আলোকচিত্রী মার্ক রিবুর একাত্তরের বাংলাদেশ|321750|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
আলোকচিত্রী মার্ক রিবুর একাত্তরের বাংলাদেশ
মফিদুল হক

আলোকচিত্রী মার্ক রিবুর একাত্তরের বাংলাদেশ

মার্ক রিবু জগদ্বিখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী, তিনি মামুলি যুদ্ধ-চিত্রগ্রাহক নন, সংঘাতের নাটকীয় ছবি তোলার চেয়ে তার বেশি আগ্রহ দুঃসময়ে মানুষের বেদনা-কষ্ট-বিষাদ ও মানবিক সংগ্রামের ছবি তোলায়। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু হয়েছে ক্যামেরা হাতে তার এই অভিযাত্রা, যা তাকে নিয়ে গেছে চীনে, ভিয়েতনামে, আলজেরিয়ায়, কিউবায়, ভারতে, পাকিস্তানে, মধ্যপ্রাচ্যে, ইংল্যান্ডে, আমেরিকায় ও আরও নানা দেশে।

হালের দুনিয়ায় যে কেউ Marc Riboud  লিখে গুগলে সার্চ দিলে পাবেন মার্ক রিবু সম্পর্কে তথ্য ও ছবি। সেখানে রয়েছে সবচেয়ে আলোড়ন-জাগানিয়া সেই ছবি, ১৯৬৭ সালে আমেরিকার সামরিক হেডকোয়ার্টার পেন্টাগন ঘেরাও করার যুদ্ধবিরোধী মিছিলের দৃশ্য, যে মিছিলে এক তরুণী ফুল গুঁজে দিতে চাইছে মার্কিন ন্যাশনাল গার্ডদের উদ্যত বন্দুকের নলে। অচিরে এই ছবির বার্তা ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বময় এবং তারুণ্যের যে বিদ্রোহ ছিল সে সময়ের বৈশিষ্ট্য, দেশে দেশে প্রতিবাদী তরুণরা এই এক ছবিতে খুঁজে পেয়েছিল তাদের জীবনের দর্শন, সমরশক্তি ও রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে তারুণ্যের লড়াইয়ের সৌন্দর্য ও প্রত্যয়।

ছবিতে এই জীবনদর্শনই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন মার্ক রিবু, আর তাই নিজেকে তিনি অনেকভাবে আলাদা করে তুলতে পেরেছিলেন। ছবিতে মার্ক রিবু খুঁজে ফিরেছেন ভিজ্যুয়াল টেনডারনেস, দৃশ্যমান কোমলতা। ফলে তার ক্যামেরার চোখ ছিল অনেকের থেকে আলাদা। এই পার্থক্যই তার ক্যামেরায় জোগান দেয় শান্তি আন্দোলনের সেই শক্তিময় ছবির।

একাত্তরের নভেম্বরে ভারতে আসেন মার্ক রিবু, যে দেশে আগেও তিনি এসেছেন বহুবার। এবার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করবেন। ভারতে তার পরিচিতের সংখ্যা অনেক, তবে তিনি আর কালবিলম্ব করেননি, দিল্লি থেকে সোজা আসেন কলকাতায়, নভেম্বরের ২৩/২৪ তারিখ বিদেশি আলোকচিত্রগ্রাহক হিসেবে নাম তালিকাভুক্ত করে সংগ্রহ করেন প্রেস কার্ড। এরপর কলকাতা শহরে বেশ কিছু ছবি তোলেন, বাংলাদেশ মিশনের সামনে ভারতীয়দের সংহতি মিছিল, মিশনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মিশনের সাধারণ কর্মী এমনি বেশ কিছু ছবি তিনি তুলেছেন। মামুলি পোর্ট্রেট নয় এসব ছবি, যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দেখা যাচ্ছে বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপরত, পেছনের তাকে শোভা পাচ্ছে বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথের ছবি, মিশন-কর্মীর চেয়ারের পেছনের দেয়ালে পোস্টার ঝুলছে, লেখা আছে ‘লং লিভ মুজিব’, ‘উই ওয়ান্ট ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল’।

মার্ক রিবু পরিদর্শন করেন সল্ট লেকের বিশাল উদ্বাস্তু শিবির, কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ মাইল দূরের কৃষ্ণনগর উদ্বাস্তু শিবিরের সারি সারি তাঁবু ও তাঁবুবাসী উদ্বাস্তুদের দৈনন্দিন জীবনের ছবির পাশাপাশি যুব শিবিরের প্রশিক্ষণেরও ছবি তুলেছেন। উদ্বাস্তু শিবিরের অদূরে বিশাল বটের গায়ের সমান্তরাল ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকা কতিপয় শরণার্থী নারী-পুরুষের অসাধারণ ছবি ধরা পড়ে তার ক্যামেরার ফ্রেমে।

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমানবাহিনী পশ্চিম ভারতের একাধিক বিমানঘাঁটি আক্রমণ করলে শুরু হয় সর্বাত্মক ভারত-পাকযুদ্ধ। ফোর্ট উইলিয়ামে ইস্টার্ন কমান্ডে সাংবাদিকরা তালিকাভুক্ত হন যুদ্ধ-সাংবাদিক হিসেবে, তাদের পাঠানো হয় বিভিন্ন ফ্রন্টে। বেশির ভাগ সাংবাদিকের নজর ছিল আগরতলাকেন্দ্রিক চতুর্থ কোর্প্স্-এরদিকে, যারা সবার আগে ঢাকা পৌঁছাতে পারবে বলে ভাবা হয়েছিল। তুলনায় শিলং-তুরাভিত্তিক ১০১ কমিউনিকেশন জোনের দায়িত্ব ছিল সীমিত, তারা জামালপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চল মুক্ত করে পাকিস্তানি বাহিনীকে ঢাকায় সমবেত হওয়া থেকে আটকে রাখবে, এমনটা ছিল প্রত্যাশা। তো মার্ক রিবুকে পাঠানো হলো শিলং-এ, তার সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক পিটার কারমাইকেল এবং আর দুজন ভারতীয় সাংবাদিক। শিলং যেতে মার্ক রিবুর কোনো আপত্তি ছিল না, তিনি তো রণক্ষেত্রের সর্বশেষ বার্তা পাঠানোর দায়িত্ব নেননি, তার উদ্দেশ্য যুদ্ধের পটভূমিকায় মানুষের ছবি তোলা।

আমি মার্ক রিবুর পথরেখা অনুসরণের সুযোগ পেয়েছি একাত্তরের বাংলাদেশে তোলা তার ছবির সহস্রাধিক কন্টাক্ট প্রিন্ট দেখতে পাওয়ার সুবাদে। সেই সঙ্গে খোঁজার চেষ্টা করেছি তার সম্পর্কে কেউ কিছু লিখেছে কি না, কিংবা কারও কিছু জানা আছে কি না। এখনো আমাদের কাছে অনেক কিছু অস্পষ্ট, কোন ছবি কোথায় কাদের সঙ্গে তোলা, সেসব জানতে পারছি অল্প অল্প করে। তবে যেহেতু ছবির সূত্রে এই তথ্যানুসন্ধান চলমান থাকবে, তাই আমরা বুঝতে পারি তথ্য আহরণের বাস্তব সূত্র আমাদের কাছে রয়েছে, এর ওপর নির্ভর করে নিশ্চিতভাবে নির্মিত হবে তথ্যের সৌধমালা, যেখানে জামালপুর-শেরপুরের পুরনো মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা জোগান দিতে পারবেন অনেক মালমসলা।

৫/৬ ডিসেম্বর মার্ক রিবু ও অন্য তিন সাংবাদিক রিপোর্ট করেন বকশীগঞ্জ ভারতীয় বাহিনীর ক্যাম্পে। সদ্য পতন ঘটেছে কামালপুরের দুর্ভেদ্য ঘাঁটির। মাইন বিস্ফোরণে আহত হয়ে রণক্ষেত্র থেকে বিদায় নিয়েছেন জেনারেল গিল, তার স্থলে দায়িত্ব নিয়েছেন তার সহকারী মেজর জেনারেল নাগরা। সামনে পড়ে আছে কঠিন লড়াই। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে অগ্রসর হতে থাকেন মার্ক রিবু। শেরপুর মুক্ত হওয়ার পর জেনারেল অরোরা আসেন সেই শহরে আয়োজিত মুক্তির উৎসবে। সেখানে অনেক ছবি তোলেন মার্ক রিবু। তারপর ঘটে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে জামালপুর গ্যারিসন আক্রমণ অভিযান। এ ছিল ভয়ংকর যুদ্ধ, অনেক নাটকীয়তায়-পূর্ণ এই যুদ্ধে বিজয় ঘটে মিত্রবাহিনীর। এরপর তাদের অগ্রগতি আর ঠেকিয়ে রাখার উপায় থাকে না পাকিস্তানি বাহিনীর। সেসব অভিযান শেষে ১৬ ডিসেম্বর মধ্যদুপুরে ঢাকায় প্রবেশ করেন মার্ক রিবু, মুক্ত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অসাধারণ সব ছবি ধরা পড়ে তার ক্যামেরায়।

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শুরু হবে মার্ক রিবুর একাত্তরের পঞ্চাশটি ছবি নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী Bangladesh 1971 : Mourning and Morning. বাংলাদেশের দুঃখ বিষাদ এবং নতুন প্রভাতের উদ্ভাসন, দুই-ই প্রত্যক্ষ করেছেন মার্ক রিবু। ৫০ বছর পর সেসব অদেখা ছবি উন্মোচিত হবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য, ইতিহাসের আরেক উদ্ভাসন ঘটানো যে-প্রদর্শনী বহুদিক দিয়ে তাৎপর্যময়।

সবচেয়ে বড় কথা এই প্রদর্শনী যেমন আমাদের ফিরিয়ে দেবে অতীতের স্মৃতি ও গৌরব, তেমনি আমরা এখানে নতুন করে খুঁজে পাব নিজেদের, পাব আগামীর পথচলার প্রেরণা। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে মানবতার সম্পৃক্তির অনন্য পরিচয় এখানে গাঁথা রয়েছে। মানবতার দায়ভার নিয়ে মার্ক রিবুর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন বিশ শতকের আলোকচিত্রের ইতিহাসের বিস্মৃত এক অধ্যায়কে আবার দেবে নতুন প্রাণ। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এ আমাদের বড় পাওয়া।