শিক্ষার্থীদের টিকাদান ত্বরান্বিত হোক|321752|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
শিক্ষার্থীদের টিকাদান ত্বরান্বিত হোক

শিক্ষার্থীদের টিকাদান ত্বরান্বিত হোক

করোনাভাইরাস মহামারীতে দেশের চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। টানা দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুললেও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের স্বাভাবিকরূপে ফেরা এখনো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় গত ১২ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়ার পরও প্রতিদিন সব শ্রেণিতে ক্লাস হচ্ছে না স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এখন শুধু চলতি বছরের ও আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। আর তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে দুই দিন এবং অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এক দিন সশরীরে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান স্বাভাবিক হওয়ার ক্ষেত্রে করোনা সংক্রমণের অনিশ্চিত পরিস্থিতির পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের টিকাকরণের সংকট। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, সব শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া শেষ করার পরই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু টিকা নেওয়ার বয়স হয়েছে এমন সব শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া শেষ করতে কত সময় অপেক্ষা করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে, উপরিউক্ত বাস্তবতা থেকে এটা স্পষ্ট যে ২০২১ সালের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে না। এ বিষয়ে তাই সরকারের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

দেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থী যেমন শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে ব্যাকুল হয়ে রয়েছে, তেমনি শিক্ষক ও অভিভাবকরাও এ অচলাবস্থা কাটার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যে বক্তব্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সরকার আপাতত কীভাবে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসএসসি ও এইচএসসির মতো দুটি বড় পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া শেষ করা যায়, সে বিষয়েই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। আগামী নভেম্বর মাসে এসএসসি ও ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে এখন দেশে ১২ থেকে ১৭ বছরের শিক্ষার্থীদের টিকাদানের বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আর ১৮ বছর ও এর চেয়ে বেশি বয়সের শিক্ষার্থীদের টিকাদান শেষ না হলেও আরও আগেই শুরু হয়েছে। বয়সের বিবেচনায় এই শিক্ষার্থীদের ভাগ করলে দেখা যাচ্ছে, ১২ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা মূলত প্রাথমিক স্তরের। অর্থাৎ এখন টিকার আওতায় আসবে আসলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরাই। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, ‘প্রাথমিকে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে অনুমতি পেলেই স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা হবে। প্রশ্ন হলো, তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিতে সশরীরে পাঠদান আটকে থাকছে কেন?

আশার কথা হলো, গত বৃহস্পতিবার ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকাদানের কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। শিশুদের পরীক্ষামূলক এ টিকাদান কর্মসূচির প্রথম দিন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ৪টি বিদ্যালয়ের ১২০ শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হয়। টিকা দেওয়া হচ্ছে এমন শিক্ষার্থীদের ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। কম বয়সীদের শরীরে টিকার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি না, সে জন্যই এই পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। এরপর ঢাকায় বড় আকারে এই টিকা কার্যক্রম শুরু হবে। এ জন্য রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। ১৮ অক্টোবরের মধ্যে এ তথ্য মাউশিতে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই বয়সসীমার শিক্ষার্থীদের ওপর এখন ফাইজারের টিকার ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফাইজারের এই টিকা আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এই বয়সীদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে টিকার পাশর্^প্রতিক্রিয়াগত কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই বলেও আশা প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী সব শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া শেষ করতে আসলে কত দিন সময় লাগতে পারে। মানিকগঞ্জে শিক্ষার্থীদের টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে এখন ৬০ লাখ টিকা আছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হবে। আগামীতে শিক্ষার্থীদের ১ কোটি টিকা দেওয়া যাবে। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে যেমন শিক্ষার্থীদের টিকাকরণ সম্পন্ন করার কোনো রোডম্যাপ পাওয়া গেল না, তেমনি দেশে টিকার মজুদ কিংবা আগামীতে টিকাপ্রাপ্তির কোনো ধারণাও পাওয়া গেল না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো‘ব্যানবেইস’-এর ২০২০ সালের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। প্রাথমিক পড়ুয়া ১২ বছরের কম বয়সীদের বাদ দিলে এই ২ কোটিই টিকা নেওয়ার যোগ্য। ফলে এই শিক্ষার্থীদের টিকাদান সম্পন্ন করে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।