ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা|329361|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০
ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা

ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসা

দেশের অনগ্রসর স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটাও করোনা মহামারীতে একেবারে নগ্ন হয়ে ধরা দিল। যখন ত্বরিত চিকিৎসার নিশ্চয়তা জরুরি, তখনই আমরা দেখতে পাচ্ছি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা খরচের নামে অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দিয়ে গলা কাটা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরের সর্বত্রই বহু বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠছে। অথচ বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে মানুষ আশা করেছিল যে, সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি  বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোও মহামারীর কালে চিকিৎসাসেবার হাত বাড়িয়ে দেবে।

গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালের রোগীর ওষুধে ৪ গুণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১৩ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় ১৪ গুণ বেশি। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হলেও সাধারণ শয্যার রোগীকে সরকারের মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশ এবং আইসিইউ রোগীকে ৮ শতাংশ অর্থ বহন করতে হয়েছে নিজের পকেট থেকে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগীর পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখেও পড়তে হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের একটি গবেষণায় দেশের করোনা রোগীর এই চিকিৎসা ব্যয় উঠে এসেছে। সরকারিতে রোগীপ্রতি ব্যয় ১৩৪৪৮৫, বেসরকারিতে ২৪২৭৪ টাকা। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় চিকিৎসাধীন একজন করোনা রোগীর পেছনে মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ টাকা। এর মধ্যে সরকার রোগীপ্রতি ব্যয় করেছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১০৯ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৯৫ শতাংশ এবং বাকি ৬ হাজার ৩৭৬ টাকা রোগীর ব্যয় করতে হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশ। সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে রোগীপ্রতি মোট চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ রোগীর তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা ব্যয় ছিল প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যার একজন রোগীর চিকিৎসায় যেখানে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮৫ টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এই ব্যয় ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৪ টাকা। এই ব্যয় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একইভাবে আইসিইউতে সরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি যেখানে ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৭৮ টাকা, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এই ব্যয় ছিল ৫ লাখ ৯ হাজার ৫৯ টাকা। এই ব্যয় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় সোয়া গুণ বেশি। বেসরকারি হাসপাতালে ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় রোগীদের পাঁচ গুণ বেশি অর্থ গুনতে হয়েছে। একইভাবে সরকারি হাসপাতালের একজন আইসিইউ রোগীর তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালের একজন আইসিইউ রোগীকে ওষুধে প্রায় দ্বিগুণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১৪ গুণ বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। সরকারি আইসিইউতে রোগীপ্রতি যেখানে ওষুধে লেগেছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৪৪, সেখানে বেসরকারি আইসিইউতে লেগেছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫২৭ টাকা এবং সরকারি আইসিইউতে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যেখানে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৭৮৯, সেখানে বেসরকারি আইসিইউতে এই খাতে রোগীর লেগেছে ৯৩ হাজার ৬৭৪ টাকা।

করোনা সংক্রমণ বাড়ার পর থেকেই রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সেবার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। ল্যাবগুলোতেও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ সংক্রান্ত তদারকি ও বিধি থাকলেও মানছে না কেউ। দেশের সব সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের কাছেও এই চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নির্দেশনার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা না দিলে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় সরকার। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।

মহামারীর কালে কোনোভাবেই যেন করোনার চাপে অন্য রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন সে বিষয়ে বারবার সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সমন্বয়ের কথা আমরা শুনে আসছি অনেক দিন ধরেই। সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাহলে কার? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সম্পর্কিত বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোকে যুক্ত করতে কয়েক দফা মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও ক্লিনিকের মালিকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে গাইডলাইন  তৈরি করবে। প্রশ্ন হলো, গাইডলাইন তৈরি করতে কদিন লাগবে আর সেই গাইডলাইন অনুসারে কবে হাসপাতালগুলো তদারকির আওতায় আসবে? চিকিৎসাসেবার ব্রত হিসেবে মানবতার সেবার যে কথা আমরা জেনে এসেছি, সেই সেবার মানসিকতা না থাকলে কোনো কিছুতেই কাজ হবে না। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে তেমনি বেসরকারি হাসপাতালের মালিকদেরও অতিরিক্ত মুনাফার চিন্তা ছেড়ে এগিয়ে আসতে হবে।