নসিমন-করিমন অনুমোদন দিতে চায় সরকার!|330849|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
নসিমন-করিমন অনুমোদন দিতে চায় সরকার!
আশরাফুল হক

নসিমন-করিমন অনুমোদন দিতে চায় সরকার!

স্থানীয়ভাবে তৈরি বিতর্কিত যাত্রীবাহন নসিমন-করিমনের বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বিশেষজ্ঞ পরামর্শ উপেক্ষা করে সরকারের একটি কমিটি অপরিকল্পিত এসব যানবাহনের সঙ্গে ভটভটি, আলমসাধু বা ইজিবাইকেরও অনুমোদন দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একটি খসড়া নীতিমালা করেছে। সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নীতিমালার ওপর ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নীতিমালা অনুমোদন পাওয়া উচিত হবে না। কারণ মহাসড়কে অনুমোদন না পেলেও নসিমন-করিমন জেলা-উপজেলায় চলবে। ছোট আকারের এসব যানবাহন বৈধতার তকমা নিয়ে সুযোগ পেলেই মহাসড়কে উঠে যাবে। তখন দুর্ঘটনার হার আরও বেড়ে যাবে। তাদের আশঙ্কা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে যথাযথ তদারকি সম্ভব হবে না।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. ইউছুব আলী মোল্লা দেশ রূপান্তরের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং আরও কয়েকটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানের মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মহাসড়ক নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন মহাসড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। কিন্তু সড়ক অবকাঠামো যেভাবে বিকশিত হয়েছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ সেক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহন এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনুমোদিত মোটরযানের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ থ্রি-হুইলারসহ ছোট আকারের মোটরযান অপরিকল্পিতভাবে সড়ক পরিবহন সেক্টরে সংযুক্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ২০১৫ সাল থেকে ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা ও সব ধরনের অযান্ত্রিক বাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে। কিন্তু তারপরও স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব যানবাহনের সংযোজন থেমে নেই।

শীর্ষ পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সামসুল আলম গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি। রাস্তাঘাটগুলো আমরা সেভাবে তৈরি করতে পারিনি। এখনো যেহেতু রাস্তাঘাট সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত, তাই এই সামর্থ্যরে মধ্যেই ছোট গাড়ি থেকে ধাপে ধাপে বড় গাড়িতে যাওয়া হবে বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু এখন ছোট গাড়ি নামালে যারা গাড়ি নামাবেন তারা লাভবান হবেন না, দেশের জনগণও উপকৃত হবে না। যারা এলোমেলো সুশৃঙ্খল করার জন্য রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা কিছু পয়সা পাবেন। সরকারের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত দেশের স্বার্থে। দেশের স্বার্থে হতে গেলে সীমাবদ্ধতা এবং চাহিদা নিরূপণ করা দরকার। আমাদের যে বিপুল পরিমাণ চাহিদা আর সীমাবদ্ধতা এর মধ্যে টেকসই পরিবহন দিতে হবে। সরকারের নীতির মধ্যেই আছে টেকসই উন্নয়ন। টেকসই উন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধে গেলে লাভ হবে রেগুলেটরি অথরিটি, বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের বা স্থানীয় প্রশাসনের। সাধারণ মানুষের কোনো উন্নয়ন হবে না। আমরা সবাই ২০৪১ সালের মধ্যে আধুনিক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। এ পরিবহন নীতি বাস্তবায়ন হলে তা শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। পরিবহন বিজ্ঞান বলে ছোট গাড়ি দিয়ে কোনো দিন নিরাপদ সেবা দেওয়া যায় না। ছোট গাড়ি সবসময় সমস্যা তৈরি করে। কাজেই বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় এলোমেলো সিদ্ধান্ত না নিয়ে একদম বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সীমিত সামর্থ্যে সর্বোচ্চ সেবা পেতে হলে বড় গাড়িতে যেতে হবে। সরকারের এ নীতিমালা টেকসই উন্নয়নের পরিপন্থী।’

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে মোট যানবাহনের সংখ্যা গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪৯০টি। তার মধ্যে ভাড়ায়চালিত বাস ৪৯ হাজার ১৩টি। যা মোট পরিবহনের এক শতাংশ। অটোরিকশা ও অটোটেম্পো ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৬৯টি। যা মোট পরিবহনের ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এই শ্রেণির পরিবহন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। রেজিস্ট্রেশনবিহীন অননুমোদিত থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু নামে ছোট ছোট মোটরযান চলাচল করছে। এর সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। ছোট আকারের অনিবন্ধিত ও অননুমোদিত যান কারিগরিভাবে সড়ক নিরাপত্তার জন্য উপযোগী নয়। এসব যানবাহনের নিরাপত্তা ইউনিট বিশেষ করে ব্রেক, স্টিয়ারিং, সাসপেনশন মানসম্মত নয়। তাছাড়া ভারসাম্যহীন এ ধরনের যানবাহনের স্থায়িত্বও কম। স্বল্প নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসম্পন্ন ধীরগতির এসব ছোট যানবাহন দ্রুতগতিসম্পন্ন যানবাহনের সঙ্গে একই মহাসড়কে চলাচলের সময় গতির পার্থক্য এবং নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে প্রায়ই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটায়।

বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সিংহভাগই ছোট ছোট মোটরযানের যাত্রী। প্রায় সাত শতাংশ অটোরিকশা ও অটোটেম্পো এবং নসিমন ও করিমনের মতো ছোট যানবাহন ৫০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। দুর্ঘটনার সংখ্যার চেয়ে মৃত্যুর হার অনেক বেশি।

গত ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে, পাখির মতো মানুষ মরছে, মাছির মতো মানুষ মরছে। এই মর্মান্তিক দৃশ্যগুলো মানুষ হিসেবে আমি সইতে পারি না। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি, রাতে-দিনে, বৃষ্টিতে-রোদে-শীতে রাস্তায় ঘুরেছি। কাক্সিক্ষত ফল পাইনি। কিন্তু সড়কের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তাই এবার সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে হবে। রাস্তাকে নিরাপদ করতে হবে। পরিবহনে ও সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কখনো দুই পরিবহনের সংঘর্ষে, কখনো তিন চাকার গাড়ি ইজিবাইক, নসিমন-করিমন দুর্ঘটনায় লোকজন প্রাণ হারায়। এর জন্য আমরা ২২ সড়কে এগুলো নিষিদ্ধ করেছি। কিন্তু এনফোর্সমেন্টের অভাবে অনেক জায়গায় এ নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে না।’

কর্মকর্তারা জানান, সার্বিক প্রেক্ষাপটে ছোট মোটরযানের মহাসড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সাশ্রয়ী পরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত এসব মোটরযানকে কারিগরিভাবে ত্রুটিমুক্ত করে অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণপূর্বক নির্মাণ করা হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।

মহাসড়কে অপ্রচলিত ঝুঁকিপূর্ণ ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং এর কারিগরি মান উন্নয়নের মাধ্যমে স্থানবিশেষে চলাচলের বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক এবং বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ ও পরিবহন সেক্টরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ২০১৯ সালে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিল করে। এরপর এ সংক্রান্ত বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের জন্য বিআরটিএর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। এ নীতিমালা থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ২০২১ হিসেবে অভিহিত হবে।

এ নীতিমালার উদ্দেশ্য কী জানতে চাইলে কর্মকর্তারা বলেন, কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছোট ছোট যানবাহন মহাসড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো। ছোট যানবাহনের সিলিং নির্ধারণ করে নিবন্ধনের আওতায় আনার মাধ্যমে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা। থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ। স্পেসিফিকেশন তৈরির মাধ্যমে থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের টাইপ অনুমোদন করা এ নীতির উদ্দেশ্য।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক ব্যতীত নির্দিষ্ট এলাকা বা রুটে রুট পারমিট গ্রহণ সাপেক্ষে অটোরিকশা বা অটোটেম্পো চলাচল করতে পারবে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় এবং শহরের বাইরে উপজেলায় নির্ধারিত রুটে অটোরিকশা ও অটোটেম্পোর জন্য রুট পারমিট দেওয়া যাবে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) সিলিং নির্ধারণ করবে। এ সিলিং অনুযায়ী অটোরিকশা ও অটোটেম্পো বিক্রি করতে হবে। কন্টাক্ট ক্যারিজ হিসেবে চলাচলের ক্ষেত্রে অটোরিকশার চালক স্বল্প দূরত্বসহ সরকার নির্ধারিত এলাকার মধ্যে যেকোনো দূরত্বে যেতে বাধ্য থাকবে। তবে অটোটেম্পো রুট পারমিটে উল্লিখিত রুটে স্টেজ ক্যারিজ হিসেবে এবং অটোরিকশা রুট পারমিট উল্লিখিত রুটে স্টেজ ক্যারিজ হিসেবে চলাচল করতে পারবে।

শুধু উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় রুটে রুট পারমিট নিয়ে ইজিবাইক চলাচল করতে পারবে। তবে ওই রুটের কোনো অংশ মহাসড়ক বা আঞ্চলিক মহাসড়কের অংশ হতে পারবে না। রুট নির্ধারণের ক্ষেত্রে উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির মতামতের ভিত্তিতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি রুট পারমিট প্রদান করবে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি নির্ধারিত সিলিং অনুযায়ী বিআরটিএ ইজিবাইকের রেজিস্ট্রেশন দেবে।