জনপরিসর ও গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধ হোক|322243|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
জনপরিসর ও গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধ হোক
ডা. হাবিবে মিল্লাত

জনপরিসর ও গণপরিবহনে ধূমপান বন্ধ হোক

শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার, আমরা তার সুফলও পাচ্ছি। তবে এক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পরোক্ষ ধূমপানও এর মধ্যে অন্যতম। বিশেষত কর্মক্ষেত্র, রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য পাবলিক প্লেস বা জনপরিসর এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা গণপরিবহনে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় পরোক্ষ ধূমপান বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ।

দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে বিভিন্ন স্থানে Designated Smoking Area-DSA বা ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ নির্ধারণ করা থাকলেও, এগুলোই নানাভাবে পরোক্ষ ধূমপানের কারণ হচ্ছে; যা বাংলাদেশের তামাক থেকে মুক্তির প্রচেষ্টাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তাই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার পথে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে সব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করার বিকল্প নেই।

পাবলিক প্লেসে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ বলতে বোঝানো হয়েছে চার দেয়ালে আবদ্ধ নয় এমন রেস্তোরাঁ এবং যেসব পাবলিক প্লেসে ধূমপানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেসব স্থান (এয়ারপোর্ট, অফিস ইত্যাদি)। অন্যদিকে ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার ও একাধিক কামরা বিশিষ্ট বাসগুলোকে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু এসব রেস্তোরাঁয় আসা বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা নারী, শিশুসহ সব অধূমপায়ী সরাসরি পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। ফলে, ধূমপানমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার, গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থাসহ সব পক্ষের যে যৌথ আন্দোলন; তা কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে।

যদিও ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান’ ধারণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ধূমপান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরোক্ষ ধূমপানের রাশ টেনে ধরা এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা যায়, এটি পরিপূর্ণভাবে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর ধারা ৮ অনুসারে, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার থেকে অধূমপাীদের রক্ষায় ‘ধূমপানমুক্তির পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বাংলাদেশে পাবলিক প্লেস এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ধূমপানের অবস্থা নিয়ে নানান গবেষণা হয়েছে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (২০১৭) এর বাংলাদেশ বিষয়ে বলা হয়েছে, সরাসরি ধূমপান না করেও শুধুমাত্র বিভিন্ন পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন ৩ কোটি ৮৪ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। এদের মধ্যে রকমফেরও আছে। ৪৯.৭ শতাংশ মানুষ রেস্তোরাঁয় পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছেন, যেখানে গণপরিবহনে ৪৪ শতাংশ এবং আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭ শতাংশ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৩-১৫ বছর) মধ্যে পাবলিক প্লেসে এই হার ৫৯ শতাংশ।

এক্ষেত্রে আরও একটি ভয়ংকর তথ্য রয়েছে। ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার : ঢাকা, বাংলাদেশে একটি জরিপ’ শীর্ষক প্রবন্ধ জানাচ্ছে, ঢাকার ৯৫ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্যের নেতিবাচক চিত্র ফুটিয়ে তোলে। আমরা করোনা মহামারীকে সফলভাবে প্রতিরোধ করছি। টিকা নিচ্ছি, নানান স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছি, মানছি। কিন্তু ধূমপান আটকাতে পারছি না। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি সাময়িকীতে বলা হয়েছে, ধূমপায়ীদের মধ্যে করোনা পরবর্তী ঝুঁকি ১৫ ভাগ বেশি।

আমরা (এফসিটিসি)-তে স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশগুলোর অন্যতম। যে কারণে, তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ এক কথায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে এবং তাকে সাহায্য করছে অন্য সংস্থাগুলোও। ইতিমধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বিশ্ব সংস্থাসহ অন্য তামাকবিরোধী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যে ৬টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে সবার প্রথমেই রয়েছে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্তসহ সব পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, পাবলিক প্লেস ও পাবলিক রেস্তোরাঁয় ধূমপান বন্ধ করলে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে? ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিস এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের প্রতিবেদন জানাচ্ছে কর্মক্ষেত্র, রেস্তোর্রাসহ সব পাবলিক প্লেসকে শতভাগ ধূমপানমুক্ত করা গেলে সেখানে আগত অধূমপায়ীদের হৃদরোগের ঝুঁকি ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে, শ্বাসতন্ত্র ভালো থাকবে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। শুধু তাই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ধূমপানমুক্ত পরিবেশে ধূমপায়ী কর্মীর সিগারেট সেবনের মাত্রা দিনে গড়ে ২ থেকে ৪টা পর্যন্ত হ্রাস পায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করা কতটা সম্ভব? ইতিমধ্যে থাইল্যান্ড, নেপালসহ বিশ্বের ৬৭টি দেশে সব ধরনের পাবলিক প্লেসে ‘ধূমপানের জন্য নির্ধারিত এলাকা’ রাখা নিষিদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশের ৩৫.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। ধূমপানসহ সব তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে মৃত্যুবরণ করেন ১ লাখ ৬২ হাজার। এই মুহূর্তে প্রায় ১৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিভিন্ন তামাকজনিত রোগের সঙ্গে লড়ছেন, যেখানে ১৫ বছরের নিচে ৬১ হাজারেরও বেশি শিশু একইভাবে ভুগছে। তামাক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সিওপিডি বা ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি ৫৭ শতাংশ বেশি এবং অন্যান্য ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি ১০৯ শতাংশ।

তামাকের কারণে শুধু ২০১৮ সালেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৪ শতাংশ। এই যে ভয়ংকর চিত্র; তা থেকে আমরা অবিলম্বে মুক্তি চাই। মুক্তি দিতে চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, যারা গড়ে তুলবেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। চলুন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করি। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের মাধ্যমে অবিলম্বে সব পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করি।

লেখক : অধ্যাপক ও সংসদ সদস্য। চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন।