দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা|321751|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা
রাজেকুজ্জামান রতন

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। দারুণ খবর! সরকার উৎফুল্ল, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস কি আছে? নেই। কারণ সে তো তার নিজের আয় বৃদ্ধি দেখছে না, দেখছে সব জিনিসের দাম বৃদ্ধি। কী কী কারণে দাম বেড়েছে তা ব্যাখ্যা করছে সরকার এবং ব্যবসায়ী মহল। কিন্তু খাদ্যপণ্যের বাজারে আগুনের হলকা ছুটছে। সাধারণ মানুষের জন্য খাওয়া শুধু তৃপ্তির বিষয় নয়, পুষ্টির প্রয়োজন মেটানোর বিষয়ও বটে। ঠিকমতো না খেলে শরীরে শক্তি পাবে কীভাবে? ছোটবেলা এ কথা শোনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যদি সেই খাবারে এবং পুষ্টিতে টান ধরায় তখন পেটের কষ্টের সঙ্গে মানসিক কষ্টও বেড়ে যায়। নিরুপায় মানুষ বাজারে কেনাকাটা করে আর অসহায়ের মতো বলে সব জিনিসের দাম বাড়লে বাঁচব কীভাবে? সরকার কি কিছু করবে না? 

সাধারণ মানুষ প্রতিদিন যা খায়-দায় সেসবের প্রায় সবকিছুরই দাম বাড়ছে। খাদ্যদ্রব্য যেমন চাল, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, মুরগি, ডিম কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলবেন? দাম বেড়েছে এবং বেড়েই চলেছে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে গায়ে মাখার সাবান, যা এখন সুগন্ধি সাবান বলে পরিচিত তার দামও বেড়েছে, দাম বেড়েছে কাপড় কাচার সাবান, টিস্যু, টুথপেস্ট, নারিকেল তেল, সরিষার তেল এসব কিছুরও। তাহলে রান্নার গ্যাস বা বাকি থাকবে কেন? বিশ্ববাজারের অজুহাতে এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম গত ৪ মাসে ৪ বার বাড়িয়ে এখন তা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৫৯ টাকা। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১০৩৩ টাকা, আগস্ট মাসে ছিল ৮৯১ টাকা। অন্যদিকে শাকসবজির মতো ‘নিম্নমানের’ জিনিস দিয়ে ভাত খায় এ কথা বলতে অনেকের লজ্জা হলেও এসবের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিক্রেতার কিন্তু কোনো লজ্জা নেই। সাধারণ মানুষ যা কেনে তার দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের একমাত্র বিক্রয়যোগ্য পণ্য শ্রমশক্তির দাম কিন্তু বাড়ে নাই। বেতন বাড়ে নাই শ্রমিকের এবং বেসরকারি খাতে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর। তাদের জীবনে টানাটানির আর শেষ নেই। জীবনযাপনের কঠিন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন তারা। তবে এই অসম যুদ্ধে মার খেয়েই যাচ্ছে মধ্যবিত্তের নিচের অংশ, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্ররা।

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির হার ৫.৮ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছর দ্রব্যমূল্য ১০০ টাকা হলে এবার তা হয়েছে ১০৫ টাকা ৮০ পয়সা। এই হিসাবের সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতা মেলে না কোনোভাবেই। কারণ বাজারে মোটা চাল এখন ৫০ টাকা, আটা ৩৪, ময়দা ৪৪, সয়াবিন তেল ১৫০, চিনি ৮৫, মসুর ডাল ৯০ ও মুরগি ১৭৫ টাকা সাধারণভাবে বিক্রি হচ্ছে। এলাকাভেদে এর সঙ্গে দু-এক টাকা যোগ হতে পারে। টিসিবির বাজারদরের তালিকার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে ২০২০ সালের তুলনায় চালের দাম গড়ে ৩১ শতাংশ, আটা ২০, ময়দা ৩৩, সয়াবিন তেল ৪৫, চিনি ৫০ ও মসুর ডাল ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আর রান্নার গ্যাসের দাম তো আগস্ট মাসের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়কালে পানির দাম বাড়ানো হয়েছে, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে এবং আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। সব আঘাত এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে এবং সংসারে। নিশ্চিত মূল্যবৃদ্ধি এবং অনিশ্চিত আয় সাধারণ মানুষের জীবনকে দিশেহারা করে দিচ্ছে। কিন্তু মানুষের জীবন তো আর থেমে থাকে না। সে চলতেই থাকে। তবে কমে গেছে গতি আর বেড়েছে দুর্দশা। কোনো মতে বেঁচে থাকার নানা কৌশল আবিষ্কার করছেন তারা। কেমন আছেন এ কথা যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে একটু হাসির মতো ভঙ্গি করে বলেন এই তো চলছে, কিন্তু এগোচ্ছে না। 

বাংলাদেশের অতিধনী, ধনী এবং উচ্চমধ্যবিত্তদের জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি তেমন কোনোই প্রভাব ফেলে না। বরং তারা অনেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশের জিনিসপত্রের দাম পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে কম, তার পরও দ্রব্যমূল্য নিয়ে কথা বলাটা এ দেশে একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কাছে উদাহরণ ইউরোপ-আমেরিকা। যদিও সেসব দেশের মানুষের আয়-রোজগার কেমন সেটা তারা বলেন না। ৮০ শতাংশের বেশি মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষরাই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরায় কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি যে তাদের সংসারের চাকাকে শ্লথ করে দেয় সেটা এসব মানুষের অনুভব করার ইচ্ছাও নেই। যদিও এই উচ্চবিত্তরাই দেশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

একটি পাঁচ সদস্যের পরিবারের কথা যদি ধরা যায় তাহলে একটা সম্ভাব্য ব্যয়বৃদ্ধির হিসাব বুঝতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। মাসে ৫০ কেজি চাল, ৫ লিটার তেল, ৫ কেজি পেঁয়াজ, মাছ-মাংস ১০ কেজি (এক দিন পর এক দিন মাছ অথবা মাংস খেলে), ডিম ৫ ডজন (দিনে ২টি ডিম ৫ জনে খাওয়া), ডাল ৫ কেজি, চিনি ৩ কেজি, লবণ ২ কেজি, তেল-সাবান-গুঁড়ো সাবান-টুথপেস্ট, শাকসবজি, তরিতরকারি আর একটু চা খাওয়ার বিলাসিতা করলে মাসে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা খরচ বেড়ে যাচ্ছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে। যার মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা তিনি কীভাবে এই ব্যয় বৃদ্ধি সামাল দেবেন তা ভাবলে কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়বে সবারই।

কিন্তু যাদের এ বিষয়গুলো দেখার কথা তারা কী বলছেন? পেঁয়াজের দাম নিয়ে মন্ত্রী বলছেন, দেশে পেঁয়াজের সংকট নেই। ৫ লাখ টন পেঁয়াজ আছে। এই পেঁয়াজে দেশের তিন মাস চলবে। আমরা তো জানি নভেম্বরের শেষে দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসবে। তাহলে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির এই কারণ কী? যার উত্তরে আবার সচিব বলছেন, আরও এক-দেড় মাস পেঁয়াজের দাম বাড়বে। এটা কি ভোক্তাদের সতর্ক করলেন না ব্যবসায়ীদের ইশারা দিলেন তা তো বোঝা গেল না! তবে সাধারণ মানুষ বুঝলেন যে একটা টোটাল ফুটবল খেলার মতো খেলা চলছে। একজন বল এগিয়ে দেন অন্যজন গোলবারে শট নেন। দারুণ সমঝোতা! ভারতের পেঁয়াজের দাম বাড়লে তা না হয় আমদানি করা পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু দেশি পেঁয়াজের দাম কেন বাড়বে এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? মাসে যদি ২ লাখ টন পেঁয়াজ প্রয়োজন হয় আর প্রতি কেজিতে ৩০ টাকা পেঁয়াজের দাম বাড়ে তাহলে ক্রেতা বা ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত বেরিয়ে যায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। কথায় বলে পেঁয়াজ মানুষকে কাঁদায়। বাংলাদেশে পেঁয়াজ কাঁদায় কৃষককে যখন সে খেতের ফসল বিক্রি করে, পেঁয়াজ কাঁদায় ক্রেতাকে যখন সে বেশি দামে কেনে আর সর্বশেষে কাঁদায় যিনি পেঁয়াজ কাটেন তাকে। কিন্তু হাসায় একদল ব্যবসায়ীকে। যারা প্রতি বছর অপেক্ষায় থাকে সেপ্টেম্বর মাসের জন্য যখন সে দাম বাড়াবে। এই ব্যাপার চলছে সমস্ত ভোগ্যপণ্যের বেলাতেই এবং দুর্ভাগা ক্রেতারা এই প্রক্রিয়ার অসহায় শিকারে পরিণত হচ্ছে নিয়মিতভাবেই। বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে সবকিছুর দাম বাড়ান তারা। কিন্তু বিশ্ববাজারে চালের দাম যে কম, তাহলে বাংলাদেশে কমছে না কেন? ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ সব চাল উৎপাদনকারী দেশে চালের দাম গত বছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কমে গেছে আর বাংলাদেশে ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে আর কোথায় পাওয়া যাবে?

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের পদক্ষেপ একটাই, তা হলো ট্রাকে করে টিসিবির পণ্য বিক্রি। সেটা যে কত অপ্রতুল তা উদ্যোগ এবং আয়োজন দেখলেই বোঝা যায়। ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের ঢাকা মহানগরীতে ৫০০ ট্রাক দিয়ে চিনি, তেল ও ডাল বিক্রি করছে তারা। এসব ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে একটু মূল্য সাশ্রয়ের জন্য প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে মানুষ কত কষ্ট করছে। এক কেজি চিনিতে সরকার নানা ধরনের শুল্ক, কর নিয়ে থাকেন ২৮ টাকা, এক লিটার সয়াবিন তেল থেকে নেন ২০ টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর ২০ লাখ টন চিনি থেকে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ২০ লাখ টন তেল থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা সরকার পেয়ে থাকে। তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা! সরকার নিচ্ছে নানা ধরনের শুল্ক এবং কর, ব্যবসায়ীরা করছেন বাধাহীন মুনাফা। আর মূল্যবৃদ্ধির কোপটা এসে পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ঘাড়ে। সরকার অবশেষে ব্যবসায়ীদের দিকে তাকিয়ে পেঁয়াজ এবং চিনির ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিল। পেঁয়াজ আমদানিতে কোনো শুল্ক থাকবে না, চিনি আমদানিতে শুল্ক ৩০ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। বাজারে কি এর কোনো প্রভাব পড়বে? অতীতের অভিজ্ঞতা বলে যে এর ফলে ব্যবসায়ীদের মুনাফা বাড়লেও ক্রেতারা সুফল পাবেন না। বরং সরকার এই অনুরোধ করতে পারে দেশে ৪ কোটি পরিবারে যদি প্রতিদিন ২টি করে পেঁয়াজ কম খান তাহলে মাসে ১ লাখ টন পেঁয়াজ কম লাগবে। দেশে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি থাকবে না।

খাদ্যপণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ, শিক্ষার খরচসহ সমস্ত খরচ। এমনকি রিকশা-সিএনজিচালক বলছে তাদেরও তো পোষায় না, তাই একটু বাড়তি ভাড়া চায়।

আয়ের পথ সংকীর্ণ হলেও ব্যয়ের সব পথ দিন দিন আরও প্রশস্ত হচ্ছে। ফলে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধি, সমাজে দুর্নীতি বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের দমনপীড়ন বৃদ্ধি আর জনগণের দুর্দশা বৃদ্ধির এই চক্রে কি দেশ ঘুরপাক খেতেই থাকবে?    

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]