কিশোরদের অনিরাপদ পথচলা|321749|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
কিশোরদের অনিরাপদ পথচলা
শাহাদাত স্বাধীন

কিশোরদের অনিরাপদ পথচলা

আমাদের দেশে গত প্রায় এক দশকের কাছাকাছি ধরে অভিভাবক, শিক্ষক, সুশীলসমাজ সবারই কিশোর গ্যাং ও কিশোরদের অনিরাপদ জীবন আর পথচলা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু কিশোরদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমরা কী করছি তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। 

কিশোর গ্যাংগুলো গড়ে উঠছে মূলত শহর ও শহরতলি এলাকায়। এদের যোগাযোগের অন্যতম পথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ। এই কিশোরদের গ্যাং করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো কম বয়সে ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা, নিজেকে বিশেষ কিছু হিসেবে উপস্থাপন করা। কথিত প্রেমিকাকে নিয়ে প্রায়শই এই কিশোররা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ধীরে ধীরে গ্যাংয়ে যুক্ত হয় মাদক। গ্যাং তাদের সংঘর্ষ করার প্রেরণা দেয় আবার সংঘর্ষ করার জন্যই গ্যাং তৈরি হয়।

শুরুতে রেলবস্তি এলাকার কিছু ছেলে এসব গ্যাং কালচারে অভ্যস্ত হলেও বর্তমানে সমাজের মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও এসব গ্যাং কালচারে যুক্ত হচ্ছে। এ রকম কালচারে জড়িত বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং ও কিশোরদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। করোনা পরিস্থিতিতে তাদের একসঙ্গে বসা সীমিত হলেও অনলাইনে বেশিক্ষণ সময় দেওয়া তাদের আরও বেশি গ্যাংমুখী করেছে। এই গ্যাংদের অন্যতম কাজ হলো গ্যাংয়ের সদস্যদের জন্মদিন পালন করা, বাইক শোডাউন দেওয়া, কারও কোনো মেয়েকে পছন্দ হলে দলবেঁধে তার পিছু নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শোডাউনের ছবি দেওয়া, বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে নিজেদের জানান দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে এদের কথিত ক্ষমতাও নির্ভর করে।

যতই এই গ্যাং কালচার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ততই কিশোররা পরিবারবিমুখ হচ্ছে। কারণ পরিবারের বাইরে কিশোররা তাদের কমফোর্ট জোন খুঁজে নিচ্ছে। আমরা পরিবার, সন্তানের জন্মদিনের কথা মনে রাখি না, কিশোররা এই উৎসব উপভোগ করছে পরিবারের বাইরে। আমরা সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে যাই না। কিশোররা এই ভালো লাগা বা খারাপ লাগা শেয়ার করছে গ্যাংয়ের সঙ্গে। বর্তমান সময়ে ভয়ংকরভাবে বেড়ে চলেছে মোবাইল গেমস। মোবাইল গেমসকেন্দ্রিক গ্যাংগুলো এখন আরও দৃঢ় হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে সমাজের দায়ই বেশি। মোবাইল গেমসের বিকল্প হিসেবে আমরা খেলার মাঠ নির্মাণ করতে পারিনি। শহরে যা মাঠ আছে সেসবও নানাভাবে বেদখল হয়ে থাকে। অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পরও বিপথে যাচ্ছে। কারণ সঠিক আদর্শ ও দীক্ষা তাদের সামনেও নেই। টিকটক আর ফানি ভিডিওতে বিনোদন খুঁজে নেওয়া এই প্রজন্ম আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য জগৎ সম্পর্কে জানে না। রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ পড়ে না। ফলে ফেইসবুকে কয়টি লাইক এলো বা এলো না তা নিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়। সুষ্ঠু সমাজ নির্মাণে বইয়ের বিকল্প নেই। বই পড়ার সুষ্ঠু পরিবেশও আমরা তৈরি করতে পারিনি। শহরের বুকে কয়টা পাঠাগার আছে? কিন্তু পানশালা তো ঠিকই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় পাড়ায় ফুটবল ক্লাব ছিল। শীতকালে ব্যাডমিন্টন আর বর্ষায় ফুটবল। কিন্তু এখন পাড়ায় হয়েছে কিশোর গ্যাং। বয়স্করা আফসোস করেন, বর্তমানে কিশোররা ভদ্রতা-নম্রতা জানে না। সে ভদ্রতা-নম্রতা শেখার দীক্ষা তো পাচ্ছে না কিশোররা।

তার ওপর যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ব্যবহার। রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিলে লোক লাগবে, এই লোকের জোগান দিতে ব্যবহার করা হয় কিশোর গ্যাংদের। অনেক মাদক কারবারি এদের ব্যবহার করে মাদক এজেন্ট হিসেবে। ফলে তরুণ ভুল থেকে ভুলতর পথে চলে যাচ্ছে।

সরকার ও পুলিশ প্রশাসন অনেক উদ্যোগ নিয়েছিল কিশোর গ্যাং বন্ধ করতে। কিন্তু আশাতীত সফলতা আসেনি। কারণ কিশোর গ্যাং কালচার শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট না, এটা সামাজিক সংকট।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সাভারের তিনটা কিশোর গ্যাং নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলাম। অনুসন্ধানে বুঝতে পেরেছিলাম এই তরুণদের বেশির ভাগ কর্মকান্ড সম্পর্কেই পরিবার ওয়াকিবহাল না।

দৃষ্টি আকর্ষণের ভয়ংকর প্রবণতা কিশোরদের গ্যাং করতে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে এলাকা ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও পাশের পাড়ার গ্যাংয়ের হুমকি কাউকে কাউকে গ্যাং তৈরি করতে বাধ্য করে। আমি প্রতিবেদন শেষে বেশ কয়েকজন কিশোরের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিবারের সঙ্গে কিশোরদের দূরত্ব ঘোচাতেই তারা এখন সম্প্রতি বেশ কিছু সামাজিক কাজ করছে। ফলে সমস্যার গোড়া চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগও নিতে হবে।

চলতি বছরের শুরুতে কভিড-১৯ গ্রামে ঘরবন্দি করে রেখেছিল। সে সময় এলাকায়ও কিছু কিশোর গ্যাং চোখে পড়ে। যাদের বেশির ভাগই বড় ভাইয়ের নির্দেশে এসব গ্যাং করে এবং রাজনৈতিক সমাবেশেই ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে টিকটক করাকে কেন্দ্র করেও গ্যাং গড়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ১৩-১৪ বছর বয়সের চেয়ে বড় কোনো বালাই নেই। এই বয়সে কিশোররা না পায় পরিবার, না পায় আদর, না পায় স্নেহ। এ সময়টায় নানা কৈশোরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও ছেলেরা যায়। এই শারীরিক পরিবর্তন তাদের মানসিকভাবেও প্রভাবিত করে। অন্যদিকে মোবাইল খুললেই টিকটক আর ফানি ভিডিও আর টিভি খুললেই রাজনীতির প্যাঁচাল আলাপ ছাড়া কিছুই নেই। ফলে দিশাহীন কিশোররা তলিয়ে যাচ্ছে এক হতাশাগ্রস্ত জগতে। এদের সুন্দর বেড়ে ওঠার পরিবেশ বিনির্মাণ করার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের।

কিশোরদের নিরাপদ কৈশোর নিশ্চিত করতে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। মোবাইল নয় বই তুলে দিতে হবে কিশোরদের হাতে। টিকটক নয় তাদের হাতে দিতে হবে ফুটবল। বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে হবে। কিশোর বয়সে পরিবার ও সমাজ থেকে মূল্যায়ন চায় সবাই। তাই এ সময়ে তাদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। মাঠে-ঘাটে ভালো বন্ধু দিতে হবে। সুন্দর আকাশ, সবুজ দিঘির পাড় আর নীল সাগর দেখতে তারা যেন একা বোধ না করে। পরিবার যেন তাদের আস্থার ঠিকানা হয় এসব ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে। বৃক্ষরোপণ, বই পড়া, ভাঙা রাস্তা নির্মাণ, পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলা, পত্রিকা পড়া, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সমাজের মান্য ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অনুভূতি জাগ্রত করতে হবে।

পুলিশি ভয় দিয়ে কিশোর গ্যাং বন্ধ করা যাবে না। তার জন্য সমাজের জনপ্রতিনিধিদের, শিক্ষক ও সমাজপতিদের কিশোরদের প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে এরা আমাদেরই সন্তান। তবেই আমাদের কিশোররা অনিরাপদ পথ ছেড়ে সত্য, সুন্দর ও মননশীল পথে পা বাড়াবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান বিশ^বিদ্যালয়, নয়াদিল্লি, ভারত