২৬ জেলায় বাড়তি সতর্কতা|322540|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
২৬ জেলায় বাড়তি সতর্কতা
সরোয়ার আলম

২৬ জেলায় বাড়তি সতর্কতা

যেকোনো অপ্রীতিকর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে দেশের ২৬ জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নতুন করে সতর্ক করা হয়েছে। সেখানে টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। স্থানীয় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিয়ে তাদের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত বিশেষ বার্তা এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের দেওয়া হয়েছে। সেখানে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির কারণে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে কিংবা সংখ্যালঘুদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ালে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আগাম হুঁশিয়ার করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা।

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে হিন্দুদের মন্দিরসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার আছে; তা আরও বাড়ানো হয়েছে। যেসব স্পর্শকাতর জেলা বা এলাকা রয়েছে সেখানে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে সবাই মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করে আসছি। কিন্তু হঠাৎ করে একটি চক্র অপতৎপরতা চালাচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধী ধরা না পড়বে, ততক্ষণ আমাদের কঠোর অবস্থান বলবৎ থাকবে।

পুলিশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, গতকাল বিকেলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি বৈঠক হয়েছ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ওই সভায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

তারা আরও জানান, কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৃতীয় একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলার পর সর্বশেষ গত রবিবার রাতে রংপুরে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি-দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। নতুন করে এ ধরনের হামলার আশঙ্কা না থাকলেও সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভীতি বিরাজ করছে; বিশেষ করে হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলাগুলোয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অস্বস্তিতে রয়েছে। অজানা ভয়ে সেখানে অনেকে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। এসব বিষয় সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশের ২৬ জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলাগুলো হলো ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পাবনা, বাগেরহাট, চাঁদপুর, মাগুরা, পঞ্চগড়, রংপুর, শরীয়তপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, কুষ্টিয়া ও নরসিংদী। 

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জামায়াত-শিবির ও হেফাজতের নেতাকর্মী এবং মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখার তাগিদ রয়েছে, যাতে কেউ কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা কোনো ধরনের ভীতি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো মাত্র তাকে আইনের আওতায় আনা যায়। এ ছাড়া ফেইসবুক-ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অন্য কোনোভাবে কেউ যাতে কোনো গুজব ছড়িয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে সে ব্যাপারেও পুলিশের সাইবার ইউনিটকে সতর্ক করা হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক শান্তি বিনষ্টের জন্য কোনো বিশেষ চক্র বা গোষ্ঠী যাতে নতুন করে ভীতি ছড়াতে না পারে, এ জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি বাড়াচ্ছেন গোয়েন্দারা। যাতে এ ধরনের ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করার সময়ই তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা যায়।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১০ দিন এ বাড়তি সতর্কতা থাকবে। এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে ধাপে ধাপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি কমিয়ে আনা হবে। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক অনুমেয় না হলে বিশেষ সতর্কতার মেয়াদ আরও বাড়বে।

পঞ্চগড় জেলার পুলিশ সুপার মো. ইউসুফ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। কেউ যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিতে না পারে, সে জন্য প্রতিটি থানাকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় সাদাপোশাকে গোয়েন্দারা কাজ করছেন।’

এদিকে গত বুধবার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের মন্দির, স্থাপনা ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ৭১টি মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আরও কয়েকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন। গত সোমবার রাত পর্যন্ত এসব মামলায় ৪৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত বিপুলসংখ্যক দুষ্কৃতকারী এখনো পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে বিভিন্ন জেলায় সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট ও ভিডিও ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর চেষ্টা করছে, এসব সাইবার অপরাধীরও একটি বিশাল তালিকা তৈরি করে র‌্যাব-পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযানে নেমেছে।

অন্যদিকে, রংপুরের পীরগঞ্জের জেলেপাড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘর-দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত অর্ধশত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেও আতঙ্ক কাটেনি সেখানকার বাসিন্দাদের। বড় করিমপুরের এলাকাবাসী পুলিশকে জানায়, চোখের সামনে চেনামুখগুলো এসে পেট্রল ঢেলে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। হাতে-পায়ে ধরেও তাদের এ কাজ বন্ধ করা যায়নি। ঘরে ঢুকে টাকা, স্বর্ণ, গরু, ছাগল লুট করে নিয়ে গেছে। তবে পুলিশের কাছে হামলাকারীদের নাম বলতে ভয় পাচ্ছে তারা।

রংপুরের পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, রংপুরের ঘটনায় এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকেও নাম জানা গেছে।

এদিকে কুমিল্লায় হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অনেকটা ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে; বিশেষ করে যে পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত, ওই এলাকার সংখ্যালঘু অনেক পরিবার এখনো বিনিদ্র রজনী পার করছে। তাদের ভাষ্য, সন্দেহভাজন অনেক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেও এ ঘটনার মূল ইন্ধনদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই যেকোনো সময় আবারও সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বস্তি পাচ্ছেন না।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, কুমিল্লার মণ্ডপে যিনি ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, যে ঘটনার কারণে এত কিছু, তিনি শিগগিরই ধরা পড়বেন। তিনি বারবার স্থান পরিবর্তন করছেন, তাই ধরা পড়ছেন না। তবে বেশিদিন তিনি পালিয়ে থাকতে পারবেন না।

পীরগঞ্জের ঘটনা প্রসঙ্গে আসাদুজ্জামান খান বলেন, পরিতোষ নামে এক তরুণ ফেইসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দিয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বাড়ি পুলিশ পাহারা দিয়েছে। তার বাড়িতে হামলা হয়নি, তার পাশের গ্রামে হামলা হয়েছে। গোয়েন্দারা হামলাকারীদের শনাক্ত করেছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। অপপ্রচারের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে ষড়যন্ত্রকারী কোনো চক্র নতুন করে যাতে হামলার ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, খোদ দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি দেশবাসীকেও এ ব্যাপারে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যখন বিশ্বসভায় একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ঠিক সে সময়ে একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি সৃষ্টির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। সরকার ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে এবং বাকিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সরকার পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা তত বেশি অপতৎপরতা শুরু করেছে। সম্প্রতি জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের কাছ থেকে দেশে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরির বিভিন্ন পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে।

‘যতন সাহা হত্যাকাণ্ড’ নামে ফেইসবুকে ভাইরাল ভিডিওটি গুজব: পুলিশ

‘যতন সাহা হত্যাকাণ্ড’ নামে ফেইসবুকে ভাইরাল ভিডিওটি মিথ্যা ও গুজব বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও একটি কুচক্রী মহল ১৫ অক্টোবর নোয়াখালীর চৌমুহনীতে যতন কুমার সাহা নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার ভিডিও বলে প্রচার করেছে। প্রকৃতপক্ষে ওই ভিডিওটি গত ১৬ মে রাজধানীর পল্লবীতে সন্তানের সামনে সাহিন উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার ভিডিও। পল্লবীর ওই ঘটনার প্রধান আসামিসহ অপর আসামিদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু কুচক্রী মহলটি পল্লবীর ওই ভিডিওটিকে এডিট করে যতন সাহা হত্যাকাণ্ডের ভিডিও হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেইসবুকে ভাইরাল করছে। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছড়ানো ওই ভিডিও প্রচারকারী মূলহোতাদের ধরতে বাংলাদেশ পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটসমূহ ইতিমধ্যেই তদন্ত ও আভিযানিক কার্যক্রম শুরু করেছে।’

মিথ্যা ও গুজব ভিডিওটি দেখে বিভ্রান্ত না হতে এবং অযাইকৃত যেকোনো কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না ছড়াতে দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।