বাংলাপিডিয়ার স্রষ্টা প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম|324096|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০
বাংলাপিডিয়ার স্রষ্টা প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

বাংলাপিডিয়ার স্রষ্টা প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম

জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার উদ্ভাবক, প্রযোজক ও বাস্তবায়ক ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলাম ছিলেন একাধারে জ্ঞানগর্ভ গবেষক আবার সরস রচনায় তার ফলাফল উপস্থাপক। তার লেখায় গবেষণার ফলাফল যেমন থাকত, তেমনি আবার গবেষণা ফল সবাইকে আকৃষ্ট ও আগ্রহ সৃষ্টির উপাদানে সমৃদ্ধ। তার গবেষণার কেন্দ্রে ছিল কৃষি অর্থনীতি, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বন্দোবস্ত-উত্তর কোম্পানি ও ব্রিটিশ আমলে ভূমি ব্যবস্থাপনা, ল্যান্ড রেকর্ড ও সার্ভে ও আর্থ-প্রশাসনিক বিষয়। তিনি ১৯৭৮/৭৯ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র কমনওয়েলথ ফেলো, ১৯৯০/৯১ সালে সিনিয়র ফুল ব্রাইট, ২০০৪ সালে ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে কোম্পানি ও ব্রিটিশ আমলের আর্থ-প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সুশীল গবেষক ও অথরিটি অভিধায় আখ্যায়িত করা হয়। লন্ডনের রয়েল সোসাইটি অব হিস্টোরিকাল স্টাডি’র তিনিই প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশি ফেলো। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আর্থ প্রশাসনিক বিষয়ে বহির্বিশ্বে সুপরিচিত তার অন্যতম তিনটি আকরগ্রন্থ Permanent Settlement in Bengal (Dhaka 1979); Villages in the Haor Basin of Bangladesh (Tokyo 1985), Bangladesh Land Tenure (Amsterdam 1983, Calcutta, 1985)|

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম ব্রিটিশ আমলে কৃষি জমির বন্দোবস্ত, আর্থ-প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র এবং বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ওপর তার কাজের জন্যও বিখ্যাত হলেও বাংলাপিডিয়ার পথিকৃৎ হিসেবেই তিনি পরিকীর্তিত হবেন এবং এ কারণে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি,  বাংলাপিডিয়া ও সিরাজুল ইসলাম সমার্থকের পর্যায়ে উপনীত। আজ ২৯ অক্টোবর তার ৮২তম জন্মদিন। তার সৃজনশীল অন্যতম কর্মস্থল এবং বাংলাপিডিয়ার প্রকাশক বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি আজ তাকে বিশেষ সম্মাননা জানাবে এবং এ উপলক্ষে ‘প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম : বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির আধুনিকীকরণের পথিকৃৎ’ শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হবে।

সিরাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০০০ সালে বাংলাপিডিয়া’র জন্য পূর্ণ সময় দিতে অবসর গ্রহণের আনুষ্ঠানিক তারিখের পাঁচ বছর আগে তার ৩৪ বছরের চাকরি ছেড়ে দেন। নিজেকে পুরোপুরি গবেষণাকর্মে নিয়োজিত করার লক্ষ্যে এবং জীবনের বাকিটা সময় দেশের কল্যাণে গবেষণা করার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার পছন্দের গবেষণার স্থান হিসেবে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিকে বেছে নেন। 

তিনি বাংলাপিডিয়ায় তার জীবনের নয়টি বছর উৎসর্গ করেছিলেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষুদ্র বিবরণ নথিভুক্ত করার ভয়ংকর কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য স্বেচ্ছা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। তথ্য সংগ্রহের কাজটি সহজ ছিল না। প্রতিটি কমিটিতে তিন থেকে চারজন করে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা ২৬,০০০ এন্ট্রি নিয়ে আসেন। মনে হয়েছিল এতগুলো এন্ট্রির জন্য ন্যূনতম ২০টি খণ্ডের প্রয়োজন হবে এবং কাজটি মূলধন-নিবিড় প্রকৃতির কারণে এটি সম্ভব হবে না। পরে ৬,০০০ এন্ট্রিতে স্ক্রিন করা হয়। সমস্ত এন্ট্রি ইংরেজি এবং বাংলা উভয় ভাষায় অনুবাদ করতে অনেক অনুবাদকের এবং এডিটিং, ফটোগ্রাফি, ডিজাইন, গ্রাফিক্স, ফটোগ্রাফি, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং গবেষণায় বহু হাতের প্রয়োজন হয়েছিল। সবকিছু একসঙ্গে আনার জন্য এটি একটি আশ্চর্যজনক অর্জন ছিল। তার সমন্বিত প্রচেষ্টায় ও সম্পাদনায় বাংলাপিডিয়া ১০ খণ্ডে বাংলা ও ইংরেজি ভাষাসহ ডিভিডি, এবং  অনলাইন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। যা ইতিমধ্যে দেশের কোটি মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। দেশি-বিদেশি অসংখ্য গবেষক এই গ্রন্থ পেয়ে উপকৃত হয়েছেন।  বাংলাপিডিয়া সম্পূর্ণ করতে খরচ হয়েছিল ৮ কোটি টাকা। ১৯৯৬ সালে যখন প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়, তখন এশিয়াটিক সোসাইটির অ্যাকাউন্টে ৮ লাখ টাকার কম ছিল। বাংলাপিডিয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক সংস্থা এমনকি বেসরকারি ব্যক্তিদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়েছিল। ১৯৯৪-২০০০ সালে আমি তখন জাপানে, টোকিও দূতাবাসে কমার্শিয়াল কাউন্সেলর। তিনি সে সময় চারবার গেছেন জাপানে। আমাকে বেশ কয়েকবার পত্র লিখেছেন, ব্রশিওর, ফ্লায়ার পাঠিয়েছেন কীভাবে ন্যাশনাল এনসাইক্লোপিডিয়া প্রণয়নে জাপানি গবেষণা, পরামর্শ ও আর্থিক অনুদানের সংস্পর্শ পাওয়া যায়। শত শত চিঠি লিখেছেন। সরকারসহ যোগাযোগ রেখেছেন বহু জায়গায়।

বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের ভার্চুয়াল অ্যাম্বাসেডর। বিশ্বের প্রায় সব বড় লাইব্রেরিতে বাংলাদেশের একটি সিরিজ আপনি তাকটিতে পাবেন, তা হলো বাংলাপিডিয়া। বইটিতে ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সাহিত্য, পরিবেশ এবং আরও অনেক কিছুর মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ৬,০০০ এন্ট্রি  রয়েছে । প্রকৃতপক্ষে, প্রতিবেশী দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশেও এই মাত্রার কিছুই করার চেষ্টা করা হয়নি। বাংলাপিডিয়া মূলত সময় ও তথ্য সংরক্ষণকারী সাহিত্য। পশ্চিমে কেউ  যখন স্কলারলি কাজ করেন, সেখানে সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সাধারণত বিভিন্ন সংযোজিত প্রকাশনার মাধ্যমে সহজে পাওয়া যায় এবং সহজে অভিগম্য। অথচ এতদঞ্চলে, বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানসমৃদ্ধ গবেষণা করা অসম্ভব। বাংলাপিডিয়া সেই দুর্দশা মোচন এবং বাংলাদেশের সব প্রজন্মের কাছে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক জ্ঞানচর্চার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বাংলাপিডিয়ার নতুন অনলাইন সংস্করণ প্রকাশের প্রয়াস চলছে। আগামী ডিসেম্বরের ২০২১ এর মধ্যে সহস্রাধিক নতুন এন্ট্রিসহ পুরনো এন্ট্রিসমূহের হালনাগাদ তথ্য সন্নিবেশ ও পরিবেশিত হবে।     

সিরাজুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৬১ সালে বিএ অনার্স ও ১৯৬২ সালে এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন এবং ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। তার আগে তিনি মোমেনশাহী আনন্দমোহন কলেজ ও ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করেন। তিনি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৬৮ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের দি স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৭২ সালের প্রথমদিকে ‘বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ শীর্ষক গবেষণাকর্মের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

বাংলাপিডিয়া ছাড়াও তার সম্পাদনায় এশিয়াটিক সোসাইটির ফ্লোরা ফনা, কালচারাল সার্ভে অব বাংলাদেশ, ছোটদের বাংলাপিডিয়া, ঢাকার ৪০০ বছর, ৩ খণ্ডে বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭০৪-১৭৯২) প্রকাশিত হয় ।  এসব প্রকল্পের জন্য অর্থসংস্থান, নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নে তার দক্ষ নেতৃত্ব ছিল প্রবাদসম। তিনি ছিলেন  বরাবরই বড় মাপের গবেষক, সংগঠক ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনার পৃষ্ঠপোষক। জাতীয় পর্যায়ে জ্ঞানগর্ভ গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং সঠিক সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার অবিচল ও অয়োময় প্রত্যয়কে জাতি সব সময় সম্মান ও সমীহ করবে। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে তিন খণ্ডে বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭০৪-১৯৭১) প্রথম প্রকাশনার সময় প্রকাশনা অনুদান গ্রহণ নিয়ে একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যা তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও সুবিবেচনার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন। ২০০২ সালে বাংলাপিডিয়া প্রথম প্রকাশের প্রাক্কালেও বেশ কিছু স্পর্শকাতর অভিযোগ ও প্রসঙ্গের বেড়াজাল গজিয়ে ওঠে। সেখানেও তার দৃঢ়চিত্ত অবস্থান প্রচেষ্টা জয়ী হয়েছিল।

বাংলাদেশের আবহমান ইতিহাস-ঐতিহ্যের ও সমাজ-সংস্কৃতির স্বরূপ পরিবর্তন প্রয়াস শনাক্ত করেছেন তিনি- ‘একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দেশ হিসেবে বাংলার ছিল নিজস্ব রীতিনীতি, প্রথা, প্রতিষ্ঠান, যা হাজার বছর ধরে বাঙালি সমাজকে একীভূত রেখেছে, দিয়েছে ঐক্য ও নির্দিষ্ট পরিচয়। কিন্তু কর্নওয়ালিশ এ সমাজকে ভিন্নভাবে পুনর্গঠিত করতে চেয়েছেন এবং এর জন্য তিনি প্রণয়ন করেন নতুন নতুন আইনকানুন ও প্রতিষ্ঠান, যে-সবের চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’।

‘... ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো মতেই মোগল সাম্রাজ্যবাদী শাসনের চেয়ে কম স্বৈরাচারী ছিল না। কিছু একটা তফাৎ ছিল, মোগল স্বৈরাচার ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং অভিজাততান্ত্রিক, কিন্তু ব্রিটিশ স্বৈরাচার ছিল প্রাতিষ্ঠানিক এবং নির্দেশিতভাবে প্রতিযোগিতামূলক। ব্রিটিশ স্বৈরাচারী শাসন পরিচালনা করত একদল পেশাদার আমলা, যারা নিয়ন্ত্রিত হতো আইন ও উচ্চতর আমলাদের দ্বারা এবং কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা অনুযায়ী তারা কাজ করত না [যেমনটি দেখা যেত] মোগল স্বৈরতন্ত্রে।’

তার উল্লেখযোগ্য মৌলিক গ্রন্থ ও গবেষণাকর্ম হচ্ছে ক. বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯০-১৮১৯), খ. বাংলার ভূমিস্বত্ব : মধ্যবর্তী শ্রেণির উদ্ভব, গ. বাংলাদেশের নদী অববাহিকার গ্রামসমূহ, ঘ. বাংলাদেশের গ্রামীণ ইতিহাস, ঙ. ফজলুল হক পরিষদ স্মারক বক্তৃতা, চ. ভূমি ব্যবস্থা ও সামাজিক সমস্যা, ছ. ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো, জ. ভূমি ও ভূমি সংস্কার। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম দেশের বিভিন্ন জেলার ব্রিটিশ আমলে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের গেজেটগুলোর ওপর গবেষণা করে ১২ খণ্ডে গেজেটগুলোকে প্রকাশ করেন। ১. চট্টগ্রাম জেলা গেজেট ১৭৬০-১৭৯০, ২. কুমিল্লা জেলা গেজেট ১৭৭২-১৭৯০ (৩ খণ্ডে), ৩. ঢাকা জেলা গেজেট ১৭৭২-১৭৮২ (২ খণ্ডে)।

জন্মদিনে তাকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির কাউন্সিল সদস্য