ঋণং কৃত্বা গাড়ি সেবা নগদায়ন-৩|322485|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
ঋণং কৃত্বা গাড়ি সেবা নগদায়ন-৩
মঈদুল ইসলাম

ঋণং কৃত্বা গাড়ি সেবা নগদায়ন-৩

গাধা বুদ্ধি খাটালে যা হয় আমার হলো তাই, মোটরগাড়ির বাসনা পূরণে গৃহনির্মাণ না করা সরকারি ‘ঋণং কৃত্বা’-র সঙ্গে গাঁটের পয়সা খাটিয়ে পুরাতন সেই মোটরগাড়ি কিনে! শখের দাম ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা! চড়নসেবার নগদায়ন যেমন-তেমন, খাজনা আঠারো আনা! পুরাতন গাড়িটার বায়না নিত্যনতুন! আজ এটা তো কাল সেটা পাল্টাও লেগেই থাকে। সস্তার তিন অবস্থা, ভোগান্তির একশেষ! বছর-তিনেক ভুগে অবস্থা আর বেশি বাড়ার আগে সেটা বেচে নিজে বাঁচি। খরচ-খরচা মিলিয়ে যে দামে কেনা সে দামে বেঁচা, মধ্যিখানে যেটুকু ‘সুখং’ লাভ সেটুকুও কুরে খেয়েছে যন্ত্রণার পিঁপড়েতে! গাড়ি ছাড়লেও ছাড়ল না ঋণের কিস্তি।

কিস্তি আমার টানতে টানতে এসে গেল ২০১১ সাল। শুনি সরকারি কর্মকর্তা কারা নাকি সরকার থেকে ১৬ লাখ টাকা (শুরুটা তাই দিয়ে) ঋণ তুলে নতুন (রিকন্ডিশন্ডই নতুন তখন এ দেশে) মোটরগাড়ি কিনে আবার মাসে ৩০ হাজার টাকা (বেড়েছে পরে) করেও পাচ্ছে। যে বাসনায় ‘ঋণং কৃত্বা’ সে ‘ঘৃতং পিবেৎ’ শুরু হয়েছে তবে একালের সরকারি ঋণে! ১৫ মার্চ ২০১১-এর গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে দেখি আইন নয়, বিধি নয়, এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) নয়, সংস্থাপন (হালে জনপ্রশাসন) মন্ত্রণালয়ের পরিবহন অধিশাখার এক নথির ১৪ মার্চের প্রজ্ঞাপনে হয়েছে ‘প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা, ২০১১’। সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিমটা বুঝতে কষ্ট নেই বিশেষ। মোটরগাড়ি কিনতে ১৬ লাখ টাকা আগাম এক ঝটকাতেই, সুদের চক্র নেই মোটে। ফেরত নেবে ১০ বছরে (সর্বোচ্চ) ১২০ কিস্তিতে মাসিক বেতন থেকে।

গাড়ি সেবা নগদায়নটা কি বটে? সংজ্ঞা দেখে মালুম হয় সেটি সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ির চড়নসেবা পাওয়ার বদলে বিশেষ সুদমুক্ত অগ্রিমে পাওয়া গাড়িতে চড়ার খরচা (ড্রাইভারের বেতন, তেল, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ) চালানোর নগদ অর্থ আয়ত্তায়ন। ঘোড়া দিলেই চলবে! মাসে মাসে ছোলা-চাবুক জুটবে কোত্থেকে? শেষে না-চলে যে ঘোড়াটাই মরবে! যুক্তিটা আর অযৌক্তিক ঠেকছে! ১৬ লাখ আগামের তাই ফি-মাসে ‘ফ্রি-বাচ্চা’ ৩০ হাজার নগদ দক্ষিণা বেতনের সঙ্গে। তখনকার বাজারে ১৬ লাখে রিকন্ডিশন্ড ভালো গাড়িই মেলে, মাসে ৩০ হাজারে ড্রাইভারের তেল-পানির পরে তরতরিয়ে কিস্তি চালিয়ে হাতেও থাকে বেশ। কিস্তি না চালালে যে আগামটা অনাদায় থাকে! কিস্তি চালানোর দায়ও তাই অগ্রিম দাতা সরকারের! আহা! কী জিনিসই বানালে! মোহন ভোগ একেবারে! যে খাবে তার মোটরগাড়ি নিয়ে চাকরিটা পাড়ি দিয়ে অবসরে বাড়ি গিয়ে বাকি ‘জীবেৎ সুখং জীবেৎ’ চলে যাবে!

তবে কি না, পাবে কে? সরকারি কর্মকর্তা হলেই নয়, সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি সুবিধার প্রাধিকারপ্রাপ্ত হতে হবে। প্রাধিকারপ্রাপ্ত হলেই নয়, সচিব বা অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্মসচিব (উপ-সচিবে নেমেছে ২০১৭-তে) হতে হবে। পদধারী হলেই নয়, সরকারের খাস হতে হবে। নিদেনপক্ষে হতে হবে ইকোনমিক ক্যাডারের (নন-ক্যাডার ড্রাফটিং ভাগ পেয়েছে ২০১৪-তে) যুগ্মপ্রধান বা তার ওপরের। সংজ্ঞায় প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাঁধা হয়েছে এমনই খাপে; চুক্তিতে আর প্রেষণে এসে পদজুড়ে বসাদের বাদ রাখা হয়েছে স্পষ্টাক্ষরে। হতোহস্মি! এ মোহন ভোগ তো দেখি দুর্ভেদ্য খোলে আটকানো শক্ত একখানা বেল বেশির ভাগ সরকারি কর্মকর্তার কাছে! শ্রীফল কাকস্য কিবা পক্ষীকুল কা কস্য ভক্ষ্য নহে কভু। নীতির এ মালা শুধু বিশেষ দুটি ক্যাডারেরই গলায় গলে! 

খাস সরকারের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব হওয়ার শিকে তো ছেঁড়ার নয় প্রশাসন ছাড়া কোনো ক্যাডারের ভাগ্যে। ইকোনমিক ক্যাডার খোল ফাটিয়ে নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত অগ্রিমের মোহন ভোগে দাঁও মেরেছে বিশেষ সক্ষমতার জোরে। বিসিএস (বিচার) বহু আগেই ক্যাডারচ্যুত, হয়েছে জুডিয়াল সার্ভিস। কাক-রঙা গাউন-কোট পরা বেচারাম বিচারকর্মীর কাকদশা, কঠিন বেলে চেয়ে থাকা ছাড়া চাওয়ার নয় ভেতরের নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত অগ্রিম মোহন ভোগ। জুটছে না কাক-রঙা গাউন-কোট খুলে প্রেষণে এসে যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব পদ জুড়ে বসা বিচারকদেরও কপালে। কাক-রঙা না হলেও প্রশাসন ছাড়া বাকি ২৫ ক্যাডারের অবস্থাও কাকদশাগ্রস্ত পক্ষীবৎ, তাদেরও ভক্ষ্য নয় কঠিন বেলে পোরা এ মোহন ভোগ। সরকারি কর্মকর্তা হলেই খাস নয় সকলে। সেই ফারাকটা না দেখে পাবলিকে দেখে সবাইকে এক চোখে, মনে গোল বাধায় যেন-বা সরকারি সব কর্মকর্তাই এমন সব মোহন ভোগ খায়!

মোটরগাড়ি ঋণের এই কারবারটা চালু হয়েছিল আগে ব্যাংকে, সেখানেই লোকের টাকা নাড়াচাড়া হয় কি না! প্রথমে বেসরকারি পরে সরকারি ব্যাংকে, সরকারির তো সময় একটু লাগেই! তাদের সবারটা দেখেশুনে নাকি পরে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে, তাদের আবার সব ব্যাংক দেখাশোনা কাজ কি না! সবার দেখাশোনা কাজ তো সরকারের! তাই হয়েছে সবারটা দেখেশুনে সবার পরে, সবার ওপরে।

নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত অগ্রিম অধিকারী সরকারি খাস কেউ প্রেষণে ২৫ ক্যাডারের কোনোখানে, কোনো প্রকল্পে বা আইন মন্ত্রণালয়েও থাকলে সেখানকার সার্বক্ষণিক গাড়িটাতেই চড়বেন, না হলে চড়বেটা কে! আবার ৩০ হাজারি নগদায়নেরও সিকিভাগ (শুরুটা তাই দিয়ে) তুলবেন, না হলে সুদমুক্ত সরকারি অগ্রিমের গাড়িটা যে অচল হয়ে বসে! মোহন ভোগে মেওয়া মাখানো! বৈদেশিক চাকরিতে গেলে কিন্তু ৩০ হাজারি নগদায়নের কানাকড়িও নেই, অগ্রিমের গাড়িটা তখন সচল রাখার দায় নেই স্বদেশি নীতিমালায়।

বাড়া শুরু হলো গাড়ি সেবা নগদায়নযুক্ত সুদমুক্ত অগ্রিমের মোহন ভোগে মেওয়া মাখানো। ১৬ লাখি অগ্রিমটা ২০১২ সালে উঠল ২০ লাখে, ২০১৪-তে ২৫ লাখে, ২০১৭-তে এসে ঠেকেছে ৩০ লাখে। ৩০ হাজারি নগদায়নটা ২০১৪-তে উঠল ৪৫ হাজারে, ২০১৭-তে এসে ঠেকেছে ৫০ হাজারে। দ্রব্যমূল্য তো বাড়ছে বাজারে! বাড়বে তো আরও, ২০১৭-তে তাই বাড়তি ব্যবস্থা হয়েছে সুদমুক্ত অগ্রিম আর তার ‘ফ্রি-বাচ্চা’ দুটোরই পরিমাণ সময়মতো বাড়ানোর।

সরকারি খাস থেকে এসে প্রেষণের গাড়িতে চড়েই মাসিক নগদায়নের সিকিভাগটা ২০১৫-তে উঠল ৩৫ শতাংশে, ২০১৭-তে এসে ঠেকেছে সোজা ‘ফিফটি-ফিফটিতে’। ‘সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম’ কেটে ২০২০ সালে হয় ‘সুদমুক্ত ঋণ’, মাজেজাটা জনপ্রশাসনের গাড়ি সেবা শাখাই জানে! মেওয়া তো কমেনি একটুও। মোক্ষম মেওয়াটা লাগানো হয় ২০১২-তেই। সুদমুক্ত অগ্রিমন্ডঋণে গাড়ি দেখালে অমনিই বছরে ১০ শতাংশ হারে ৮ বছরের অবচয় (ডেপ্রিসিয়েশন) খাতে ৫৬ শতাংশেরও বেশি শোধবোধ আপসেআপ, বাকি ৪৪ শতাংশেরও কমটুকু শুধু শোধ করবেন ১০ বছরে ১২০ কিস্তিতে।

ঋণ কারবারি ব্যাংকারও চমকায়, ঋণে অবচয়! কী বুদ্ধি! ঋণে নয়, অবচয়টা তো সুদমুক্ত ঋণের গাড়িতে! ঘরের থেকে ভর্তুকি দিয়ে নয়, ৪৪ শতাংশের শোধটাও তো হবে সে গাড়িতেই চড়ে সে ঋণেরই ফি-মাসি ‘ফ্রি-বাচ্চা’ নগদায়ন থেকেই! 

(বাকি অংশ আগামী কিস্তিতে)

লেখক প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]