বিসিএস জট কাটছে এ বছর|320633|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
বিসিএস জট কাটছে এ বছর
আশরাফুল হক

বিসিএস জট কাটছে এ বছর

করোনা মহামারীর জন্য থেমে যাওয়া চলমান সব বিসিএসই পুরোদমে শুরু হয়েছে। বিসিএস জট থেকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বের হয়ে আসার জন্য পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। এই সময়ের মধ্যেই ৪০তম বিসিএসের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে। ৪১তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শুরু হবে এবং ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করে লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলে পিএসসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চলমান বিসিএসের জট এ বছরই শেষ হবে কি না, জানতে চাইলে পিএসসি চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান জট একেবারে শেষ হবে না, তবে অনেকটাই কমবে। প্রতি বছর একটা বিসিএসের যে পরিকল্পনা আমরা করেছি চলমান জট শেষ হওয়ার পর তা বাস্তবায়ন করা যাবে বলে আমি আশাবাদী।’

৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফলাফলের যে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে বিসিএসের বিভিন্ন পরীক্ষা কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও ৪১তম বিসিএসের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পিএসসির একজন সদস্য জানান, করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়ার পর পরিস্থিতি ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। আটকে থাকা পরীক্ষা শেষ করতে চায় পিএসসি। নিয়োগের সময় কমিয়ে আনতে হলে এটিই সহজ সমাধান বলে মনে করেন তিনি।

দেশে করোনার ভয়াবহতায় বন্ধ ছিল সব শিক্ষা কার্যক্রম। নিয়োগ প্রক্রিয়াও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। গত মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে, চলছে কিছু কিছু পরীক্ষা। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এরই মধ্যে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ২১ মাস বয়সের ছাড় দিয়েছে সরকার। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে থাকায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ২১ মাস বয়স ছাড় দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিতব্য বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা গত বছরের ২৫ মার্চ নির্ধারণ করার জন্য বলেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ ২০২০ সালের ২৫ মার্চের পর থেকে যাদের চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৩০ বছর পার হয়েছে বা হচ্ছে, তারা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জারি করা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের যোগ্য হবেন। যেসব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও তার অধীন অধিদপ্তর, দপ্তর এবং সংবিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত বা জাতীয়কৃত প্রতিষ্ঠান করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিতব্য বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীদের বয়সসীমা গত বছরের ২৫ মার্চ নির্ধারণ করতে হবে। তবে সরকারি চাকরির সবচেয়ে বড় উৎস পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিসিএসের ক্ষেত্রে এ ছাড় প্রযোজ্য হবে না।

চাকরির বাজারে বর্তমানে দ্বিমুখী সংকট চলছে। একদিকে লাখ লাখ বেকার চাকরির জন্য ঘুরছেন। অন্যদিকে সরকারের ৩ লাখ ৮৭ হাজার পদ শূন্য। শূন্য পদে জনবল না থাকায় অনেক দপ্তরেই স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে না। দপ্তরের উদ্বৃত্ত কর্মচারী জনবল সংকটের দপ্তরে ন্যস্ত করার বিধান থাকলেও তা কার্যকর নয়। কীভাবে বেকার প্রার্থী ও শূন্য পদের গ্যাপ কমিয়ে আনা যায় তা নিয়ে সরকারের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই।

করোনা মহামারীর প্রথম দফায় সাধারণ ছুটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের বয়সের ক্ষেত্রেও ছাড় দিয়েছিল সরকার।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের প্রান্তসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়ানোর দাবি বেশ কয়েক বছর ধরেই রাজপথে রয়েছে, তবে স্থায়ীভাবে তা বাড়াতে রাজি নয় সরকার। একইভাবে চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিও রয়েছে। কোনো দাবিতেই সরকারের সাড়া নেই।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিএসসি একটি বিসিএস আয়োজন করতে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। একটা বিসিএসে আড়াই থেকে সাড়ে তিন বছর লেগে যাচ্ছে। এ থেকে পিএসসিকে বের হয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ছেলেমেয়েরা কাজবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণ-তরুণী পরিবারের ভরসাস্থল। তাদের দিকে চেয়ে থাকে পুরো পরিবার। বেকারত্বের বিষয়টি পিএসসিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।’ 

আগামী ২৯ অক্টোবর ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২ জন প্রার্থী আবেদন করেছেন। যেকোনো বিসিএসের প্রিলিমিনারির তুলনায় এটা রেকর্ড। অর্থাৎ এত বেশি প্রার্থী আর কোনো বিসিএসের প্রিলিমিনারির জন্য আবেদন করেননি। এসব প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য ৮ বিভাগীয় শহরের ৩৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে। এমসিকিউ টাইপ প্রশ্নে দুই ঘণ্টার এ পরীক্ষা হবে। পরীক্ষা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিটি হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে পিএসসি। এসব ম্যাজিস্ট্রেটকে পরীক্ষার দিন বিভাগীয় শহরের কার্যালয়ে সকাল ৬টায় উপস্থিত থাকতে হবে। তাদের নেতৃত্বেই প্রশ্নপত্র বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হবে। তার আগে এসব ম্যাজিস্ট্রেটকে ২৩ অক্টোবর পিএসসির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্কশপে অংশ নিতে হবে। ২৯ অক্টোবরের পরীক্ষায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২ জন প্রার্থীর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে অংশ নেবেন অর্ধেকের বেশি প্রার্থী। ঢাকার প্রার্থী সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার ২২১, রাজশাহীতে ৪০ হাজার ৬৫, চট্টগ্রামে ৩৯ হাজার ২৭২, খুলনায় ৩২ হাজার ৯৬৬, বরিশালে ১৪ হাজার ৩৮৪, সিলেটে ১৫ হাজার ১৪৮, রংপুরে ৩৬ হাজার ৪৭৮ এবং ময়মনসিংহে ৩১ হাজার ২৯৮ জন। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থীর সিট পড়েছে তেজগাঁও কলেজে। রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত এ কলেজে পরীক্ষা দেবেন ৫ হাজার প্রার্থী। সরকারি তিতুমীর কলেজে ৪ হাজার ৫০০ প্রার্থীর সিট পড়েছে। সাড়ে ৩ হাজার করে প্রার্থীর সিট পড়েছে পুরাতন বিমানবন্দর রোডের বিএএফ শাহীন কলেজে, ইডেন মহিলা কলেজ ও পিলখানার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজে।

৪২তম বিসিএসে চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সুপারিশ : গত ৮ সেপ্টেম্বর ৪২তম বিশেষ বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে চার হাজার চিকিৎসককে সহকারী সার্জন হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করেছে পিএসসি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এই বিসিএসের মাধ্যমে প্রথমে দুই হাজার চিকিৎসক নিয়োগের কথা থাকলেও আরও দুই হাজার, অর্থাৎ মোট চার হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে মহামারী নিয়ন্ত্রণে দুই হাজার চিকিৎসক নেওয়ার জন্য গত বছরের নভেম্বরে ৪২তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রিলিমিনারি পরীক্ষা (লিখিত টাইপ) অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৭ হাজার ৫৭৩ জন অংশ নেন। ২৯ মার্চ ফল প্রকাশ করে পিএসসি। এতে উত্তীর্ণ হন ৬ হাজার ২২ জন। এরপর করোনার কারণে কয়েক দফায় পেছানো হয় ৪২তম বিসিএসের ভাইভা। যথাযথ এজেন্সির মাধ্যমে প্রাক-চাকরি জীবনবৃত্তান্ত যাচাইয়ের পর সরকার চূড়ান্ত নিয়োগ দেবে।

৪১তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শিগগিরই : গত ১ আগস্ট প্রকাশ করা হয় ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফল। পরীক্ষার চার মাসের বেশি সময় পর পিএসসির ওয়েবসাইটে এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়। করোনা মহামারীর কারণে কয়েক দফায় পিছিয়ে চলতি বছরের ১৯ মার্চ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৪ মাস ১২ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ হয়। এর আগে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ৪১তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। এতে বিভিন্ন পদে ২ হাজার ১৩৫ জন কর্মকর্তা নিয়োগের কথা বলা হয়।

৪০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা চলছে : বর্তমানে ৪০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শেষ পর্যায়ে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সুপারিশ করতে পারে পিএসসি। ২০১৮ সালের আগস্টে ৪০তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। এরপর প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাইভা শুরু হয়। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় মাঝপথে ভাইভা স্থগিত করে পিএসসি।