ভোজ্য তেলে ৭ টাকা লাফ|322531|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
ভোজ্য তেলে ৭ টাকা লাফ
মামুন আব্দুল্লাহ

ভোজ্য তেলে ৭ টাকা লাফ

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামবৃদ্ধির অজুহাতে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে দেশি ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে সাত টাকা বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। যদিও বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের )বছরের মার্চের মধ্যে বাজার থেকে সব ধরনের খোলা তেল বিক্রি বন্ধে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়তে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ও বনস্পতি উৎপাদক সমিতি। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে তেলের এ দাম নির্ধারণ করে সংগঠনটি। এতদিন কয়েক দফা বেড়ে  যে তেল ১৫৩ টাকায় বিক্রি হতো তা এখন থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হবে। এছাড়া পাঁচ লিটারের এক বোতল তেল পাওয়া যাবে ৭৬০ টাকায়; যা এত দিন ৭২৮ টাকা ছিল।  এই হারে  খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৩৬ টাকা ও বোতলজাত পাম সুপার তেল ১১৮ টাকা দরে কিনতে পারবেন ক্রেতারা।

এই দর অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বাংলাদেশ ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ও বনস্পতি উৎপাদক সমিতির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। তবে পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ে পুরনো মজুদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না বলেও বলা হয়।

এর আগে রবিবার ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে প্রাথমিক সম্মতি দেয়। ওই দিন ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী বিভিন্ন কোম্পানি ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি বিভাগ। এতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

তখন এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও আমদানি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (আইআইটি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নিত্যপণ্যের মজুদ পরিস্থিতি, আমদানি ও দাম নির্ধারণ নিয়ে বৈঠকে তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছিল, তাই তারা ৮/১০ দিনের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছিলেন। ২০১১ সালের আইন অনুযায়ী, প্রতি ১৫ দিন অন্তর ট্যারিফ কমিশন অ্যানালাইসিস করে সুপারিশ করবে। আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রিফাইনারিদের সঙ্গে আলোচনা করে মূল্য নির্ধারণ করি। পরে রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশন তাদের অফিশিয়াল প্যাডে এটা ডিক্লেয়ার করে।

তেলের মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে সফিকুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফেকচার অ্যাসোসিয়েশনের প্রস্তাব ছিল, বোতলজাত কেজিপ্রতি তেলের দাম ১৬৮ টাকা করার। ট্যারিফ কমিশন একাধিকবার বসে অ্যানালাইসিস করে ১৬২ টাকা প্রস্তাব করেছে। এটা ছিল সেপ্টেম্বর মাসে অ্যাভারেজ রিপোর্ট। তবে দীর্ঘ আলোচনায় প্রতি কেজি বোতলজাত তেলের দাম ১৬০ টাকা ঠিক করা হয়েছে।

এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তখন দেশের বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল সর্বোচ্চ ১২৯ টাকা এবং এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৫৩ টাকা এবং প্রতি পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭২৮ টাকা হয়। আর প্রতি লিটার পাম সুপার অয়েল খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১১৬ টাকা দর নির্ধারণ করা হয়। যদিও নির্ধারিত দরে ভোজ্যতেল তেমন বেচাকেনা হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমেছে : দেশের বাজারে বাড়লে বিশ্ববাজারে বর্তমানে ভোজ্যতেলের দাম কমছে। নিত্যপণ্যের বাজার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের কমিডিটি প্রাইস ডাটার তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম কমছে। সেপ্টেম্বর মাস শেষে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এক হাজার ৩৯৯ ডলারে বেচাকেনা হয়েছে। গত আগস্টে যার প্রতি টনের দাম ছিল এক হাজার ৪৩৪ ডলার। তার আগে জুলাইয়ে প্রতি টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম ছিল এক হাজার ৪৬৮ ডলার, জুনে এক হাজার ৫১৮ ডলার এবং মে মাসে এক হাজার ৫৭৪ ডলার। চলতি অক্টোবরে দাম আরও কমেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য তেলবীজ থেকে সোয়া দুই লাখ টন তেল পাওয়া যায়। বাকিটা আমদানি করতে হয়। মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে থেকে এসব তেল আমদানি হয়ে থাকে। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে বাজারজাত করছে।

খোলা তেল বিক্রি বন্ধে কমিটি : বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই কমিটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে করা হবে আলাদা মনিটরিং টিম।

সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ নিশ্চিতকরণে গৃহীত একটি কারিগরি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উক্ত সভার সিদ্ধান্তের আলোকে শিল্পমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও ভোজ্যতেল রিফাইনারি সমিতির সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে ননফুড গ্রেডেড ড্রামে ভোজ্যতেল বাজারজাত বন্ধকরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহায়তা) শেখ ফয়েজুল আমীনের নেতৃত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তর এবং রিফাইনারি সংগঠনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি ড্রাম ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিয়মিত মনিটর করবে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয় কমিটি গঠন করে মাঠ পর্যায়ে মনিটর কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে বেঁধে দেওয়া হয়েছে সময়সীমা। শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, ননফুড গ্রেডেড ড্রামে ভোজ্যতেল বাজারজাত/পরিবহন আগামী ১৬ মার্চের মধ্যে বন্ধ করে ফুডগ্রেড বোতল বা প্লাস্টিক ফয়েল বা পাউচপ্যাকে ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।  ইতিপূর্বে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অগ্রগতি নেই। গঠিত কমিটি অগ্রগতি ও মোডালিটি নির্ধারণে বৃহৎ রিফাইনারিগুলো এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে দ্রুত সভা আহ্বান করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণলয়ের অতিরিক্ত সচিব (মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহায়তা) শেখ ফয়েজুল আমীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি করা জনস্বাস্ত্যের জন্য খুবই জরুরি। একদিকে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল বাজার জাতকরা যতটা জরুরি, অন্যদিকে ফুডগ্রেডেড প্যাকেজিং নিশ্চিত করাও জরুরি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করলে দাম বাড়বে কিনা সেটা আলোচনার বিষয়। এ বিষয়ে গঠিত কমিটি নিশ্চয় এ সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা করবে। কিন্তু সয়াবিনের নামে পাম অয়েল বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।

এ প্রসঙ্গে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হলে খুব বেশি কিছু বলার নেই। তবে সরকারের উচিত অন্যান্য সব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এখন মূল্যস্ফীতি যদি গড়হারে বাড়ে, কিন্তু আয় যদি না বাড়ে তাহলে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় ব্যয় সমন্বয়ে কষ্ট হবে। এজন্য মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়েও সরকারকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।   

শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে,  প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি হ্রাস পাবে। এটি অনূর্ধ্ব-১৫ বয়সের শিশুদের মৃত্যুর হার এবং মাতৃমৃত্যু হার কমাতে সহায়তা করবে। এজন্য নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী দেশে শতভাগ পাম, সয়াবিন ও রাইস-ব্রান তেলকে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ করা জরুরি। এজন্য বিএসটিআই-এর দক্ষতা উন্নয়ন করাসহ ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ তেল ব্যবহারে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং ভোক্তাদের সুরক্ষিত ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ড্রাম অয়েল (বাল্ক অয়েল) ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।

সভায় বলা হয়, গত ১২ জুলাই অনুষ্ঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৬ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ১৬ মার্চ ২০২২ তারিখের মধ্যে ড্রামে তেল সরবরাহ বন্ধ করে ফুডগ্রেড বোতল বা প্লাস্টিক ফয়েল বা পাউচপ্যাকে ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতি শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, শুধু এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ডেডলাইন দিয়ে কোনো কাজ হবে না। দেশের স্বার্থে ও পরবর্তী প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকল্পে এ বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।

এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ, সংস্থা ও রিফাইনারি প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি কমিটির গঠনের পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে কমিটি গঠন করে মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করার জন্য তিনি নির্দেশনা প্রদান করেন।