মুখের কথায় পরিস্থিতি বদলাবে না|322482|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
মুখের কথায় পরিস্থিতি বদলাবে না

মুখের কথায় পরিস্থিতি বদলাবে না

দুর্গাপূজাকে ঘিরে লাগাতার কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের মন্দির-পূজামন্ডপ-ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একের পর এক যে হামলা চলছে তাতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নতুন এক ভয়াল রূপ প্রত্যক্ষ করছে দেশবাসী। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ঠিক এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি। ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ানো এবং উসকানির ধরন একই হলেও একের পর এক জেলায় এবার যেভাবে সংগঠিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বিগত দশকগুলোতে এমন হামলা এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়নি। ১৩ অক্টোবর বুধবার কুমিল্লার নানুয়া দীঘি থেকে যে হামলা শুরু হলো সেটা রবিবার পীরগঞ্জের ভয়াবহ তান্ডবের পরও থামেনি। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় ২০টি বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের আগেও ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার সেই পুরনো অপকৌশলই ব্যবহার করা হয়েছে। একদিকে, দেশব্যাপী লাগাতার এমন সংগঠিত হামলায় যেমন প্রশ্ন উঠছে এসব হামলার নেপথ্যে কারা জড়িত; তেমনি অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও হামলা মোকাবিলায় পুলিশ ও প্রশাসনের গাফিলতি, নিষ্ক্রিয়তা কিংবা ব্যর্থতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে নাগরিক সমাজে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারাও তাদের আস্থাহীনতার কথা জানিয়েছেন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠেই। এতসব হতাশা আর ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যেও আশার কথা হলো, দেশের মানুষ এখন এই বীভৎস সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সক্রিয় হয়েছেন, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন।

সোমবার রাজধানীর শাহবাগে বিপুল জমায়েতের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের মন্দির-পূজামন্ডপ-ঘরবাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। এর আগে চট্টগ্রামেও হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো হিন্দুদের ওপর হামলা-সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সন্ত্রাসের ঘটনাগুলোতে জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, হিন্দুদের ওপর সন্ত্রাসী হামলায় উসকানি ও মদদদাতা হিসেবে বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামও এসেছে। আবার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের কথাও শোনা যাচ্ছে। এদিকে, এবারের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়েও সরকার দুষছে বিএনপি ও তার সহযোগীদের আর বিএনপি দুষছে সরকারকে। কিন্তু এই কাদা ছোড়াছুড়িতে যে গভীর এই সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের সুরাহা হবে না সেটা বলাবাহুল্য। সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এ কথা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাম্প্রদায়িকতা এখন সব রাজনৈতিক দলের ভেতরেই কমবেশি ঢুকে পড়েছে। চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি মঙ্গলবার দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সমাবেশের অংশ হিসেবে চাঁদপুরে ‘আওয়ামী লীগে অনেক অনুপ্রবেশকারী ঢুকে গেছে’ বলে যে মন্তব্য করেছেন তা উপরোক্ত বাস্তবতারই প্রতিফলন।

এক্ষেত্রে একটা বিষয় বিশেষভাবে আমলে নেওয়া দরকার যে, প্রতিবেশী দেশগুলোসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় রাজনীতি ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের বিষয়গুলো থেকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই। এই প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ধর্মীয় মৌলবাদিতার ঝোঁক এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামাজিক পরিসরে ধর্মান্ধতার বিস্তারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। লক্ষ করা দরকার এবারের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ক্ষেত্রেও ২০১২ সালে রামু এবং ২০১৬ সালে নাসিরনগরে হামলা-নির্যাতনের ‘ফেইসবুক স্ট্যাটাস’ আর ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে’ গুজব-উসকানি ছড়ানো হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তসহ দেশের সব স্থানে সব সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া জরুরি। এসব মাধ্যমে কেবল ধর্মীয় বিষয়ে বিদ্বেষমূলক প্রচার চলছে না; এর সঙ্গে একশ্রেণির নেতাও এমন বক্তৃতান্ডবিবৃতি দেন, যা সম্প্রীতি ও সংহতির অন্তরায়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেইসবুক, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদিতে লাগাতার সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সর্বোপরি, দেশে বহু ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা এবং আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বৈষম্য কীভাবে দেশকে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে বিভক্ত করে ফেলছে সে বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার। কেননা, দেশের কিশোর-তরুণসহ যুব গোষ্ঠী যে দ্বিধাবিভক্ত সমাজে বসবাস করছে, সেটা দূর না হলে সামাজিক পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই সহজ নয়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যে সংস্কৃতি জনগণের সম্প্রীতি বিনষ্ট করছে তার দায় রাজনীতিকরা এড়াতে পারেন না। দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতৃত্বকেও আজকের পরিস্থিতির দায় নিতে হবে। কেননা সবার চোখের সামনেই দেশে সাম্প্রদায়িকতার এই পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু একটা কথা খুবই স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, কেবল মুখের কথায় এই পরিস্থিতি বদলাবে না। দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা ‘রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আস্থাহীনতার’ যে কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তার কী জবাব আছে? এজন্য রাজনৈতিক নেতাদেরই সবার আগে এগিয়ে এসে এই দায় নিতে হবে এবং পরিস্থিতি বদলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সবার জন্য একটা আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।