পৌর মেয়র আব্বাসকে জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি|329850|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০
পৌর মেয়র আব্বাসকে জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

পৌর মেয়র আব্বাসকে জেলা কমিটি থেকে অব্যাহতি

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে মেয়র আব্বাস আলীকে অব্যাহতি দিয়ে প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে কেন্দ্রে সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে জেলা আওয়ামী লীগের জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভা শেষে এ কথা জানান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াদুুদ দারা। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল সরকারের সভাপতিত্বে জেলার নেতারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বসানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত মেয়র আব্বাস ফেইসবুক লাইভে এসে কাঁদলেন। ক্ষমা চাইলেন। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার সময় লাইভে যোগ দেন আব্বাস আলী। তিনি দাবি করেন, ম্যুরাল নিয়ে ছড়ানো অডিওটা একটি ঘরোয়া আড্ডার। সেখানে তিনি গল্পের মধ্যে কিছু কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, বাস্তবে তিনি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে বিরোধিতা করেননি। আব্বাস বলেন, ‘এটি আমি ভুল করে থাকতে পারি। মানুষই তো ভুল করে। এজন্য আমি ক্ষমা চাই। কিন্তু আমাকে এজন্য যে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তা অনেক বেশি।’

আব্বাস দাবি করেন, তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল করেননি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ১২ জন কাউন্সিলরকে জোর করে তার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থায় স্বাক্ষর করা হয়েছে এ দাবি করে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।

আব্বাস বলেন, ‘আমি একটা মানুষ, একটা দল করি কিন্তু আমি মুসলমান। আমাদের এখানে একটা মাদ্রাসা আছে, ওই মাদ্রাসার যে বড় হুজুর, মাঝেমধ্যেই জানাজা বা অনুষ্ঠানের কারণে আমার যাওয়া হয়। গেলে শিক্ষকদের সঙ্গে মাঝে মাঝে বসা হয়। যতটুকু মনে আছে, কোনো জানাজায় ওখানে গিয়েছিলাম। জানাজা শেষ করে মাদ্রাসায় বসেছিলাম। মানুষটা বড় হুজুর, জামাল উদ্দিন মাহমুদ। আমি যতটুকু দেখেছি, আল্লাহর রাস্তা ছাড়া দুনিয়াদারির কোথাও তাকে পাইনি। তিনি কষ্ট করে মাদ্রাসাটা গড়ে তুলেছেন। তার শিষ্যরা সারা দেশে বিচরণ করছেন। সারা রাত তিনি নামাজ পড়েন, তাহাজ্জুতের নামাজ পড়েন। আমি মাদ্রাসায় বসেছি, কথা তুলতে তুলতে ভিডিওটা তো দেখালাম, ম্যুরালটার বিষয়ে কোনো চেঞ্জ আনা যায় না? কী সমস্যা? উনি ব্যাখ্যা দিলেন। বোঝালেন। আমি শুনেছি। আমি তো মানুষ, আমি তো একটা মুসলমান। আল্লাহর কথা আসলে কে না দুর্বল হয়। আমিও একটু দুর্বল হলাম। আমি সেদিন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করিনি। বলেছি, আমি ম্যুরালটা করলে ইসলামে ঠিক হবে না। এটা পাপ হবে। আড্ডার মধ্যে অনেক গল্পই তো করে। আমিও হয়তো করেছি। হয়তো ভুল করেছি, কত বড় ভুল করেছি? সারা দেশের সাংবাদিক সমাজের কাছে প্রশ্ন, কত বড় ভুল করেছি? আমার বিরুদ্ধে মিছিল করল, ভাঙচুর করল। মামলা দিল। তবুও মেনে নিয়েছি, আমি মেনে নিয়েছি। তারপর দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। তবুও আমি মেনে নিয়েছি। ভালোবাসার মানুষজন যারা আছেন, তাদের ভয়ভীতি দেখানো অব্যাহত আছে। কাউন্সিলরদের ডেকে থ্রেট করে ১২ জন কাউন্সিলরকে অনাস্থা নেওয়া হয়েছে। সেই ডকুমেন্ট আমার কাছে আছে। আমি তো মানুষ। আমি তো ভুল করতেই পারি। তার জন্য ক্ষমা চাই। তারপরও মনঃপূত না হলে বহিষ্কার করবেন, আমার নামে মামলা দেবেন যতটুকু ভুল করেছি, তার জন্য। কিন্তু একের পর এক অত্যাচার-জুলুম। আমার অসুস্থ মা তিন-চার দিন না খেয়ে আছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি কি এত বড় অন্যায় করেছি? অন্যায় করলে তো আইন আছে। এভাবে এতকিছু করা কি ঠিক? আমি কত বড় অন্যায় করেছি। আমাকে বলা হচ্ছে, আমি দলের অনুপ্রবেশকারী। আমি যদি আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্য কোনো দল জীবনে করে থাকি তাহলে সব শাস্তি মাথা পেত নেব। ২০০২ সালে যুবলীগ দিয়ে আমার শুরু। ৭ মার্চের ভাষণ আমার চোখ খুলে দিয়েছে। তারপর থেকে যুবলীগ করছি। অন্য দল করেছি কেউ প্রমাণ করতে পারলে আমি সুইসাইড করব।’

আব্বাস দাবি করে বলেন, ‘আমাকে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী বানানো হচ্ছে। আমার ব্যাংকে লোন কত সেটা নিয়ে লাইভে আসব। যদি বুঝতে পারি আমার কথায় আপনার বিবেক নাড়া দিয়েছে, তাহলে পর্যায়ক্রমে একটা একটা করে সবগুলো খোলাসা করে দেব। আমার পাশে আপনাদের দরকার। আমি আজ কয়েক দিন ধরে না খেয়ে আছি। আমি অসুস্থ হয়ে গেছি। আমাকে হেল্প করুন। আমাকে বাঁচান প্লিজ।’

আব্বাসের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে রাজশাহী নগর ছাত্রলীগ : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যকারী মেয়র আব্বাসের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে ছাত্রলীগ। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেন।

আব্বাসের শাস্তির দাবিতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর আলুপট্টি মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ‘উন্নয়নের অভিযাত্রায় রাজশাহী’ ব্যানারে এতে নেতৃত্ব দেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি নূর মোহাম্মদ সিয়াম, সাধারণ সম্পাদক ডা. সিরাজুম মুবিন (সবুজ) ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাসিক দত্ত। মিছিলটি সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে মেয়র আব্বাস আলীর অশালীন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয় এবং তাকে আওয়ামী লীগের পদ ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে আজীবন বহিষ্কার করার দাবি জানানো হয়।

এর আগে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ প্রতিহতের ঘোষণা দেওয়া রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীকে মেয়র পদ থেকে সরানোর দাবিতে অনাস্থা প্রস্তাব পাস করেছেন কাউন্সিলররা। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পৌরসভা ভবনের সভাকক্ষে কাউন্সিলরদের জরুরি সভায় অনাস্থা প্রস্তাব আনেন নারী কাউন্সিলর হোসনে আরা। পরে সর্বসম্মতিক্রমে সেটি পাস হয়। এ সময় মেয়র আব্বাসকে অপসারণের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর লেখা অনাস্থা প্রস্তাবের আবেদনে ১২ কাউন্সিলরই স্বাক্ষর করেন।

এদিকে আব্বাস আলীকে মেয়র পদ থেকে দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছেন রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার ১২ জন কাউন্সিলর। একই সঙ্গে দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবি জানান তারা। গতকাল সকালে পৌরসভা ভবনে প্রতিবাদ সভায় এ দাবি জানান তারা। এতে সভাপতিত্ব করেন ৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান। তিনি মেয়রকে অপসারণে অনাস্থা প্রস্তাবের রেজল্যুশন সাংবাদিকদের পড়ে শোনান।

এ সময় তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার পৌরসভার ১২ জন কাউন্সিলরের জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে মেয়রকে অপসারণে অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হয়। রাতেই সেটি জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া হয়েছে। কাটাখালী পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেয়র আব্বাসের আগ্রাসন থেকে মুক্তি চায়।’

মঞ্জুর রহমান আরও বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ের পৌরসভার ফান্ডের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ছিল। এখন চা খাওয়ার টাকাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে পৌর ফান্ডের টাকা গায়েব হয়ে গেছে।’ বিষয়টি দ্রুত তদন্তের দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন অনুদান দেওয়ার জন্য কাটাখালী বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেন মেয়র আব্বাস। কিন্তু সে টাকা কাউকে দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেয়। কারোনাকালে চা ব্যবসায়ীদের অনুদান দেওয়ার নামে কয়েক লাখ টাকা পৌরসভার ফান্ড থেকে হাতিয়ে নেন মেয়র আব্বাস। কিন্তু কোনো চায়ের দোকানদার করোনাকালে অনুদান পেয়েছে তা কোনো কাউন্সিলর বলতে পারবে না।’

প্রতিবাদ সভায় ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল মজিদ বলেন, ‘পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৬ মাসের বেতনভাতা বকেয়া রয়েছে। ফান্ডে টাকা থাকার পরও মেয়র আব্বাস এই বেতনভাতা দেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেয়র আব্বাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর করে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। কেউ স্বাক্ষর না করলে তাকে চাকরিচ্যুতসহ নানাভাবে হুমকি দেন। এছাড়াও তার কাজের কোনো প্রতিবাদ করলে কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতেন। আত্মীয়স্বজনদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে নগর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ নিজে করতেন। আত্মীয়স্বজনদের নামে হাট-ঘাট ও যানবাহনের টোল আদায়ের ইজারা নিজে নিয়েছেন। এসব টোল আদায়ের নামে নিজের লোকজন দিয়ে চাঁদাবাজি করেন। এসব নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে হত্যার হুমকি দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাতেন।’

এদিকে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বসানোয় আপত্তি তোলায় গতকাল পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক আব্বাস আলীকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি রাজশাহীর কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন। ২০১৫ সালে দলের মনোনয়ন পেয়ে তিনি প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন।

ঘরোয়া একটি আলোচনায় মেয়র আব্বাস বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনের বিরোধিতা করে কথা বলেন। গত সোমবার এ আলোচনার অডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে।