অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে চাই|322321|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
শেখ রাসেল দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে চাই
বিশেষ প্রতিনিধি

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়তে চাই

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘একটা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশকে গড়তে চাই। উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই। সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই। যে দেশে কোনো অন্যায় থাকবে না, অবিচার থাকবে না, মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে; সেটাই আমি চাই।’ গতকাল সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘শেখ রাসেল দিবস-২০২১’-এর উদ্বোধনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমনন্ত্রী এসব কথা বলেন। সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।

দিবসটি উদ্বোধন করে শেখ হাসিনা বলেন, এই বাংলাদেশ সামনে কেমন হবে তার জন্য পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা করে দিয়েছি। বাংলাদেশের আগামী দিনের চলার পথে যেন আর কোনো হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র না হয়। বাংলাদেশের মানুষ যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। ঘাতকের বুলেটে আর কোনো শিশুকে যেন এভাবে জীবন দিতে না হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিরা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার ছোট ছেলে ১১ বছরের শেখ রাসেলকেও হত্যা করে। বিদেশে থাকায় তখন বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। তার জন্মদিন এবারই প্রথম ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শেখ রাসেল দীপ্ত জয়োল্লাস, অদম্য আত্মবিশ্বাস’।

এরপর সন্ধ্যায় সারা দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মন্দিরে যে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে তা প্রতিরোধে দলের নেতাকর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক জরুরি সভায় ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে তিনি এ নির্দেশ দেন। দলীয় সভাপতির নির্দেশে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং সারা দেশে অনুষ্ঠেয় সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রা কর্মসূচি পালন উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়।

রাসেলের মতো ভাগ্য যেন আর কোনো শিশুর না হয়: শেখ রাসেল দিবসের অনুষ্ঠানে ছোট ভাইয়ের জন্য হাহাকার ঝরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘একটা ফুল পূর্ণাঙ্গভাবে ফোটার আগেই অকালে ঝরে যাবে, এটা কারও কাম্য নয়। আমাদের দেশের আর কোনো শিশুর জীবনে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। আমরা এ রকম চাই না; বরং চাই বাংলাদেশ একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হবে। প্রতিটি শিশুর জীবন এই দেশে অর্থবহ এবং সুন্দর হবে। কেউ অকালে ঝরে যাবে না।’

ছোট ভাই শেখ রাসেলকে হত্যার ঘটনা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেদিন রাসেল মায়ের কাছে যাব বলে কান্না করছিল। তাকেও হত্যা করা হলো। আমার একটাই প্রশ্ন, এ শিশুটির কী অপরাধ ছিল?’

অনুষ্ঠানে ’৭৫-এ শিশু রাসেলসহ জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের হত্যা, পরবর্তীতে ১৯টি ক্যু এবং ক্যু নিবৃত্ত করার নামে সামরিক অফিসার হত্যা, ২০০১-পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে এবং ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনে সহিংসতার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশে আর কোনো দিন যাতে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্র না হয়। ঘাতকের বুলেটে আর কোনো শিশুকে যাতে এভাবে জীবন দিতে না হয় এবং দেশের অগ্রগতি যাতে থেমে না যায়, সে ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

দেশের ভবিষ্যৎ শিশুদের দিকে মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটাই আহ্বান জানাব, এই শিশুদের নিরাপত্তা দেওয়া, ভালোবাসা দেওয়া, সুন্দরভাবে গড়ে তোলা, তাদের জীবনকে সার্থক এবং অর্থবহ করা এই কর্তব্য পালনই যেন সকলের আদর্শ হয়।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা ১৯৭৪ সালেই শিশু নিরাপত্তার জন্য আইন প্রণয়ন করে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য ঘাতকের হাতে তারই সন্তানদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। শিশুদের নিরাপত্তা দিতে আওয়ামী লীগ সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্নত, সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। যে দেশে কোনো অন্যায়-অবিচার থাকবে না, মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে।’

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশুদের দোয়া ও আশীর্বাদ জানিয়ে তাদের মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘অন্য সম্পদ চুরি হতে পারে বা হারাতে পারে। কিন্তু লেখাপড়া এবং শিক্ষা এটা এমন একটা সম্পদ, যেটা কেউ কারও কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এনএম জিয়াউল আলমও বক্তব্য দেন।

সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অপতৎপরতা প্রতিরোধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর: আজ মঙ্গলবার সারা দেশে আওয়ামী লীগের সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রা কর্মসূচি পালন উপলক্ষে গতকাল অনুষ্ঠিত দলের জরুরি বৈঠকে দলীয় নেতাকর্মীদের সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অপতৎপরতা প্রতিরোধের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য সমুন্নত রাখাতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন বিশ্বসভায় একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ঠিক সে সময়ে একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সরকার ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে এবং বাকিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।’

‘শেখ রাসেল স্বর্ণপদক’ দিলেন প্রধানমন্ত্রী: শেখ রাসেল দিবসের প্রথম আয়োজনে গতকাল শেখ রাসেলের নামে প্রবর্তিত ১০টি স্বর্ণপদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ আয়োজিত এই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে শিক্ষা, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিল্পকলা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এই ৫টি ক্যাটাগরিতে প্রতিটি ১ ভরি করে ১০টি ‘শেখ রাসেল স্বর্ণ পদক’, ১০টি ল্যাপটপ ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

এ ছাড়া শেখ রাসেল অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের ১০টি ল্যাপটপ এবং লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলমেন্ট প্রকল্পের (এলইডিপি) আওতায় প্রশিক্ষণার্থীর মধ্য হতে সর্বোচ্চ উপার্জনকারীদের মধ্যে ৪ হাজার ল্যাপটপ দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের উদ্যোগে সারা দেশে আয়োজিত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদেরও পুরস্কার দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানে সংযুক্ত শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং স্টেডিয়াম প্রান্তে শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে রোলার স্কেটিং প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে ‘শেখ রাসেল শৈশবে ঝরে যাওয়া ফুল’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ প্রকাশিত ‘শেখ রাসেল দৃপ্ত জয়োল্লাস, অদম্য আত্মবিশ্বাস’ শীর্ষক বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করেন।

শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের মহাসচিব এবং শিশু বক্তা আফসা জাফর সৃজিতা অনুষ্ঠানে তার অনুভূতি প্রকাশ করে।

অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ পরিবেশিত শেখ রাসেলের দুরন্ত শৈশবভিত্তিক অডিও ভিজ্যুয়াল পরিবেশনা ‘শেখ রাসেল এক অনন্ত বেদনার কাব্য’ এবং ‘থিম সং’ পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় পর্বে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও পরিবেশিত হয়। এর আগে সকালে ‘শেখ রাসেল দিবস-২০২১’ উদযাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মারক ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর অবমুক্ত করেন।