ভারতে কিডনি বিক্রি করছে অসহায় মানুষ|326269|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০
ভারতে কিডনি বিক্রি করছে অসহায় মানুষ
রেজাউল করিম রেজা, জয়পুরহাট

ভারতে কিডনি বিক্রি করছে অসহায় মানুষ

কারও ঘরে বিয়ের যোগ্য কন্যা, কারও ঘরে খাবার নেই দীর্ঘদিন, কারও আবার নেই ঘর বানানোর জায়গা বা সামর্থ্য কোনোটাই। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার এমন চার শতাধিক হতভাগ্য মানুষের দিন কাটছিল অন্যের জায়গায়, অন্যের সহায়তায়। আর দিন দিন বাড়ছিল দেনার দায়। এর মধ্যে দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে, ভাগ্য বদলের আশায় গোপনে ভারতে গিয়ে কিডনি বিক্রি করেছেন তারা। গত ১০ বছরে তাদের অনেকেই হয়ে উঠেছেন দালাল চক্রের সদস্য। অসংখ্য মানুষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। কিন্তু অভাব আর লোভের তাড়নায় দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে ওই এলাকার কিডনি ‘বাণিজ্য’। প্রশাসনের সচেতনতামূলক প্রচার ও আইনের প্রয়োগ কোনো কিছুই লাগাম টানতে পারছে না তাতে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার ২৫ গ্রামের তিন শতাধিক মানুষ তাদের একটি করে কিডনি বিক্রি করে দেন। আর সম্প্রতি ২০২০ থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন আরও ১০টির বেশি গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ দালালদের খপ্পরে পড়ে কিডনি বিক্রি করেছেন। অথচ দেশের আইনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় বা উপহার বিনিময়ে কোনো প্রকার সুবিধা লাভ এবং সেই উদ্দেশ্য কোনো প্রকার বিজ্ঞাপন প্রদান বা অন্য কোনোভাবে প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এজন্য আছে জেল-জরিমানার বিধানও। কিন্তু অভাবের তাড়নায় বা লোভের কারণে কিডনি বিক্রি করে আত্মগোপনে চলে যান অনেকে।

এদিকে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে কালাই উপজেলার মাত্রাই ও উদয়পুর ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের বেকার, দিনমজুর, ভ্যানচালক, হতদরিদ্র সহজ-সরল মানুষগুলোকে টার্গেট করে দালাল চক্র ও দাদন ব্যবসায়ীরা। অভাবের সময় কিছু টাকা চড়া সুদে ধার দেয় তারা। পরে তাদের ধার ও সুদের টাকা সময়মতো না দিতে পারলে, শুরু হয় কিডনি বিক্রি প্ররোচনা। কাউকে সরাসরি কিডনি কেনার কথা বলা হয়, কাউকে ঢাকায় ভালো বেতনে কাজের লোভ দেখানো হয়। তারপর তাদের ঢাকায় নিয়ে চুক্তি করা ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে নিয়ে করা হয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা। তখনই কিডনি বেচাকেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়।

পরে বিভিন্ন জেলা থেকে পাসপোর্ট ও ভিসার কাজ শেষ করে পাঠানো হয় ভারতে। সেখানে দালালদের চুক্তি করা হাসপাতালে হয় কিডনি ট্রান্সফার। কিডনি দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই হাসপাতালের ব্যবস্থাপত্র বা অন্য কোনো কাগজপত্র ছাড়াই শুধু পাসপোর্ট দিয়ে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেশে আসার পরই শুরু হয় তাদের শারীরিক নানা জটিলতা। অনেকে সময় চুক্তিমতো মেলে না টাকাপয়সাও। পরে আইনি জটিলতার ভয়ে তারা আর মুখ খুলতে পারেন না। কোনো কারণে দালাল চক্রের কেউ ধরা পড়লেও ‘প্রভাব খাটিয়ে’ ছাড়া পেয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করে কাজ।

কালাই কুসুমসাড়া এলাকার রাজমিস্ত্রির হেলপারের স্ত্রী কারিনা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে ঢাকায় গার্মেন্টসে ভালো বেতনে চাকরির কথা বলে প্রতিবেশী এক দালাল আমাকে ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখানে গার্মেন্টসে কাজ করা অবস্থায় আমাকে একটি কিডনির বিনিময়ে সাড়ে ৬ লাখ টাকার লোভ দেখানো হয়। পরে আমার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভারতে নিয়ে গিয়ে কিডনি খুলে নেয়। টাকা চাইলে উল্টো হুমকি দেয়। চেয়ারম্যান-মেম্বারের দ্বারে ঘুরে ঘুরে বিচার বা টাকা না পেয়ে আদালতে মামলা করেছিলাম। কিন্তু মামলার পর কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে ৩ লাখ টাকা দিয়ে আপস করতে বাধ্য করে।’ তিনি জানান, আপসের পর ওই আসামিরা প্রকাশ্যেই ঘুরছে এবং তাকে হুমকির মধ্যে রেখেছে।

উপজেলার মাত্রাই মদনাহার গ্রামের আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসারের অভাবের কারণে আমি ২০ হাজার টাকা হামিদুল নামে এক প্রতিবেশীর কাছে ধার নিই। তারপর ধারের টাকা যখন দিতে পারি না তখন সে আমাকে টাকার জন্য চাপ দেয়। এরপর হামিদুল জানায় টাকা না দিতে পারলে তোর কিডনি বেচ, ১০ লাখ টাকা পাবি। আমি বাধ্য হয়ে কিডনি বিক্রি করি। কিন্তু শর্তমতো টাকা দেয়নি তারা। হামিদুল সাড়ে ৩ লাখ টাকা আমাকে দিয়েছে। বাকি টাকা চাইলে আমাকে হুমকি দেয়। শরীরের ডানপাশ জুড়ে ব্যথা। কোনো কাজ এখন আমি করতে পারি না।’

কালাই উপজেলার কুসুমসাড়া গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. মোস্তফা বলেন, ‘আমার এক শতক জমিজমা নেই। আমি খুব গরিব মানুষ। কয়েক বছর আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার জন্য কলকাতায় কিডনি বিক্রি করেছি। এখন কোনোমতো অটোরিকশা চালাই। কিন্তু শরীরটা ভালো নেই আগের মতো।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় কালাই উপজেলার ২০-৩০ মহাজন প্রকৃতির দালাল ও দাদন ব্যবসায়ী একটি কিডনি বিক্রি চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে শত শত মানুষের কিডনি এই এলাকা থেকে বিক্রি করেছে। তাদের প্ররোচনায় কুসুমসাড়া, মদনাহার, দীঘিপাড়া গ্রামের বেশ কয়েকটি পরিবার বাড়িতে তালা দিয়ে কিডনি বিক্রি করতে গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গত ১০ বছরে এ পর্যন্ত মাত্র ছয়-সাতটি মামলা হয়েছে। ওইসব মামলার আসামির অনেকে জামিনে আছে। মদনাহার গ্রামের আজিজুলের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া দালাল হামিদুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজিজুল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছে।’ তবে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে ঘটনার সত্যতা। শুরু তাই নয়, হামিদুলের ছোট ভাইও এখন সক্রিয় দালাল।

এ বিষয়ে কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ ন ম শওকত হাবীব তালুকদার লজিক ও উদয়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়াজেদ আলী দাদা বলেন, ‘যারাই কিডনি বিক্রি করছেন তারাই আবার দালাল হয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে কিডনি বিক্রির প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সভা-সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি করছেন।’

কালাই উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান মিনফুজুর রহমান মিলন বলেন, ‘আমি মনে করি দালাল চক্রের জন্য কঠোর আইন করা দরকার, তেমনি দালালরা প্রতারিত করে যাদের কিডনি নিচ্ছেন তাদের সুরক্ষা দেওয়া দরকার।’

জয়পুরহাট সিভিল সার্জন ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘সরাসরি আইন প্রয়োগ করার সুযোগ আমাদের নেই। আমরা এর শারীরিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে সচেতনতামূলক কাজ করছি।’

কালাই থানার ওসি সেলিম মালিক বলেন, ‘কিডনি বেচাকেনায় যেকোনো অভিযোগ বা তথ্য পেলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ আর উপপরিদর্শক এসএম জোবায়ের হোসেন বলেন, নভেম্বরের ৪ ও ৫ তারিখে ডিবি পুলিশ ফিরোজ ও হামিদুল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। সেই মামলার তদন্ত চলছে। এছাড়া আরও কয়েকটি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯-এর ৯ ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় বা উপহার বিনিময়ে কোনো প্রকার সুবিধা লাভ এবং সেই উদ্দেশ্য কোনো প্রকার বিজ্ঞাপন প্রদান বা অন্য কোনোভাবে প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনের ১০(১) ধারা অনুযায়ী কেউ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বা ক্রয় কিংবা সহায়তা করলে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। শাস্তির বিধান অক্ষুন্ন রেখে ২০০৯ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনেও সংযোজন করা হয়েছে।