্মে জেমস মানে উন্মাদনা, ভক্তদের তিনি ‘দুষ্টু ছেলের দল’ বলে  আখ্যায়িত করেন। তার জন্মদিনে ২০১৫ সালে ঢাকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার ধারে বিশাল আকারের ১২টি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। আবার পরের বছর জেমসের জন্মদিনে দেড় হাজার কেজি ওজনের কেক তৈরি করেন এক ভক্ত। ২০০০ সালে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় ভক্তদের উদ্যোগে একটি সড়কের নাম দেওয়া হয় ‘জেমস রোড’। এবার দেশব্যাপী হচ্ছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল। এই ভালোবাসা বা এই শ্রদ্ধা কি একদিনে বা ফাঁকা আওয়াজের ওপর অর্জন সম্ভব? না।

জেমসের দরাজ গলায় কখনো কনডেম সেলে ফাঁসির আসামির মৃত্যুর দিন গোনার হাহাকার আমরা শুনেছি, শুনেছি পরমের প্রতি সমর্পণ বা বিরহে কাতর প্রেমিকের আর্তনাদ। আছে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা বা ‘বাংলাদেশ’ গানের মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালি সত্তা নতুন জাগরণ।

জন্মদিনে শুভ কামনা রইল ‘গুরু’র জন্য। তার গান আমাদের বিমোহিত করে রাখুক অনন্তকাল!