গবেষণায় জানা গেল কেন শাহরুখ খানকে মেয়েরা এত পছন্দ করে|330525|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩০ নভেম্বর, ২০২১ ১৬:০১
গবেষণায় জানা গেল কেন শাহরুখ খানকে মেয়েরা এত পছন্দ করে
অনলাইন ডেস্ক

গবেষণায় জানা গেল কেন শাহরুখ খানকে মেয়েরা এত পছন্দ করে

‘শাহরুখ খানকে মেয়েরা কেন এত বেশি পছন্দ করেন?’, ভারতীয় লেখিকা শ্রেয়না ভট্টাচার্য তার বই ‘ডেসপারেটলি সিকিং শাহরুখ খান’-এ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ২০ বছর ধরে অসংখ্য ভারতীয় নারীর সঙ্গে কথা বলে তিনি যা জেনেছেন, তা সত্যিই আপনাকে বলিউড তারকা শাহরুখ খান সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।

‘শাহরুখ খানকে কেন পছন্দ করেন?’, ২০ বছর ধরে অসংখ্য নারীকে এই প্রশ্ন করে লেখিকা যে উত্তরগুলো পেয়েছেন তা হল- নায়ক হিসাবে শাহরুখ ‘আকর্ষণীয়’ যার সঙ্গে নিজেকে মেলানো যায়। সে ‘মজা’ করতে পারে, বুদ্ধিদীপ্ত ‘ব্যঙ্গ’ করতে ওস্তাদ, সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে তার কথা প্রকাশ করতে পারে, এবং খ্যাতি এবং অর্থের জন্য তার যে চেষ্টা তা নিয়ে তার কোনো ‘লজ্জা’ বা কুণ্ঠা নেই।

অনেকে বলেছেন, শাহরুখ খুব ‘ম্যাচো’ বা পুরুষালি নায়ক হয়তো নয়, কিন্তু সংবেদনশীল এবং যে নারীর প্রেমে সে পড়ে তাকে পাওয়ার জন্য যে কোনো কিছু করার জন্য সে প্রস্তুত। মেয়েদের জন্য তার যে ভালোবাসা, তার জন্যই আমরা তাকে ভালোবাসি।

শ্রেয়না ভট্টাচার্য বলেন, তবে অবাক হলেও এটা সত্যি যে অনেক নারীর শাহরুখ প্রেমের সঙ্গে তাদের আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের যোগসূত্র রয়েছে।

‘কখন, কীভাবে এবং কেন কেন তারা শাহরুখকে পছন্দ করা শুরু করলো- তার উত্তর দিতে গিয়ে এসব নারী নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে কখন, কিভাবে এবং কেন তাদের হৃদয় ভেঙ্গেছে সে কথা বলেছেন,’ বলছেন শ্রেয়না ভট্টাচার্য। ‘তাদের স্বপ্ন, উদ্বেগ, তাদের প্রেম এবং সঙ্গী পছন্দ নিয়ে নারীদের যে নিরন্তর লড়াই, যন্ত্রণা তার সাথে যেন কোথাও তাদের শাহরুখ প্রীতির যোগসূত্র রয়েছে’।

 

লড়াই-অতৃপ্তি থেকে সাময়িক মুক্তি

শ্রেয়না ভট্টাচার্য হঠাৎ করে কোনো সমীক্ষা চালাননি । প্রায় ২০ বছর ধরে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা নিয়ে উত্তর ভারতের বহু নারীর সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতা থেকে লেখক এসব উত্তর পেয়েছেন।

এসব নারীর মধ্যে বিবাহিত, অবিবাহিত, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান- সব ধরণের মানুষ আছেন। তাদের অনেকে পরিবারে সুখী অনেকে অসুখী, অতৃপ্ত। তাদের মধ্যে অনেক শ্রমজীবী নারীও রয়েছেন। একটি বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল - তারা সবাই শাহরুখ খানের ফ্যান।

আমাদের জীবনে শাহরুখ খানের সরব প্রবেশ ১৯৯০ এর দশকে। একই সময়ে ভারতে কোকা-কোলা, কেবল টিভির আগমন। ভারতে নতুন এক ‘উদার অর্থর্নীতির’ সূচনা তখন।

‘আমি সেই সময়ের নারীদের গল্প বলতে চেয়েছি, এবং আমি দেখলাম খান কীভাবে অজান্তে ঐ নারীদের মিত্র হয়ে হাজির হয়েছিলেন,’ বলেন শ্রেয়না ভট্টাচার্য।

২০০৬ সালে পশ্চিম ভারতের একটি বস্তিতে আগরবাতি তৈরির কারখানার নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এই লেখক। মজুরী নিয়ে তারা খুবই ক্ষুব্ধ-হতাশ ছিলেন। কাজের বিরতির সময় ঐ নারী শ্রমিকদের সঙ্গে তিনি কথা শুরু করেন। জিজ্ঞেস করেন কোন বলিউড নায়ক তাদের সবচেয়ে প্রিয়।

‘তারা সোৎসাহে বলতে শুরু করেন কি কি বিষয় তাদের আনন্দ দেয়, এবং তার অন্যতম ছিল শাহরুখ খান,’ বলেন শ্রেয়না ভট্টাচার্য।

 

‘কেন আরো বেশি পুরুষ শাহরুখের মত হয়না’

তার পরের সমস্ত এই ধরণের সমীক্ষায় শ্রেয়না ভট্টাচার্য দেখতে পেয়েছেন শাহরুখ খানের ফ্যান এই নারীদের প্রায় সবাই শ্রমবাজারে তাদের বৈষম্যের শিকার। সেই সঙ্গে, ঘরে-পরিবারে তাদের সবাইকেই কম-বেশি লড়াই করতে হয়। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত যেসব নারী শাহরুখের ফ্যান তাদের মুখেও একই কথা শুনেছেন লেখক।

সাধারণ একটি আক্ষেপ এই নারীরা করেছেন, ‘কেন আরো বেশি পুরুষ শাহরুখের মত হয়না!’

‘এই নারীরাই তাকে তারকা বানিয়েছেন। আর তার পেছনে ছিল তাদের নিজেদের নিত্যদিনের বাস্তবতা, তাদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, হতাশা,’ বলেন শ্রেয়না ভট্টাচার্য। পর্দায় নায়িকার প্রতি খানের শতভাগ নিষ্ঠা, মনোযোগ নারীদের আকর্ষণ করে।

তার অনেক চরিত্রে তিনি যেভাবে সম্পর্কের পরিণতি, অনিশ্চয়তা নিয়ে তার উদ্বেগ দেখিয়েছেন- তাতে আকৃষ্ট হয়েছেন নারীরা। কারণ তাদের নিজেদের জীবন নিয়েও তারা সবসময় অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

পর্দায় আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে শাহরুখ যেভাবে অনেক সময় বেসামাল হয়ে হুহু করে কাঁদেন- যেটা বলিউডে বেশ বিরল- তা পছন্দ করেন নারীরা। কারণ তারা দেখেন শাহরুখ তার আবেগ প্রকাশ করতে, নারীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে লজ্জা পাননা।

‘আমি স্বপ্ন দেখি কাভি খুশি কাভি গাম ছবিতে শাহরুখ যেভাবে কাজলের সাথে কথা বলেছে, তাকে স্পর্শ করেছে আমার সাথে কোনো পুরুষ যদি তেমন করতো! কিন্তু আমার স্বামী এতই রুক্ষ’, বলেন মুসলিম এক নারী পোশাক শ্রমিক।

‘ধনী, অভিজাত পরিবারের অসুখী বিবাহিতা এক নারী বলেন তিনি তার ছেলেদের ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে বড় করতে চান। তার কাছে ভালো মানুষের সংজ্ঞা: তারা যেন কাঁদতে পারে, শাহরুখ যেমন আমাদের মধ্যে যে ভরসা এবং ভালোবাসার বোধ তৈরি করে, তার ছেলেরাও যেন তাদের স্ত্রীদের মনে একই অনুভূতি তৈরি করতে পারে’।

পর্দায় তিনি মেয়েদের বিরক্ত করছেন বা সহিংস আচরণ করছেন- শাহরুখ খানের এসব চরিত্র নিয়ে এসব নারীরা স্বস্তি পাননা। ফ্যান হলেও খানকে যে তারা এ ধরণের চরিত্রে দেখতে চাননা। এমন নয় যে তারা গ্ল্যামার-নাটক উপভোগ করেননা, কিন্তু পর্দায় খানের ছোট ছোট জিনিস তাদের অনেক বেশি আকর্ষণ করে।

 

‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’

‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ ছবিটি শাহরুখ খানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবিগুলার অন্যতম। এটি সম্ভবত বলিউডের সবচেয়ে সফল রোমান্টিক চলচ্চিত্র।

ঐ ছবি সম্পর্কে শাহরুখের এক তরুণী ফ্যানের মা আমাকে যে কথা বলেন তা আমি কখনও ভাবিনি, লক্ষ্যও করিনি, ‘আমি প্রথমবারের মত ঐ ছবিতে দেখলাম নায়ক ছুরি দিয়ে গাজর ছিলছে। পরিবারের নারীদের সঙ্গে নায়কের এত হৈচৈ, এত সময় কাটানোর ব্যাপার আমি আগে কোনো সিনেমায় দেখিনি’। ঐ নারীর মতে- এই ব্যাপারটি ছিল অসামান্য রোমান্টিক।

নারী ফ্যানরা যে শাহরুখের প্রতি কোনো যৌন আকর্ষণ বোধ করেননা তা নয়। সেকথা তারা প্রকাশও করেছেন। কিন্তু সেটি ছাড়াও তাকে পছন্দের কারণ হিসাবে ঐ নারীরা আরও অনেক কিছু বলেছেন।

প্রতিদিনের অবিচার, লড়াই এবং হৃদয় ভাঙার বেদনার মধ্যে খান অনেক নারীর জন্য এক ধরণের স্বস্তি, উপশম। তার মত একজনকে নারীরা যে বিয়ে করতে চাইতেন তার কারণ এই নয় যে তিনি একজন বলিউড তারকা। তার প্রধান কারণ বরঞ্চ তিনি একজন ‘সহানুভূতিশীল বিবেচক’ পুরুষ।

একজন বিবেচক পুরুষ নারীকে কাজ করার সুযোগ দেয়, টাকা জমানোর সুযোগ দেয়। অন্তত স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করলেও তা পায়ে দলে দেয়না। এ কারণে তারা শাহরুখের ছবি দেখতে সিনেমা হলে গিয়ে হামলে পড়েছেন। শ্রেয়না ভট্টাচার্যর বইতে এমন এক সরকারী কর্মকর্তার ভাষ্য রয়েছে যিনি তরুণী বয়সে লুকিয়ে শাহরুখের ছবি দেখেতে গিয়ে মায়ের হাতে মার খেয়েছিলেন। এক গার্মেন্টস শ্রমিকের কথা রয়েছে যাকে লুকিয়ে শাহরুখের ছবি দেখার জন্য ছোট ভাইদের মুখ বন্ধ রাখতে উৎকোচ দিতে হয়েছে।

এক গৃহকর্মীর কথা রয়েছে যিনি রোববারের গির্জায় প্রার্থনা বাদ দিয়ে টিভিতে শাহরুখের ছাবি দেখার জন্য পাদ্রির কাছে মিথ্যা অজুহাত দিয়েছেন।

‘যখন কোনো নারী বলে যে একজন অভিনেতাকে পছন্দ করে, সে আসলে বলতে চায় ঐ অভিনেতার চেহারা, ব্যক্তিত্ব সে পছন্দ করে’, বলেন শ্রেয়না ভট্টাচার্য। তিনি লিখেছেন- এসব নারীরা হয়ত খুব বেপরোয়া বা সাহসী নয়, কিন্তু এ ধরণের পছন্দ প্রকাশ করে তারা তৃপ্তি পায়, তাদের কাছে এটা এক ধরণের বিদ্রোহ। বিছানার নীচে পছন্দের নায়কের পোস্টার রেখে দেয় তারা। পর্দায় তার গাওয়া গান শোনে, সেই গানের সাথে তারা নাচে। তার ছবি দেখে তারা বোধ করে কোন ধরণের জীবন তারা চায় বা চেয়েছিল।

যেমন, যে সরকারী চাকুরের কথা বইতে আছে, তিনি একসময় পণ করেছিলেন তিনি এমন এক জীবন তৈরি করবেন যেখানে শাহরুখ খানের ছবি দেখতে কারো কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবেনা।

একজন নারী বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন কারণ চুরি করে খানের ছবি দেখতে যাওয়ার কারণে তার পরিবার তড়িঘড়ি করে এমন একজনের সাথে বিয়ে ঠিক করেছিল যে ছেলে শাহরুখ খানকে পছন্দ করেনা। ঐ নারী এখন একজন বিমানবালা এবং এমন একজনকে বিয়ে করেছেন যার সঙ্গে তিনি শাহরুখের মিল খুঁজে পান, ‘একই ধরণের আবেগ’ বোধ করেন।

শ্রেয়না ভট্টাচার্য বলেন শাহরুখ তার সময়ের একজন আইকন। কিন্তু বলিউডে তার আগমনের পর গত ৩০ বছরে সময় অনেক বদলেছে। ‘এখনকার তরুণীরা খানকে বিয়ে করতে চাননা। তারা নিজেরা খান হতে চান। তারা তার মত স্বাধীনতা এবং সাফল্য অর্জন করতে চান’।

সূত্রঃ বিবিসি