জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে, মূর্খতা জেঁকে বসবে|322242|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে, মূর্খতা জেঁকে বসবে
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে, মূর্খতা জেঁকে বসবে

দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখনই ভূতের আছর বাড়ছে। ঈর্ষাকাতর গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বিকলাঙ্গরা ভূত সাধনায় ব্যস্ত থাকছে। ওরা জানে ভূতের পা উল্টো। তাই এরা হাঁটলে পেছনের দিকে যাবে। এভাবে দেশকে যদি পিছিয়ে দেওয়া যায় এদের প্রাপ্তি এখানেই। দুর্গাপূজার উৎসব নিয়ে কিছুটা দুর্ভাবনা আমার ছিল। কারণ জঙ্গি ও জঙ্গি ভাবধারার মানুষ এসব আয়োজনের ভেতরেই পানি ঘোলা করে মাছ ধরার চেষ্টা করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থানে মন্ডপে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়তো সম্ভব হয়নি, তাই ভিন্নপথ নিয়েছে। আমার মনে হয় এসব ভূত-সাধকরা তেমন মেধাবী হয় না। তাই অপরিপক্ব কান্ড ঘটিয়ে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করেছে। এ কারণেই মন্ডপে সুবিধা করতে না পেরে কুমিল্লায় বাড়ির বাইরে রাতের অন্ধকারে একটি ডামি উপবিষ্ট হনুমান মূর্তির ঊরুতে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে গেছে কোনো ভূত উপাসক। দিনের আলো ফুটতেই ‘মূর্তির পায়ের নিচে পবিত্র কোরআন’ অর্থাৎ ‘কোরআন অবমাননা করা হয়েছে’, এমন স্ট্যাটাস ও ভিডিও ছড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব করা হয়েছে। আরও বিস্ময়কর খুব দ্রুততার সঙ্গে ‘তওহিদি জনতার’ ব্যানারে একদল মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবই যেন একটি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। আগে থেকেই যেন প্রস্তুতি ছিল একটি অপকান্ড ঘটানোর জন্য।

আমার পরিচিত এক সাংস্কৃতিক কর্মী ছাত্রের টেলিফোনে আমি প্রথম এই ভুতুড়ে কান্ড সম্পর্কে জানতে পারলাম। ওর মন্তব্যটি যথার্থ মনে হলো। বলল, স্যার মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো দুর্বৃত্তের আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হবে যে তারা পবিত্র কোরআন শরিফ জোগাড় করে মূর্তির পায়ের কাছে রাখতে যাবে! এ নিশ্চয়ই রামুকান্ড, নাসিরনগর-কান্ডের মতোই আরেক নাটক! আমি ভাবছি অন্য কথা। আবহমান বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের খোঁজ যারা রাখেন তারা জানেন এ দেশে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বরাবর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। পবিত্র কোরআনের তাত্ত্বিক দর্শন না বোঝা নিজ ধর্মের শিক্ষা সম্পর্কে অনেকটাই মূর্খ কিছুসংখ্যক সুবিধাবাদী দীক্ষা গুরু বা রাজনৈতিক নেতাদের উসকানিতে ‘তওহিদি জনতা’ বা এ ধরনের তকমা গলায় ঝুলিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের ধর্মমন্দির বা বাড়িঘর ভাঙচুরে মেতে উঠছে। তারা বুঝতে পারছে না এ ধারার আচরণ করে এরা ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্যের মুখে কালিমা লেপন করছে।

ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আরেকটি প্রশ্ন আমাকে ভাবায়। তা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সাংবিধানিকভাবে ছিল ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান’। কিন্তু তখন এত মাদ্রাসার ছড়াছড়ি ছিল না। স্কুলে বার্ষিক মিলাদ মাহফিল হতো। প্রায় বছরই এদিন ওয়াজ করার জন্য শিক্ষিত কোনো আলেমকে আনা হতো। তাদের বক্তৃতা আমাদের আকৃষ্ট করত। একজনকে মুরতাদ ঘোষণা করা, আরেক দলকে অমুসলিম ঘোষণা করার দাবি এসব অসুস্থতা তখন তেমন একটা দেখা যেত না। এখন দেশে লোকসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। স্কুল-কলেজের চেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মাদ্রাসার সংখ্যা। গ্রামগঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় মাদ্রাসার অন্ত নেই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যেখানে ইসলামি শিক্ষার সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ার কথা, সেখানে তারা অন্ধকার ছড়াচ্ছে।

প্রায় পনেরো-ষোলো বছর আগের কথা। আমি একটি হলের প্রভোস্ট। হল মসজিদের জন্য একজন ইমাম নিয়োগ করা হবে। ইন্টারভিউ বোর্ডে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পেশ ইমাম ছিলেন। প্রার্থীদের অনেকেই বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করে আসা। আলাপে দেখলাম তারা ধর্মকে যেমন গভীরভাবে জানে না, তেমনি জাগতিক জীবনের শিক্ষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। মনে পড়ে, মিরপুরের কোনো এক মাদ্রাসার ছাত্রকে কোনো প্রশ্ন করেও যখন উত্তর পাচ্ছিলাম না, তখন জানতে চাইলাম কাজী নজরুল ইসলামের নাম শুনেছে কি না। সে জানাল, শুনেছে। বললাম, নজরুল ইসলামের কোনো কবিতা বলতে পারো। তার মুখের অবস্থা দেখে মনে হলো এর চেয়ে কঠিন প্রশ্ন জীবনে আর শোনেনি। একজনকে প্রশ্ন করলাম, বাংলাদেশে কখন থেকে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছে। উত্তরে জানাল, বাবা আদম আলাইহে ওয়াসাল্লামের সময় থেকে। তখনই বুঝতে পারলাম সেয়ানারা নিজেদের সুবিধার ফসল ঘরে তুলতে এদের উসকে দিয়ে পথে নামাতে পারে সহজেই।

পাঠক লক্ষ করবেন, অন্যান্য সময়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরি করে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের মতো সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করার পরপরই হেফাজতে ইসলামের মতো স্বঘোষিত ইসলাম হেফাজতকারী নেতারা অগ্নিঝরা বক্তব্য দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছে। তালেবে এলেমদের দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে, লুটপাট করেছে। এবার কিন্তু এই জেহাদিরা তেমন কড়া বক্তব্য রাখেননি। বরং দোষীদের শাস্তি দাবি করেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলেছেন। এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে কুমিল্লার কথিত পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনা সাজানো। এমন একটি বাস্তবতায় আবার কেমন করে নোয়াখালীতে, রংপুরে এবং আরও কোনো কোনো জায়গায় হিন্দুর মন্দির ও বাড়িতে হামলা চালানো হলো। এ ক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো। কুমিল্লার ঘটনার পর যেখানে সরকারি প্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার কথা ঘোষণা করেছে, সেখানে তো আর কারও দাবি করার অবকাশ নেই। তার পরও দেখলাম গত শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে ‘মালিবাগ মুসলিম যুবসমাজ’ ব্যানার নিয়ে একদল লোক সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। সুতরাং এদের উদ্দেশ্যগুলো উন্মোচিত হওয়া জরুরি।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে যুগ যুগ ধরে সরল মানুষদের ধর্মান্ধ জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করেছে। এই সরল মানুষদের মুক্তবুদ্ধি আর চেতনার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একচোখা গন্ডারের মতো অন্ধ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে মানবতা ও সভ্যতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে। ব্যক্তিগত লাভের ফসল ঘরে তুলতে নিজ ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। খ্রিস্টান, হিন্দু, ইসলাম সব ধর্মের নামাবরণে এ ধারার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অশুভ অবস্থান আগেও দেখা গিয়েছে এখনো যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এ সময় ইসলামের নাম ভাঙানো জঙ্গিবাদ শান্তিবাদী মানবিক ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছে।  জঙ্গিদের অপকর্মের লক্ষ্য অভিন্ন থাকে বলেই বেশ কয়েক বছর আগে দেখছি আইএস জঙ্গিদের উন্মত্ততায় প্রাচীন এশেরীয় সভ্যতার প্রত্ননিদর্শন ধ্বংস আর বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার লেখকদের হত্যাকান্ডের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। দুই ক্ষেত্রেই অপব্যাখ্যা দিয়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে আর মানবতাকে করা হয়েছে অপমানিত। পবিত্র বোখারি শরিফে ‘কিতাবুল ইলম’ পর্বে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কিয়ামতের আলামতগুলোর একটি হলো, জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে এবং মূর্খতা জেঁকে বসবে।

আমরা কি এখন এই আলামতই দেখছি? যেখানে ইসলামে জ্ঞানচর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেখানে আকাট মূর্খরা সংস্কৃতি লালন করার বদলে কীভাবে সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বদ্ধ উন্মাদের মতো ধ্বংস করছে আর বিশ্ববাসীর কাছে একটি প্রগতিবাদী ধর্ম ইসলামকে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে তা দেখে শঙ্কিত হতে হয়। কে বিশ্বাসী আর কে বিশ্বাসী নয় এবং কে নাস্তিক আর কে আস্তিক এই বিচারের দায়িত্ব কি মহান আল্লাহ মানবের কাছে দিয়েছেন? আমার চোখে যে নিকৃষ্ট আল্ল­াহর দৃষ্টিতে সে নিকৃষ্ট নাও হতে পারে! একজন নাস্তিকের দন্ড দেওয়ার আমি কে? কাউকে হত্যা করার অধিকার কি আমার আছে? যদি ধর্মই মানি তবে মানতে হবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে অপরাধী হলে অপরাধীর শাস্তি বিধানের মালিক তো একমাত্র আল্ল­াহ। আর জাগতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। অথচ অন্ধ ও ভয়ংকর মূর্খের মতো ধর্ম রক্ষার নামাবরণে উন্মাদরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে মনে করছে হয়তো একটি মহৎ দায়িত্ব পালন করল। অথচ মানবতার বিচারে এবং ধর্মের দৃষ্টিতে তারা যে ভয়াবহ পাপের কাজ করে ফেলল তা এসব ধর্মান্ধ মূর্খরা বুঝতেই পারল না।

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস গবেষণা আমার অন্যতম চর্চার বিষয়। তিন দশক ধরে চেষ্টা করেছি বিশ্বসভ্যতা-বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করতে। এ-সংক্রান্ত আমার লেখা বিভিন্ন বই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীরা পড়ে। কথাটি বলতে হলো এজন্য যে, বিশ্বসভ্যতার নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমি জড়িয়ে আছি। পাশাপাশি আমি ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের ছাত্র। পূর্বপুরুষদের গড়া সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব প্রজন্মকে প্রাণিত করে। একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে এসব প্রেরণার প্রয়োজন অনেক বেশি। এ কারণেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্ন-আইন রয়েছে। তাতে অতি যতে্ন ও সতর্কতায় প্রত্নসম্পদ রক্ষা করতে হয়। সে জাতিই সাংস্কৃতিক মননশীলতায় উজ্জ্বল যারা নিজ দেশের এবং অপরের প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণে দায়িত্বশীল থাকে। অথচ আমরা দেখেছি ইসলামিক স্টেটস বা আইএস নামের সংগঠনের মূর্খ উন্মাদ কিছুসংখ্যক জঙ্গি হাজার হাজার বছর ধরে অতি যতে্ন সংরক্ষণ করা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার এশেরীয় সভ্যতার মহামূল্যবান প্রত্ননিদর্শন ধর্মের অপব্যাখ্যায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আর একাজ করে একুশ শতকের আধুনিক বিশ্বের মানুষের কাছে ইসলামকে অসংস্কৃত সংকীর্ণ ধর্ম হিসেবে পরিচিত করাচ্ছে। অথচ ইসলাম হচ্ছে একটি প্রগতিবাদী ধর্ম। মহানবী প্রবর্তিত ইসলাম ধর্মের উদ্ভবের হাজার হাজার বছর আগের শিল্প ইসলামবিরোধী কি করে হলো সে প্রশ্ন এই মূর্খদের কে জিজ্ঞেস করবে!

এসব কারণেই মনে হচ্ছে ভূতের আছরে পড়েছি আমরা। উল্টোপায়ে পেছনের দিকে হাঁটছি। এর পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি কতটা কাজ করছে তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও রাজনীতিকদের। আমরা আশা করব এসব অন্ধকার থেকে তারা দেশ ও জাতিকে মুক্ত করবেন।

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]