তীব্র গ্যাস সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশ|330656|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
তীব্র গ্যাস সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক

তীব্র গ্যাস সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশ

সামিট গ্রুপের বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের ভাসমান জাহাজের (এফএসআরইউ) মুরিং লাইনের কেব্ল ছিঁড়ে গেছে। এটি মেরামতের কাজ আগামী ১৫ জানুয়ারির আগে শেষ হবে না। দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি বন্ধ হওয়ায় আগামী দেড় মাস তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিতে পারে। সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই আভাস মিলেছে।

দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা রয়েছে ৩৭০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২৮০ কোটি থেকে ২৯০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আমদানি করা এই এলএনজি দুটি টার্মিনালে সরবরাহ করা হয়। 

মধ্যে ৫০ কোটি ঘনফুট ক্ষমতার সামিট গ্রুপের টার্মিনালে গত ১৮ নভেম্বরে ত্রুটি দেখা যায়। এ টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ায় দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যে সারা দেশে পড়বে।

এমনিতেই গ্যাস সংকটে নাকাল অবস্থা। এ কারণে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থাকে রাত ১০টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ রাখা হচ্ছে। এছাড়া প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে গ্যাস সংকটের কারণে। এরই মধ্যে সামিটের টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট মারাত্মক আকার নিতে পারে।

সামিটের টার্মিনাল ফের কবে চালু হবে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত মেরামতের চেষ্টা হচ্ছে। বিষয়টি সাগরের বেশ গভীরে। দ্রুতই এটি চালু করা যাবে।’ দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হবে না বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১৮ নভেম্বর বিকেল ৫টা নাগাদ সামিটের ভাসমান জাহাজের ভ্যাসেল প্লাগ বয় ও সাকসান পাইলের মধ্যবর্তী একটি মুরিং লাইন ছিঁড়ে যায়। এতে জাহাজ থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে টার্মিনালে অতিরিক্ত এলএনজি মজুদ থাকায় তা কয়েক দিন পাইপলাইনে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। সেই মজুদ গ্যাসও সম্প্রতি ফুরিয়ে গেছে। ফলে দু-এক দিনের মধ্যেই দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, গত ২৫ নভেম্বর সামিটের এলএনজি টার্মিনালে আল সাদ নামে একটি জাহাজ ভেড়ার কথা ছিল। ওই জাহাজের এলএনজি সেদিন থেকেই সরবরাহ করার কথা ছিল। তবে মুরিং লাইন ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে এ জাহাজটিকে দেশের আরেকটি এলএনজি টার্মিনালে নিতে অনুরোধ জানিয়েছে সামিট।

এদিকে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, মুরিং লাইনের কেব্ল তৈরি করে তা ফের লাগাতে এক বছরের মতো সময় লাগে। সামিট মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেটের পুরনো জাহাজ দিয়ে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে সামিট বাদে বাকিটা এক্সিলারেটের। এক্সিলারেট নিজেও ১৩ বছরের পুরনো জাহাজ দিয়ে বাংলাদেশে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। তখনই এর সমালোচনা হয়েছিল, বলা হয়েছিল পুরনো জাহাজের কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হবে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আরও বলেন, দ্রুত মুরিং লাইনের কেব্ল তৈরি করার জন্য সামিট চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে একমাত্র চীনই রেপ্লিকা তৈরি করে দিতে পারে। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সামিট মুরিং লাইনের কেব্ল মেরামত করতে পারবে বলে সরকারকে জানিয়েছে।

দেশে গ্যাসের সংকট সামাল দিতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করতে দুটি এফএসআরইউ ভাড়া করা হয়। এরকম দুটি ইউনিট অপারেশনে ছিল। একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্যটি দিয়ে ৫০০ থেকে ৫৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। দুটি ইউনিট দিয়ে সর্বোচ্চ ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের নজির রয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের জাহাজের আয়ুষ্কাল ধরা হয় ৩০ বছর। ৩ থেকে ৫ বছর পরপর জাহাজ সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে। সে ক্ষেত্রে ১৩ বছরের পুরনো জাহাজটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল আছে আর ১৭ বছর। জাহাজের ভাড়া, সেবা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে সরকার প্রতি বছর এক্সিলারেট এনার্জিকে দেবে ৭২০ কোটি টাকা। ১৫ বছরে এ বাবদ দিতে হবে ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অথচ এরকম একটি জাহাজ কিনতে খরচ পড়ে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

সামিটের সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি দিয়েছে এক্সিলারেট। এক্সিলারেটের সঙ্গে সামিটের ১৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী সাগরে ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন ও টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এক্সিলারেট। এই টার্মিনাল থেকে ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়।