সম্প্রীতি ফেরাতে চাইলে শিক্ষা ও জনমানস বদলাতে হবে|322483|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
সম্প্রীতি ফেরাতে চাইলে শিক্ষা ও জনমানস বদলাতে হবে
ড. এ কে এম খাদেমুল হক

সম্প্রীতি ফেরাতে চাইলে শিক্ষা ও জনমানস বদলাতে হবে

একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প। আমার শৈশব কেটেছে উত্তরের ছোট্ট এক মফস্বল শহরে। সেই শহরে, বিশেষ করে শহরের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেক মানুষের বাস ছিল। রোজ সকালে চিঁড়া-মুড়ি-মুড়কি-নাড়ুর বস্তা পিঠে নিয়ে ফেরি করে বেচতে আসতেন যারা, তাদের প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু, মিষ্টির দোকানগুলোর মালিক থেকে কর্মীরাও। খাল-বিল থেকে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতে আসতেন যারা, তাদেরও একটা বড় অংশ ছিলেন এই ধর্মে বিশ্বাসী। বাজারের বড় বড় মুদির দোকানগুলো সব চালাতেন তারা। এই রকমই একজনের সঙ্গে ভাইবোনের সম্পর্ক পাতিয়েছিলেন আমার মা। আমরা ডাকতাম যোগেন মামা। মামাদের বাড়িতে পূজার নাড়ু-মোয়ার ভাগ যেমন আমরা নিয়মিত পেতাম, তেমনি ঈদের দিনে আমাদের বাড়ির সেমাই-পোলাও খাওয়ার নিমন্ত্রণে আসতেন তারা সব সময়। কোনোদিন মনেই হয়নি, যোগেন মামাদের ধর্ম অন্য আর আমাদের অন্য।

আজ যখন দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক তান্ডবের খবর পড়ছি, দেখছি, তখন আমার প্রথমেই মনে পড়ছে সেই যোগেন মামার কথা। মামা আমাদের ছেড়ে গেছেন অনেক বছর আগে, আমার মা-ও নেই। কিন্তু মামার ছেলেমেয়েরা তো আছেন, আমরা যাদের দাদা দিদি ডাকতাম। তাদের ছেলেমেয়েরাও তো আছে। পরের প্রজন্মের এই ছেলেমেয়েগুলো যদি আজ প্রশ্ন করে, কাকা কেন এমন হচ্ছে, কী জবাব দেব আমি? এই প্রশ্নের উত্তরটাই জানা আজ সবচেয়ে জরুরি, কেন এমন হচ্ছে? এখন থেকে কুড়ি-তিরিশ বছর আগে আমার জীবদ্দশাতেই যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমি নিজে অনুভব করে এসেছি, সেই সম্প্রীতি আজ কোথায় হারিয়ে গেল? কেন হারিয়ে গেল?

গত কয়েক বছর ধরে এই ধরনের অঘটন অনেক বারই ঘটেছে। রামু-ফেনী-ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেখানেই এমন ঘটনা ঘটুক, তার পরের পদক্ষেপগুলো একেবারে মুখস্ত। সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক ‘বদলি’ করা হবে অন্য কোনো স্টেশনে। মন্ত্রী-এমপিরা বলবেন, এটা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, এর পেছনে আছে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর উসকানি। তারপর, ঘটনার রহস্য উদঘাটনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার আগেই পুলিশ একটা মামলা করবে, যাতে হাজার খানেক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হবে। কিন্তু রিপোর্ট প্রকাশের আগেই অন্য ইস্যু এসে ঢাকা পড়ে যাবে সেটা। আজ পর্যন্ত এই রকম কোনো ঘটনায় কারও শাস্তি হয়েছে, এমন খবর মিডিয়ায় অন্তত আলোচিত হয়নি। ফলাফল, যারা এই সব কর্মকা- ঘটায়, তারা জানে, আবার ঘটালেও অসুবিধা নেই; শাস্তি তো আর হচ্ছে না!

প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যে কথা বলেন, সেটা কি খুব অযৌক্তিক? সংখ্যার বিচারে কিন্তু অযৌক্তিক বলার উপায় নেই। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের রেজিস্ট্রেশন অনুসারে এই বছর প্রায় ৩২ হাজারেরও বেশি মন্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছিল। তার মধ্যে সব মিলিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছে এমন মন্ডপের সংখ্যা তিন অংক পার হয়নি। সংখ্যার বিচারে তাই বলাই যায়, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু বাস্তব ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন; এগুলো মোটেই বিচ্ছিন্নভাবে দেখার উপায় নেই। কারণ শুধু এ-ই নয় যে, প্রতি বছর এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। আসল কারণ, এই সব ঘটনা ঘটানোর যে প্যাটার্নটা গড়ে উঠছে, সেটা।

প্যাটার্নটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো না কোনো একটি পোস্ট দিয়ে আহ্বান জানানো হচ্ছে, কখনো কখনো মসজিদের মাইক ব্যবহার করে আহ্বান জানানো হচ্ছে, আর তাতেই এত বেশি সংখ্যক ‘তৌহিদি জনতা’ হাজির হয়ে যাচ্ছেন, যে পুলিশের পক্ষেও উত্তেজিত সেই সব সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তার মানে, মুখে আমরা যতই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গল্প বলি, নিজেরা লজ্জিত হই, বাস্তবতা হলো, এখন দেশে সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন মানুষের সংখ্যাই বেশি।

অন্যভাবে বললে আসলে বলতে হয়, এখন আমাদের দেশ পরিণত হয়েছে উগ্রবাদী মনোভাবসম্পন্ন মুসলিমদের দেশে! এই উগ্রবাদীরা কিন্তু আসলে খুব যে ধার্মিক, তা নয়। এদের অনেকেই আসলে ঠিকমতো ধর্মপালনও করে না। বরং বলা যায়, এরা ধর্মের সমর্থক গোষ্ঠী। আবাহনী-মোহামেডান বা বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের উগ্র সমর্থকরা যেমন পরস্পরের সঙ্গে মারামারি করে, কিন্তু বাস্তবে সেই দলের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই, এরা অনেকটা সে রকম। নিজেরা ধর্ম পালনে খুব নিষ্ঠাবান নয়, কিন্তু ধর্মের নামে এদের উত্তেজিত করা যায় খুব সহজেই।

ঐতিহাসিকভাবে এই দেশে হিন্দু-মুসলিমের সহাবস্থান ছিল এটা যেমন সত্যি, তেমনি এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিমদের মনে ধর্মপ্রীতি আছে অনেক দিন ধরেই। মুখস্থ বুলির মতো আমরা এর জন্য দায়ী করি ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতিকে। কিন্তু এই নীতির কারণেই হোক বা যে কারণেই হোক, তথ্য-উপাত্ত বলছে, গত শতকের মধ্যভাগ থেকেই আসলে এদেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে প্রোথিত হয়ে আছে ধর্মপ্রীতি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষেই তো ভোট দিয়েছিল এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ! তবু সেই ধর্মপ্রীতি এতটা উগ্র ছিল না যে হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের পথে সেটা খুব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু, এ-কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পাকিস্তান আমলে এদেশ থেকে অনেক হিন্দু ‘ওপারে’ বা ভারতে চলে গিয়েছেন। আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের পরিসংখ্যান বলছে, এই দেশে অমুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। প্রতি দশ বছরে প্রায় ১ শতাংশ, মানে ১০-১৫ লাখ মানুষ কমে যাচ্ছে; কেন কমে যাচ্ছে তার কারণটা নিয়ে কিন্তু সত্যিকারের কোনো গবেষণা আমরা করছি না। বরং করছি উল্টোটা।

আমরা নানাভাবে জনমানসের এই ধর্মপ্রীতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছি। সরকার-বিরোধী দল এমনকি সুশীল সমাজও এই দায় এড়াতে পারবে না। যেখানে সরকারের দায়িত্ব উত্তেজিত সংখ্যাগুরু জনতার হাত থেকে আক্রান্ত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা; সেখানে ভোট হারানোর ভয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত কথা বলার ক্ষেত্রেও খুব সতর্ক থাকছি। পীরগঞ্জের ঘটনার পর পুলিশের বক্তব্যে যেমন গুরুত্ব পেয়েছে ‘যে কোনো কারণেই হোক, ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।’ এর আগে আক্রমণের শিকার হওয়া ব্লগারদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ভিকটিম ব্লেমিংয়ের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।

উত্তেজিত জনতাকে সামাল দেওয়ার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা যদি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিতে হয়, তাহলে এ ধরনের সতর্কতা অবলম্বন না করে আসলে উপায় থাকে না। তাই দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ঠেকাতে চাইলে আসলে এ রকম তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে লাভ হবে না। খুঁজে বের করতে হবে এর আসল কারণ। কেন ফেইসবুকে কোরআন অবমাননা করা হয়েছে এমন একটা স্ট্যাটাস দিলেই এমন উত্তেজিত হয়ে উঠছে জনতা যে, আর কোনো বিবেচনাবোধই কাজ করছে না তাদের মধ্যে? একটা ভালো কাজের জন্য ডাক দিলে তো মুহূর্তেই সেটা ভাইরাল হয় না, হাজার প্রণোদনা দিয়েও জনসমাবেশ ঘটানো যায় না!

এর পেছনের রহস্য হয়তো আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমরা সাক্ষরতার হারে অভাবিত উন্নতি করেছি, এ কথা সত্যি। কিন্তু এটাও ঠিক, এই সময়েই শিক্ষাব্যবস্থায় একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে; একটা বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আমরা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করছি; এরা এবং সেই সঙ্গে এদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রজন্মটা বেড়েই উঠছে প্রবল ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে।

সমস্যাটা কিন্তু শুধু এখানেই থেমে নেই; এই অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে আরও অনেক ক্ষেত্রে। আমরা কি কখনো খুঁজে দেখতে চেয়েছি, আমাদের শিশু-কিশোররা কেন চলন্ত ট্রেনের জানালায় পাথর ছুড়ে মারতে চায়? তাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতে এই রকম একটি ভাবনার বিকাশ কেন ঘটছে? ট্রেনের জানালায় লোহার গ্রিল লাগিয়ে হয়তো এ সমস্যার সাময়িক সমাধান হতে পারে; কিন্তু স্থায়ী সমাধান চাইলে বদল আনতে হবে ঢিল ছুড়তে চাওয়া কিশোরদের মানসিকতায়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এর একটা উপায়; তবে তারচেয়েও বেশি কার্যকর উপায় হলো সেই কিশোরদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। ঠিক তেমনি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে হলে জনমানসে পরিবর্তন আনার চেষ্টাটাই বেশি জরুরি। সে জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

লেখক অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]