‘আর কোনো আশা নেই’|322074|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ অক্টোবর, ২০২১ ১৯:৪৭
‘আর কোনো আশা নেই’
অনলাইন ডেস্ক

‘আর কোনো আশা নেই’

কিশোরী আমেনা গত মে মাসে তার স্কুলে ইসলামিক স্টেটের বোমা হামলায় কয়েক ডজন সহপাঠী মেয়েকে মরতে দেখেছে, কিন্তু তারপরও সে তার শিক্ষা চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল।

এখন দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের মতো সেও স্কুলে যেতে পারছে না। এক মাস আগে তালেবানরা তার স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করে।

১৬ বছর বয়সী আমেনা পশ্চিম কাবুলে তার বাড়িতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি পড়াশোনা করতে চাই, আমার বন্ধুদের দেখতে চাই এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত চাই, কিন্তু এখন আমাকে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না’।

‘এই পরিস্থিতি আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমি খুবই দুঃখিত এবং রাগান্বিত হয়ে আছি’।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের নতুন ইসলামপন্থী শাসকরা ১৩ বছর বা তার বেশি বয়সের পুরুষ শিক্ষক এবং ছেলেদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু নারী শিক্ষক বা হাইস্কুল ছাত্রীদের ক্লাসে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

তালেবানরা পরে বলেছে যে, বয়স্ক মেয়েরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ফিরে যেতে পারবে। তবে তার আগে ইসলামী শরিয়া মোতাবেক নিরাপত্তার এবং কঠোরভাবে নারী-পুরুষের আলাদা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে ইতিমধ্যেই কুন্দুজ প্রদেশ সহ কয়েকটি প্রদেশে মেয়েদের হাইস্কুলে ফিরে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইউনিসেফের একজন সিনিয়র নির্বাহী শুক্রবার বলেন, এক তালেবান নেতা জাতিসংঘের শিশুদের সংগঠনকে জানিয়েছেন যে, সব মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার একটি কাঠামো শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে।

কিন্তু আপাতত, রাজধানী কাবুল সহ দেশ জুড়ে মেয়েদের হাইস্কুলে যাওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে।

এদিকে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সব শিশুদের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরাও ক্লাসে যেতে পারছে। তবে তাদের পোশাক এবং চলাফেরায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

 

‘কোনো আশা নেই’

আমেনা তার সৈয়দ আল-শুহাদা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে একটু দূরেই থাকেন, যেখানে গত মে মাসে বোমা হামলায় ৮৫ জন অল্পবয়সী মেয়ে মারা যায়।

‘নিরীহ মেয়েদের হত্যা করা হয়েছে,’ আমেনা বলল, তার চোখে পানি টলটল করছিল।

‘আমি নিজের চোখে মরে যাওয়া এবং আহত মেয়েদের দেখেছি। যাইহোক, আমি এখন আবার স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম’।

আমেনা দশম শ্রেণিতে পড়বে জীববিজ্ঞানের মতো তার প্রিয় বিষয় নিয়ে, কিন্তু তার পরিবর্তে হাতে গোনা কয়েকটি বই নিয়ে ঘরে আটকে আছেন, ‘বিশেষ কিছু করছেন না’।

এই কিশোরী বলেন যে, তিনি একজন সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু এখন ‘আফগানিস্তানে আর কোনও আশা নেই’।

তার ভাইবোনরা তাকে বাড়িতে সাহায্য করে এবং মাঝে মাঝে তিনি একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছ থেকে শিক্ষা পান, যিনি তার ছোট বোনকে দেখতে আসেন। তবে এখনও আমেনা স্কুলের সেই ভয়াবহ হামলার কথা ভুলতে পারেননি।

আমেনা বলেন, ‘তারা বলে- আপনি স্কুলে যেতে না পারলে বাড়িতে পড়াশোনা করুন, বাড়িতে বসে পড়ুন যাতে আপনি ভবিষ্যতে কিছু একটা হতে পারেন’।

আমেনা বলেন, ‘আমার ভাই বাড়িতে গল্পের বই নিয়ে আসে, আমি সেগুলো পড়ি। এবং আমি সবসময় খবর দেখি’।

কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না কেন ছেলেদের পড়াশোনা করতে দেওয়া হয় এবং মেয়েরা কেন নয়।

তিনি বলেন, ‘সমাজের অর্ধেক মেয়েদের এবং বাকি অর্ধেক ছেলেদের নিয়ে গঠিত। তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই’।

‘কেন আমরা পড়াশোনা করতে পারি না? আমরা কি সমাজের অংশ নই? কেন শুধু ছেলেদেরই ভবিষ্যৎ থাকা উচিত?’

 

সাম্প্রতিক অগ্রগতি

২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মেয়েদের শিক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়।

স্কুলের সংখ্যা তিনগুণ এবং নারী সাক্ষরতা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০ শতাংশ হয়েছে, কিন্তু এই পরিবর্তন মূলত শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল।

কাবুল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষক নাসরিন হাসানি বলেন, ‘আফগান নারীরা গত ২০ বছরে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন’।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ‘আমাদের এবং শিক্ষার্থীদের মনোবল দুটোই কমিয়ে দিয়েছে’, তিনি বলেন, তালেবানদের যুক্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন এই বলে যে, ‘যতদূর আমরা সবাই জানি, ইসলাম ধর্ম কখনোই নারীদের শিক্ষা ও কাজে বাধা দেয়নি’।

হাসানি বলেন, তিনি তালেবানদের সরাসরি কোনো হুমকির সম্মুখীন হননি।

কিন্তু অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট করেছে যে, একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন এবং তাকে ছেলে-মেয়েদের সহ-শিক্ষামূলক খেলাধুলা শেখানোর জন্য বিচারের জন্য তলব করা হয়েছিল।

হাসানি বলেন, তিনি আশা করছেন যে তালেবানরা তাদের নির্মম ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের শাসনামল থেকে ‘একটু ভিন্ন’ হবে। সেসময় নারীদের এমনকি তাদের বাড়ি থেকেও পুরুষ ছাড়া বের হতে দেওয়া হয়নি।

 

কবর দেওয়া স্বপ্ন

২০০১ সালের বহু বছর পর সেই সময়ের কোনো স্মৃতি নেই কিশোরী জয়নবের এবং তালেবানরা নিষেধ না করা পর্যন্ত স্কুলে যেতে পছন্দ করতেন তিনি।

গত মাসে যখন ছেলেরা স্কুলে ফিরে যায় সে সময় ১২ বছর বয়সী জয়নব ‘ভয়ঙ্কর অনুভূতি’ নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।

‘এটা বেশ স্পষ্ট যে, দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে’, বলেন জয়নব।

তার ১৬ বছর বয়সী বোন মালালাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন যে তার ‘হতাশা এবং ভয়ের অনুভূতি’ হচ্ছে।

মালালাই তার ঘরের চারপাশের কাজে সাহায্য করা, পরিষ্কার করা, বাসন ধোয়া এবং কাপড় ধোয়ার কাজ করে তার সময় কাটান।

তিনি বলছিলেন যে, তিনি তার মায়ের সামনে কান্না না করার চেষ্টা করেন, ‘কারণ তার ওপর অনেক চাপ রয়েছে’।

এই কিশোরীর স্বপ্ন ছিল নারীর অধিকারের জন্য লড়াই করা এবং সেই পুরুষদের বিরুদ্ধে কথা বলা যারা তাকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

তিনি বলেন, ‘আমার অধিকার হল স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া। আমার সমস্ত স্বপ্ন এবং পরিকল্পনা এখন কবর দেওয়া হয়েছে’।