সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং গণতদন্ত হওয়া উচিত|323251|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ অক্টোবর, ২০২১ ১৩:৫৪
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং গণতদন্ত হওয়া উচিত

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং গণতদন্ত হওয়া উচিত

মফিদুল হক

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মফিদুল হক একাধারে লেখক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও প্রকাশক। এই জাদুঘরের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রবর্তিত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ভাষ্যসংগ্রহ প্রকল্পের প্রণেতা ও পরিচালক। এই প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংগৃহীত হয়েছে ২৬ হাজারেরও বেশি ভাষ্য। দেশের নানা প্রগতিশীল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংগঠকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন তিনি। প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য ২০১৪ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্সের সদস্য এবং ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস’-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক তিনি। এবারের দুর্গাপূজায় দেশব্যাপী মন্দির-মন্ডপসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা এবং সামাজিক পরিসরে বিদ্বেষ ও অপপ্রচারসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন মফিদুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরেই হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এবার দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে লাগাতার একের পর এক হিন্দুদের মন্দির-পূজামণ্ডপ-ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-লুটতরাজ চালানো হয়েছে এমন সন্ত্রাস সাম্প্রতিককালে আর দেখা যায়নি। এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?

মফিদুল হক : দেশে এমন সহিংসতা ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। ক্রমেই এর নতুন নতুন মাত্রা বাড়ছে। এ বিষয়ে যে আমরা যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি, প্রতিকারের পদক্ষেপ নিতে পারিনি সে কারণেই এই সংকট আরও গভীর হয়ে উঠছে। এবার দুর্গাপূজায় সহিংসতার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে অনেকগুলো বাস্তব সত্য দেখিয়ে দিয়েছে। যে সত্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনেক রকমভাবে ফুটে উঠেছে, নানা ইঙ্গিত আমরা দেখেছি। এখন মনে হচ্ছে এই সংকটকে আর উপেক্ষা করা যায় না।

একটা বিষয় হলো, পূজা উপলক্ষে একটা শঙ্কা বহু আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে, যেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। একটা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে সচেতন প্রয়াসে এটা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের যে সমাজ, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের যে মৌল ভিত্তি, যে এখানে বাঙালি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এবং অন্যান্য জাতি-সম্প্রদায়ের মানুষরা বসবাস করছে এবং নিজ নিজ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাচ্ছে; সেটাকে একটা বিভাজনের দিকে নিয়ে যাওয়া আর বিভাজন থেকে ঘৃণা-বিদ্বেষ-সংঘাত উসকে দেওয়ার জন্য এসব করা হচ্ছে। এরই ন্যক্কারজনক বহিঃপ্রকাশ ঘটল এবার।

এই ঘটনা গোটা জাতির জন্যই একটা বড় ধরনের বিপদ সংকেত। আমাদের অবশ্যই এটা রুখে দাঁড়াতে হবে। এই ধরনের ঘটনার উৎস ও প্রবণতা রুখে দাঁড়াতে হবে এবং এর প্রতিকারের উপায়গুলো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। 

দেশ রূপান্তর : দেখা যাচ্ছে যে, রামু, নাসিরনগর ও শাল্লার ঘটনার মতোই এবারও ফেইসবুকে স্ট্যাটাস ও ভিডিও ভাইরাল করার মধ্য দিয়েই গুজব ও সহিংসতার উসকানি ছড়িয়েছে। এ প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেইসবুক ও ইউটিউবে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর কথা উল্লেখ করতে চাই। ইসলামি বক্তা বলে পরিচয় দেওয়া অনেক ব্যক্তি যেমন এসব করছে তেমনি সামাজিক পরিসরে নানা রকম ওয়াজ ও অন্যান্য মাহফিলেও প্রকাশ্যে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। সরকার ও পুলিশ প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভিন্নমত কিংবা ক্ষমতাসীনদের অবমাননার অভিযোগে ত্বরিত পদক্ষেপ দেখা গেলেও এসব নিয়ন্ত্রণে সেটা দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।    

মফিদুল হক : আগের কথার সূত্র ধরেই বলতে চাই, এখানেও কিন্তু দুটি দিক আছে। একটা সচেতনতা, আরেকটি প্রতিকারের ব্যবস্থা। কিন্তু এই শিক্ষাটা আমরা গ্রহণ করতে পারছি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের সামনে বড় একটা সুযোগ করে দিয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা দেখছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং অপপ্রচারের কাজে বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসবের মধ্য দিয়ে মানুষকে অপর একটা সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে সহিংসতার দিকে উসকে দেওয়া হয়।

এখানে সতর্কতার বিষয়টি খুব জরুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখনই কোনো ধর্মীয় সংবেদনশীল কন্টেন্ট শেয়ার করা হয় তখন সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের বিস্তার যেমন বাড়ছে তেমনি এই মাধ্যমে কিন্তু সবকিছুরই ফুটপ্রিন্ট থেকে যাচ্ছে। কোথায় কে কী শেয়ার করছে সেটা শনাক্ত করা কঠিন না। ফলে এখানে যদি বলি নজরদারি করা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ারও সুযোগ আছে। আমরা দেখি যখনই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যারা বক্তব্য দেন তাদের সঙ্গে সঙ্গেই খুঁজে বের করা হয় এবং আইনের আওতায় আনা হয়।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে এবং একইসঙ্গে মতপ্রকাশের সুযোগ নিয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোও রোধ করতে হবে। কেননা, রামু থেকে শুরু করে নাসিরনগর ও অন্যান্য ঘটনার মতোই কুমিল্লার ঘটনাতেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে, ভিডিও ছড়িয়ে মানুষকে সহিংসতার দিকে উসকে দেওয়া হয়েছে। এখানে সাংবদিকদেরও একটা দায়িত্ব আছে, এই ধরনের প্যাটার্নগুলো তুলে আনার এবং এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার। কেননা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপশি হেইট ক্যাম্পেইন বা বিদ্বেষমূলক প্রচার নিয়ন্ত্রণেরও ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই নিয়ন্ত্রণ মানে স্বাধীনতা খর্ব করা নয়। কারণ স্বাধীনতার নামে অপরের স্বাধীনতা খর্ব করা, হরণ করা কিংবা অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কাজ চালিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। এই সংকট এখন বিশ^জনীন। ফলে নানান চাপের মুখে গুগল, ফেইসবুকও এখন এসব নিয়ন্ত্রণের নানারকম ব্যবস্থা তৈরি করেছে। অনেকগুলো ভাষাতেই এখন এটা করা হচ্ছে। তারা কিছু শব্দ বা ‘কি-ওয়ার্ড’ নির্দিষ্ট করেছে, যেগুলো কোথাও ব্যবহার করা হলে সহজেই সেসব খুঁজে নিয়ে যাচাই করে দেখা যাবে যে কোনো ধরনের হেইট-ক্যাম্পেইন বা বিদ্বেষমূলক প্রচার চলছে কি না। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো আমরা এসব বিষয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিইনি।

এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে কুমিল্লার ঘটনা প্রথম কে ফেইসবুকে দিয়েছে সেটা খুঁজে বের করতে এতদিন লাগার কথা না। সেটা একঘণ্টার মধ্যেই হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে ফেইসবুকসহ এসব মাধ্যমে কোনো স্ট্যাটাস-ভিডিও-ছবি যেমন মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে যেতে পারে তেমনি মুহূর্তের মধ্যেই সেটা পোস্টকারীকে খুঁজে বের করার এবং আপত্তিকর কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলা বা নিয়ন্ত্রণেরও ব্যবস্থা আছে। আর সমাজে যদি এটা জানা থাকে যে, আমি যদি এ ধরনের কোনো পোস্ট দিই বা কন্টেন্ট শেয়ার করি তাহলে সেটা খুঁজে বের করা এবং আমি দায়ী হলে আমাকে ধরে ফেলা কঠিন কিছু না, তাহলে মানুষও এমন কাজ করার আগে ভাববে। এটা সম্ভব হলে আমরা পরিত্রাণের পথ পাব। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে আমরা এটা চলতে দিচ্ছি এবং সমাজে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে।

আরেকটি বিষয় হলো, এই ধরনের বিদ্বেষ ছড়ানো এবং উসকানি দেওয়ার যেসব ঘটনা ঘটে, তারা যে এটা করতে পারছে এবং সফল হচ্ছে তার কারণ হলো, সমাজে অনেক রকম পশ্চাৎপদ চিন্তা টিকে আছে। অনেক মূর্খতা, অন্ধত্ব এখন সমাজে জেঁকে বসছে। মানবিক মূল্যবোধ, অপর মানুষ, অপর ধর্ম, অপর সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরমত সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সেটা সমাজে জোরদার করতে হবে। সেজন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার বিস্তারে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার।

দেশ রূপান্তর : কুমিল্লার নানুয়া দীঘির প্রথম ঘটনার পরদিন প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও একের পর এক হামলা ছড়িয়ে পড়তে থাকল। সহিংসতা রোধ করতে না পারার জন্য পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতার কথাও আলোচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা-সহিংসতার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটকে দায়ী করে আসছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। আর  বিএনপিও যথারীতি দায়ী করছে আওয়ামী লীগকে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মফিদুল হক : সহিংসতার যে ঘটনা ঘটল সেখান থেকে কয়েকটা সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি। প্রথম কথা হলো, প্রথম দায়িত্বটা সরকারের, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেখানে কিন্তু একটা চরম ব্যর্থতা আমরা দেখছি। কুমিল্লার ঘটনার পর আমরা দেখলাম একটা দীর্ঘ সময় সরকার এবং প্রশাসন একটা নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে থাকল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম রাতে যে বক্তব্য দিলেন, সেখানেও তিনি ঘটনার তদন্ত করাসহ অনেক কথা বললেও আসল কথাটা বলেননি। এটা যে সুস্পষ্টভাবে একটা উসকানিমূলক ঘটনা এবং এর উদ্দেশ্যই ছিল সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া, সেই শিক্ষাটা আমরা নিলাম না। এটা জানা সত্ত্বেও প্রশাসন এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিল।

বিশেষত চৌমুহনীর ঘটনা যদি দেখি, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি সাংস্কৃতিক জোটের অন্যদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। একটা প্রশাসনের প্রথম দায়িত্বই হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আর পুলিশের যে প্রশিক্ষণ সেখানে একটা বড় শিক্ষা হচ্ছে যখন কোনো ‘মব ভায়োলেন্স’ বা দলগত বড় সহিংসতা হয় তখন কীভাবে উন্মত্ত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নিষ্ক্রিয় করতে হবে। সেখানে পুলিশ আছে, ম্যাজিস্ট্রেট আছে, বিজিবি আছে এবং অনেক রকম ব্যবস্থাই আছে। কিন্তু আমরা সেখানে একটা চরম ব্যর্থতা দেখলাম। ফলে এসব ঘটনার অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষীদের আইনের আওতায়, বিচারের আওতায় আনা উচিত। এক্ষেত্রে অবশ্যই একটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত এবং আমি মনে করি, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও একটা গণতদন্ত হওয়া উচিত। যাতে আমরা এই সহিংসতা থেকে শিক্ষা নিতে পারি এবং এসব মোকাবিলায় কাজে লাগাতে পারি।

এখানে আরেকটা বিষয় হলো, সরকার মানে তো রাজনৈতিক সরকার। ফলে রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি আসবেই। আর রাজনৈতিক বিবাদ বা একে অপরকে দোষারোপের যে বিষয়টি সেক্ষেত্রেও বলব, দেশে এমন সব ঘটনারই বিশদ তদন্ত হওয়া দরকার। কেননা এসব ক্ষেত্রে কার কী দায়দায়িত্ব, কার কী ভূমিকা সেসব অবশ্যই সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে উদঘাটিত হতে হবে। সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবারই জবাবদিহি থাকতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

মফিদুল হক : আপনাকে এবং দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ