লিফটের টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে|330639|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
লিফটের টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে
নিহার সরকার অংকুর

লিফটের টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে

জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি লিফট বসানো হয়েছে। চালুর দুই সপ্তাহ না যেতেই এগুলো প্রায় অকেজো। প্রত্যেক দিনই কোনো না কোনো লিফটে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আটকা পড়ছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের লিফটে সকাল ১০টা ৫ মিনিট থেকে ১০টা ৩৮ মিনিট পর্যন্ত আটকা পড়েন নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মমিনুর মুহিত। প্রায় ৩৩ মিনিট পর তাকে উদ্ধার করা হয়।

লিফটগুলো কেনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সুইজারল্যান্ড ও স্পেন থেকে এগুলো কেনার দাবি করা হলেও তার পক্ষে কোনো কাগজপত্র নেই। তৃতীয় দেশ থেকে দুর্বল মানের লিফট কেনায় ঝামেলা হচ্ছে। এমনকি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তর এবং প্রকৌশল দপ্তরের তিন কর্মকর্তা প্রায় ৩ কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘লিফট কেনার ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্যের বিষয় আমার জানা নেই। লিখিত কোনো প্রমাণ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯ সালের শুরুতে লিফট কিনতে দরপত্র আহ্বান করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই বছরের অক্টোবরে লিফট দেখতে সুইজারল্যান্ড সফর করার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় শিক্ষক-কর্মকর্তার। সমালোচনার মুখে সে সফর বাতিল করা হয়। যদিও পরে এমন দুজন লিফট দেখতে গিয়েছিলেন, যাদের এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই বলে স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একই দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লিফট কেনা প্রকল্পের পিডি থাকাকালীন হাফিজুর রহমান প্রকৌশল দপ্তরের দুই কর্মকর্তার যোগসাজশে কমিশন বিনিময়ের মাধ্যমে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেন। তারা ঘোষণা অনুযায়ী সুইজারল্যান্ড কিংবা স্পেন থেকে কোনো লিফট কেনেনি।’ তিনি দাবি করেন, ‘লিফট কেনার চালানে ভারত উল্লেখ রয়েছে। সুইজারল্যান্ড বা স্পেনের কিছুই পাবেন না। তারা কোনো কাগজপত্রই দেখাতে পারবে না।’

প্রকল্পের ব্যয় ও অবস্থা জানতে চাইলে প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে পরিকল্পনা দপ্তর এবং জুবায়ের হোসাইন ভালো বলতে পারবেন।’ পরে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক জুবায়ের হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার সময়ে লিফট কেনা হয়নি। সুতরাং এখানকার অনিয়ম বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান এবং পরিকল্পনা দপ্তরের প্রধান সঠিক তথ্য দিতে পারবেন।’

এ ছাড়া লিফট কিনতে কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিন কর্মকর্তার কেউই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অভিযোগ রয়েছে, লিফট কিনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের এক কর্মকর্তা ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেন। এজন্য প্রায় তিন কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। এখন লিফটের যেসব সমস্যা হচ্ছে তা আড়াল করতে এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে লিফট আটকে যাওয়া স্বাভাবিক সমস্যা। ট্রায়াল পর্যায়ে বলে এমন হচ্ছে। দ্রুতই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

তবে নতুন লিফটে এ ধরনের সমস্যাকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না সহকারী প্রকৌশলী মিজান। তিনি বলেন, ‘আমি লিফটগুলো প্রায় এক মাস দেখছি। অবশ্যই এসব সমস্যার জন্য আমাদের দায় রয়েছে। বিশেষ করে আমরা এবং এগুলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে।’ লিফটগুলো সুইজারল্যান্ড অথবা স্পেন থেকে কেনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি আমি জানি না। আমি নতুন যোগ দিয়েছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ডাস্টের কারণে আটকে যাচ্ছে তারা বললেও আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি।’

লিফটে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা স্বীকার করে প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সমস্যা সমাধানে কাজ করছি। আশা করছি, কেউই আর লিফটে উঠে আটকা পড়বেন না।’

ভুক্তভোগীরা জানান, লিফট চালুর ১০ দিনের মধ্যেই আটকা পড়েন এক শ্রমিক। দুই হল উদ্বোধনের আগেই সেখানকার লিফটে ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর থেকে প্রায় দিনই শিক্ষক-শিক্ষার্থী এমনকি প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তাও লিফটে আটকা পড়ছেন। গতকাল আটকে থাকা শিক্ষার্থী মমিনুর মুহিত বলেন, ‘খুবই ভয়ে ছিলাম। উদ্ধারের পর মনে হয়েছে, নতুন জীবন পেলাম। প্রায় সময় লিফট অকেজো থাকছে।’