ধু ধু মাঠের পাড়ে একজন হাসান স্যার...|327645|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ নভেম্বর, ২০২১ ২৩:৩৫
ধু ধু মাঠের পাড়ে একজন হাসান স্যার...
অর্বাক আদিত্য

ধু ধু মাঠের পাড়ে একজন হাসান স্যার...

হাসান আজিজুল হকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেল অফিসে বসে। তিনি আজ (১৫ নভেম্বর, রাত ৯টার দিকে) চলে গেলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রায় নিয়মিতই আমাদের যাতায়াত ছিল বিহাসে। ‘বিহাস’ হাসান আজিজুল হক স্যারের আবাসস্থল। বিহাসে আমাদের যাওয়া আসা হতো হাসান আজিজুল হক, জুলফিকার মতিন, সনৎকুমার সাহা বা বিধান সাহা স্যারকে কেন্দ্র করে। বেশির ভাগ সময়ই হয়তো কোনো পত্রিকা দিতে, লেখা নিতে, কখনো সাক্ষাৎকার নিতে, কখনো বাইরে থেকে কেউ এসেছেন তাকে নিয়ে। ঠুনকো কারণে স্যারের কাছে যাওয়ার পথ খুঁজতাম। পেয়ে গেলেই, চলে যেতাম। কখনো দল বেঁধে, কখনো দু-একজন, কখনো শহীদ ইকবাল স্যারের সঙ্গে। আমাদের পাঠ্য থাকার কারণে, হাসান আজিজুল হক পড়া শুরু। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ‘মা মেয়ের সংসার’ পড়া। তারপর এক এক করে অনেক টেক্সটই পড়া হয়েছে।

হাসান আজিজুল হককে শৈশবে সেভাবে চিনতাম বা জানতাম না। বরং যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই, তখন দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আসার সঙ্গে সঙ্গে এ মানুষটার নাম জড়িয়ে যায়। তখন থেকেই এক অজ্ঞাত বাসনা পেয়ে বসে হাসান স্যারের সান্নিধ্য পাওয়ার। আমি যখন প্রথম বর্ষে তখন তিনি অবসরে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে। আমরা হাসান স্যারের কথা শোনার জন্য ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চলে যেতাম সেসব অনুষ্ঠানে। দূর থেকে দেখতে দেখতে আমাদের আগ্রহ উথাল-পাথাল হয়ে ওঠে। একটু সিনিয়র হই, আর সেই দূরত্ব কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। বিশেষ করে ‘চিহ্নে’ জড়ানোর পর নিয়মিত যাতায়াত তৈরি হয় হাসান স্যারের বিহাসে। তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি। অনেক অনেক। তার শুরুর দিকের গল্প, জার্নি, প্রকাশনা, পুরস্কার।

স্যারের পড়ার ঘরে একটা ছবি আছে ,মাঝবয়সী হাসান আজিজুল হক একটি ধু ধু মাঠের বটগাছের নিচে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ওই ছবিটার গল্প কতবার যে শোনা হয়েছে! এরপর আছে স্যারের পড়ার টেবিলে বকুল ফুল রেখে দেওয়ার গল্প, ছেড়ে আসা বর্ধমান, শৈশবের গল্প।

আমরা যেতাম দল বেঁধে আর ফিরতাম একজন হয়ে। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে তখন একজন করে হাসান আজিজুল হক ঢুকে বসে থাকতেন। আজ স্যারের চলে যাওয়া, স্মৃতির দিকে নিয়ে যায়। টগবগে ছাত্র বয়সের সেসব স্মৃতি কখনো হারাবে না, হয়তো যত অতীত হবে, তত আরো উজ্জ্বল হবে।

হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে দুটো দাগকাটা স্মৃতি বারবার মনে উঠছে। তার একটি আমাদের হাসানীয় জীবনের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে। আর অন্যটি একান্ত ব্যক্তিগত..

তখন হাসান আজিজুল হকের একাশিতম জন্মদিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম সাজানো হয়েছে রাজপ্রাসাদের মতো করে। সাউন্ডবক্সে বাজছে স্যারের কোনো সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ। দরাজ কণ্ঠে সেই সব সাক্ষাৎকার আমাদের আন্দোলিত করেছে। আমরা অপেক্ষায়, কখন আসবেন বাংলা কথাসাহিত্যের বরপুত্র হাসান আজিজুল হক।

এর মধ্যেই দেখি হুড়োহুড়ি লেগে গেল। একটি কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল অডিটোরিয়ামের সামনে। নেমে দাঁড়ালেন হাসান আজিজুল হক। দুপাশে দাঁড়িয়েছেন বাঘা বাঘা অধ্যাপক, প্রশাসনের লোকজন। আর শাড়ি পরে সুন্দরীরা ফুল ছিটাচ্ছেন। লালগালিচা ধরে প্রাসাদের দিকে, সিংহাসনের দিকে এগোচ্ছেন হাসান আজিজুল হক। তিনি প্রবেশ করলেন ভেতরে। মুহূর্তেই হাজার হাজার দর্শকের অডিটোরিয়াম নত হয়ে গেল। এ যেন এক বীরপুরুষের যুদ্ধ জয় করে ফেরাকে বরণ করে নেয়া। তার কাছে নত স্বীকার করা।

ফুলের তোড়া নিয়ে লাইন পড়ে গেছে। মাইকে একের পর এক ঘোষণা হচ্ছে, আর সেই ফুল, শ্রদ্ধা গ্রহণ করছেন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ছোটখাটো একজন মানুষ। বাংলা ভাষার কথাকার হাসান আজিজুল হক। আমাদের মনে অজান্তে সেই তৃষ্ণা জেগে উঠল। আমাদের হাসান আজিজুল হক হতে হবে। এমন একটা জীবন দরকার। যে জীবনের কাছে সমস্ত ক্ষমতা নত হয়ে যায়।

দ্বিতীয় আরেকটি স্মৃতির কথা বলা যাক। শীত সবে পড়তে শুরু করেছে। হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় আছে সন্ধ্যার পর। আমরা তিনজন রিকশা নিয়ে বিহাসের সামনে নেমে স্যারের বাসায় গিয়ে কলিং বেল বাজালাম। ভেতর থেকে একজন বললেন, কোথা থেকে আপনারা? আমরা বললাম, বিশ্ববিদ্যালয় হতে। শহীদ ইকবাল স্যার পাঠিয়েছেন।

ওই কণ্ঠ ভেতরে যেতে বললেন। গিয়ে দাঁড়ালাম স্যারের সামনে। তিনি সোফায় বসে ভারতীয় টিভি সিরিয়াল দেখছেন। আমরা অগত্যা দাঁড়িয়েই আছি। তিনি বললেন, তোমরা সিপাহি গো, তারপর বললেন, দাঁড়াও পর্বটা শেষ হোক। তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি।

পর্ব শেষ হলো, তার পড়ার রুমে গিয়ে বসলাম। তিনি খেতে দিলেন, অরেঞ্জ কালারের মিষ্টি। আর হো হো করে হাসলেন। বললেন, তোমরা তরুণ, মিষ্টি খেলে কিছু হবে না। আমরা তো আর খেতে পারি না। আর ওই কালার মিষ্টি খেলে কিছু হবে না। তারপর সিপাহির আলোচনা ধরে শোনালেন, শৈশবের গল্প। দেশ ছেড়ে আসা। সেসময়ের গাঁয়ে কাঁটা দেওয়া না শোনা গল্পকাহিনী।

হাসান স্যারের বাসায় যখনই যেতাম, তখনই তিনি হাসতে হাসতে বলতেন, এখন আর নাম মনে রাখতে পারি না গো। তোমরা সিপাহি নামেই থাকো।

হাসান স্যারের কাছে আর কখনো শোনা হবে না, সিপাহি এসে হাজির, এবার রক্ষা  নেই….

অর্বাক আদিত্য: কবি, সাংবাদিক