শঙ্কার মধ্যে ভোট আজ|330039|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০
শঙ্কার মধ্যে ভোট আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক

শঙ্কার মধ্যে ভোট আজ

স্থানীয় সরকারের চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় ধাপকে সামনে রেখে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। ইউপি নির্বাচন ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সহিংসতার ‘শঙ্কা’ যেন থামছে না। ভোট দিতে না আসার জন্য ভোটারদের হুমকির পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের এমন পরিস্থিতিতে দেশের ১২৩ উপজেলার এক হাজার ইউপিতে আজ রবিবার ভোটগ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া অষ্টম ধাপের নয়টি পৌরসভাতেও ভোটগ্রহণ হবে আজ।

এসব নির্বাচনে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। এদিকে তৃতীয় ধাপের এ ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ৫৬৯ জন। তাদের মধ্যে চেয়ারম্যান ১০০ জন, সংরক্ষিত সদস্য ১৩২ জন ও সাধারণ সদস্যা ৩৩৭ জন। গত শুক্রবার মধ্যরাতে এসব নির্বাচনী এলাকায় প্রচারের সময় শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি ‘অনাস্থা’দেখিয়ে বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করলেও ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত ইউপি ভোটের আগে-পরে ও ভোটের দিন সহিংসতায় গতকাল রাত পর্যন্ত অন্তত ৪৪ জন নিহত হয়েছে।

এদিকে তৃতীয় ধাপের এ ইউপি ভোটকে কেন্দ্র করে বেশকিছু নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে এবার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইসি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। পাশাপাশি সব পক্ষের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। তবে গত শুক্রবার নির্বাচনী সহিংসতায় বিভিন্ন জায়গায় তিনজনের মৃত্যু হয়। এমন পরিস্থিতিতেও গতকাল শনিবার নির্বাচন কমিশনের সভা শেষে ইসি সচিব হুমায়ূন কবীর খোন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মুহূর্তে কোনো আশঙ্কার জায়গা মনে করছি না। নির্বাচন কমিশন অবশ্যই প্রত্যাশা করে আগামীকালের (আজ) ভোট ভালো হবে।’

তবে, ভিন্নমত পোষণ করেছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তৃতীয় ধাপের এ নির্বাচনে সহিংসতার শঙ্কা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসি কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সহিংসতা চলবেই।’

তৃতীয় ধাপের এ ভোটে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল ১০০৭টি ইউপির। বিভিন্ন কারণে স্থগিত হয়েছে ৭টি ইউপির ভোট। এ নির্বাচনে ভোটার ২ কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৭৮ জন। ভোটকেন্দ্র ১০ হাজার ১৫৯টি ও ভোটকক্ষ ৬১ হাজার ৮৩০টি। ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ৫৬৯ জন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতদের বাদ দিলে ভোটের লড়াইয়ে আছেন ৫০ হাজার ১৪৬ প্রার্থী। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৪০৯ জন চেয়ারম্যান পদে, ১১ হাজার ১০৫ জন সংরক্ষিত সদস্য পদে এবং ৩৪ হাজার ৬৩২ জন সাধারণ সদস্য পদে লড়বেন।

এদিকে নির্বাচনে অস্ত্রের ব্যবহার প্রসঙ্গে ইসি সচিব হুমায়ূন কবীর খোন্দকার বলেন, ‘বৈধ অস্ত্রের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকে। ম্যাজিস্ট্রেট একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, সেটি প্রদর্শন করা যাবে না। অবৈধ অস্ত্রগুলো যেকোনো সময়ে যে কারও হাতে চলে আসছে। তারা ব্যবহার করে। অবৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই।’

এ ছাড়া ইউপি নির্বাচন ‘পার্টিসিপেটরি’ (অংশগ্রহণমূলক) এবং ‘ক্রেডিবল’ (গ্রহণযোগ্য) হয়েছে বলে উল্লেখ করে সচিব বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন অবশ্যই প্রত্যাশা করে আগামীকালের (আজ) ভোট ভালো হবে।’ নির্বাচনে কোনো আশঙ্কার জায়গা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে কোনো আশঙ্কার জায়গা মনে করছি না।

অন্যদিকে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সহিংসতা তো রোগের লক্ষণ। এখন রোগ চিহ্নিত যতক্ষণ না হবে, ততক্ষণ তো সহিংসতা চলতেই থাকবে। রোগ হলো সুবিধাবাদের রাজনীতি। অর্থাৎ রাজনীতি মানেই এখন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া। দলের বিভিন্ন রকম পদ পেলেই তারা বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা পায়।’ নির্বাচন কমিশন যদি কঠোর হতো, তাহলে এ সহিংসতা সাময়িকভাবে রোধ করা যেত। রোগ হলো একাধিক। নির্বাচন কমিশন যতদিন পর্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হবে, ততদিন পর্যন্ত এ সহিংসতা চলবেই।’

এদিকে ইউপি নির্বাচনে যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার বেশিরভাগের পেছনে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদে তিনি একথা বলেন।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই প্রথম ধাপে ২১ জুন ২০৪ ইউপি এবং ২০ সেপ্টেম্বর ১৬০ ইউপি এবং  ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৬ ইউপিতে ভোট হয়। তৃতীয় ধাপে ১০০০ ইউপির ভোট আজ। এরপর ২৩ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপে ৮৪০ ইউপিতে এবং পঞ্চম ধাপে দেশের ৭০৭ ইউপিতে ৫ জানুয়ারি ভোট হবে। দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। আসছে ফেব্রুয়ারিতে নিজেদের মেয়াদ শেষের আগেই নির্বাচন উপযোগী সব ইউপির ভোট ধাপে ধাপে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।

গতবার ৩০ মিনিটে চেয়ারম্যান হয়েছি, এবার লাগবে ৫ মিনিট : তৃতীয় দফায় শেরপুরের নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে আজ রবিবার ভোটগ্রহণ হবে। এ নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের লাগামহীন বক্তব্যে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গতকাল নকলা উপজেলার উরফা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান রেজাউল হক হীরার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালে এ আতঙ্ক দেখা দেয়।

উরফা এলাকার মারমাইসা দাখিল মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনী জনসভায় রেজাউল হক হীরা বলেন, ‘মার্কা আমার নৌকা। গতবার আধাঘণ্টার ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছি। এবার ভোট করব মাত্র ৫ মিনিটে।’ একই জনসভায় চেয়ারম্যানের ছেলে সিয়াম ইমতিয়াজ হুঁশিয়ারি দেন, ‘নৌকায় ভোট না দিলে ৫ বছর এলাকায় থাকা যাবে না। শান্তি চাইলে নৌকায় ভোট দেবেন।’

এ বিষয়ে রেজাউল হক বলেন, ‘বিরোধীরা আমার নামে নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। কিন্তু এসব করে কোনো লাভ হবে না। মানুষ নৌকাকেই বিজয়ী করবে।’

অন্যদিকে নালিতাবাড়ী উপজেলার মেয়র আবু বকর বাক্কার এক নির্বাচনী জনসভায় বলেছেন, ‘বাঘবের ইউনিয়নে নৌকা ছাড়া কোনো প্রার্থীর এজেন্টকে থাকতে দেওয়া হবে না।’ তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এ ধরনের বক্তব্য দিইনি। এডিট করে ফেইসবুকে ছড়িয়ে আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসক মোমিনুর রশীদ জানান, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সব প্রস্তুতি তারা নিয়েছেন। কোনো বক্তব্যই ভোটে প্রভাব ফেলবে না।

লালমনিরহাটে বাড়িঘরে হামলা : লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে গত শুক্রবার রাতে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। এতে নারীসহ চারজন আহত হন। আহতরা হলেন ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল কাশেম (৮৫), তার দুই ছেলে জাকির হোসেন (২৫) ও জামিল হোসেন (৩০) এবং মোমেনা বেগম (২৮)। তাদের মধ্যে আবুল কাশেমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গতকাল আহত আবুল কাশেমের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এতে বলা হয়, নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মোফাজ্জল হোসেন মোফা ও তার সমর্থকরা রাতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহজাহান আলীর সমর্থক আবুল কাশেমের বাড়িতে হামলা চালায়।

সদর থানার ওসি শাহ আলম জানান, অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গলাচিপায় কাউন্সিলর প্রার্থীকে জখম : পটুয়াখালীর গলাচিপা পৌর নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সাহেব আলী মাতুব্বরকে (৪৫) কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে নির্বাচনী প্রচার শেষে বাড়ি ফেরার পথে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

গলাচিপা থানার ওসি এম আর শওকত আনোয়ার ইসলাম জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মামলা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।