‘পিতৃতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দী পুরুষ’ আত্মহত্যা করছে বেশি|321727|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ অক্টোবর, ২০২১ ২১:২০
‘পিতৃতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দী পুরুষ’ আত্মহত্যা করছে বেশি
অনলাইন ডেস্ক

‘পিতৃতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দী পুরুষ’ আত্মহত্যা করছে বেশি

বাংলাদেশের যে আর্থসামাজিক ইতিহাস সেখানে দেখা যায়, একজন পুরুষই সংসারের সব দায়িত্ব নেন। সেই দায়িত্ব নেয়ার মতো করেই তার বেড়ে ওঠাও ঘটে। একজন পুরুষ পরিবারের সবার জন্য অর্থ উপার্জন করবে, সবার দায়িত্ব বহন করবে, জীবনে সফল হবে, সবার জন্য সিদ্ধান্ত নেবে- সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেন পুরুষ হয়ে ওঠার এই সামাজিক শিক্ষা জন্ম থেকেই তার ঘাড়ে বিশাল এক বোঝা চাপিয়ে দেয়।

তার কাছ থেকে আশা করা হয় এসব চাপে পুরুষ ভেঙে পড়বে না। পুরুষ দুর্বলতা প্রকাশ করবে না। কিন্তু প্রশ্ন কেন বংশ পরম্পরায় পুরুষ এই শিক্ষা বহন করে চলেছে।

সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা এ বিষয়ে বলেন, মূলত আমরা দেখেছি যে এর সঙ্গে কৃষিভিত্তিক সভ্যতার একটা সম্পর্ক আছে। এই যে রোল অ্যাসাইনমেন্ট, সেটা সমাজ করেছে নানান কারণে। ফেমিনিস্টরা বলবেন সমাজ এটা করেছে পুরুষের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য, অন্যদিকে ফাঙ্কশনালিস্টরা বলবে এটা অর্ডার মেনটেইন করবার জন্য জরুরি। সেখান থেকেই শুরু।

বিশ্বব্যাপী পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষমতা, অর্থ, সম্পদের মালিকানা এবং সিদ্ধান্ত প্রণেতা হিসেবে পুরুষের অবস্থান নারীর ওপরে। তাই মনে করা হয় পিতৃতন্ত্র পুরুষকে শুধু সুবিধাই দেয়। কিন্তু নৃবিজ্ঞানী জোবাইদা নাসরিন মনে করেন নিজের তৈরি পিতৃতন্ত্রের বেড়াজালে পুরুষ নিজেই বন্দী হয়ে রয়েছে।

জোবাইদা মনে করেন, পুরুষতান্ত্রিকতার ভিকটিম কিন্তু পুরুষরাও। তাদের ওপর একটা বাড়তি চাপ থাকে যে তাকে চাকরি পেতেই হবে, সংসারের হাল ধরতে হবে, সে যখন বিয়ে করবে তখন স্ত্রীর খরচ দিতে হবে- এটা একটা বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপ। কিন্তু চাপের মধ্যে থাকলেও কাউকে কিছু বলা যাবে না। বললে তাকে দুর্বল মনে করা হবে। ছোট বেলা থেকে তাকে যেভাবে তৈরি করা হয়, পুরুষের যে কাঠামো সেটা কিন্তু পুরুষতান্ত্রিকতারই ছকে তৈরি। পুরুষেরা যে পুরুষতান্ত্রিকতার ভিকটিম, এই বেড়াজাল থেকে সে কীভাবে বের হবে সেই তরিকাটা খুঁজে বের করা জরুরি।

এই বেড়াজাল থেকে বের হতে না পারা, এসব বিষয় নিয়ে কথা না বলা, অথবা বলতে না পারার ফল হলো বিশ্বব্যাপী পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বব্যাপী নারীদের তুলনায় পুরুষেরা দ্বিগুণ সংখ্যায় আত্মহত্যা করে। ব্যাপক মানসিক চাপে নানা ধরনের শারীরিক অসুখে বেশি ভোগেন পুরুষেরা।

মানসিক সহায়তা বিষয়ক বেসরকারি হেল্পলাইন 'কান পেতে রই' বলছে, ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে এ বছরের মে মাস পর্যন্ত তাদের হেল্পলাইনে ফোন করে কাউন্সেলিং চেয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। এই পুরুষদের মধ্যে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি কল করেছেন।

'কান পেতে রই'র সমন্বয়ক অরুণ দাস বলছেন, বেশির ভাগই তাদের মানসিক কষ্টের উৎস হিসেবে উপার্জনের চাপের কথা উল্লেখ করেন। তাদের একটা বড় অংশ সম্পর্ক নিয়ে সমস্যার কথা বলেন এবং মূলত মেয়েরাই এ বিষয় নিয়ে বেশি কথা বলেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে কাজ বিষয়ক ইস্যু বেশি পাওয়া যায়- কারও হয়তো চাকরি চলে গেছে, অর্থনৈতিক অসুবিধার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, যে কারণে মানসিক চাপ- এসব বিষয় নিয়ে পুরুষেরা কল করেন বেশি। আর একটা বিষয়ে পুরুষদের কাছ থেকে আমরা কল পাই সেটা হচ্ছে অ্যাডিকশন। যেকোনো ভাবেই হোক পুরুষকে উপার্জন করতে হবে, এই চাপ সব সময় থাকে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলছেন, বেশির ভাগ সময় পুরুষদের প্রবণতা হচ্ছে ছোটখাটো মানসিক উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেয়া। অনেক বড় ধরনের মানসিক সমস্যা নিয়ে সবকিছু ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি হলে তখনই পুরুষেরা তাদের শরণাপন্ন হন।

তবে তিনি বলছেন, পুরুষ তার ভূমিকা পালন করার জন্য সমাজের যে স্বীকৃতি ও ক্ষমতা পান সে কারণে তিনি নিজেও এসব দায়িত্বকে চাপ মনে করেন না। ছোট বেলা থেকেই তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়া হয়েছে। সূত্র: বিবিসি