শাহআলমসহ সন্ত্রাসীদের তালিকা দেওয়ার পরই খুন হলেন কাউন্সিলর সোহেল|331136|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ২১:৫৮
শাহআলমসহ সন্ত্রাসীদের তালিকা দেওয়ার পরই খুন হলেন কাউন্সিলর সোহেল
দেলোয়ার হোসেন জাকির, কুমিল্লা

শাহআলমসহ সন্ত্রাসীদের তালিকা দেওয়ার পরই খুন হলেন কাউন্সিলর সোহেল

সন্ত্রাস, মাদক বিরোধী সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জের ধরেই কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেলকে হত্যা করে শাহআলম। জানা যায়, খুন হওয়ার কয়েকদিন আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে শাহআলমসহ সন্ত্রাসীদের নামের তালিকাও দিয়েছিলেন তিনি।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মধ্যে একটি অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া মাদকপ্রবণ এলাকা ছিল ১৭ নং ওয়ার্ড ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো। মো. সোহেল এই এলাকা থেকেই দুইবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। দ্বিতীয়বার কাউন্সিলর হয়ে অন্য কাউন্সিলরদের ভোটে প্যানেল মেয়রও হন তিনি। এ ছাড়া ২০২০ সাল থেকে তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের ১৭নং ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক ও সকল সামাজিক কাজের পাশাপাশি এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধেও একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন সোহেল। এতে বিরোধ তৈরি হয় ১৬ নং ওয়ার্ডের মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী শাহআলম এবং তার সহযোগীদের সাথে। এ নিয়ে প্রায়ই সোহেলের সাথে ঝামেলা হতো শাহআলমের।

খুন হওয়ায় এক মাস পূর্বে দুটি ঘটনায় প্রকাশ্যে সোহেলের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয় শাহআলমের।   প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে- একটি নারী সংশ্লিষ্ট ঘটনায় শাহআলমের এক আত্মীয়কে এলাকাবাসী আটক করলে এর বিচার করেন সোহেল। ওই সালিস চলাকালে শাহআলম প্রকাশ্যে পিস্তল বের করে গুলি ছুড়ে তার আত্মীয়কে ছাড়িয়ে নেয়। অপর ঘটনাটি ছিল মাদক নিয়ে। সোহেল বেশ কয়েকজন মাদকসেবীকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করায় শাহআলম ক্ষিপ্ত হয়। এ ঘটনার পর শাহআলম তার সঙ্গীদের নিয়ে সোহেলের কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যা সোহেল খুন হয়ে যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়। এছাড়া, শাহআলম ও তার সঙ্গীরা প্রায়ই সোহেলকে হুমকি দিত। হত্যা, মাদক ও অস্ত্র মামলাসহ ৯ টি মামলা ছিল শাহআলম ও হত্যার সাথে জড়িতদের নামে। সোহেল সন্ত্রাসী শাহআলমের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন।

কাউন্সিলর সোহেলের এক সহযোগী জানান, শাহআলমের মামলার সকল কাগজপত্র সংগ্রহ করেছিলেন সোহেল। সেই সাথে শাহআলমের মাদকের সাথে সম্পৃক্ত থাকার তথ্যও ছিল। একটি সূত্র জানায়, এ বিষয়টি জেনে যায় শাহআলম ও তার সঙ্গীরা। ১৭ ও ১৬ নং ওয়ার্ডের একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে শাহআলম। ঘটনার ৫ থেকে ৬ দিন আগে সোহেলকে হত্যার পরিকল্পনা করে শাহআলম।

শাহআলমের নামে মামলা ও মাদকের নথিপত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দিয়েছিলেন সোহেল। এর একটি কপি দিয়েছিলেন কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাতের কাছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের তিন দিন আগে কাউন্সিলর সোহেল কম্পিউটারে টাইপ করে সন্ত্রাসীদের মোবাইল নম্বর ও নাম এবং তাদের কার বিরুদ্ধে কী মামলা রয়েছে তা লিখে একটি তালিকা করে আমাকে দিয়েছিল। বিষয়টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারকেও অবহিত করতে বলেছিল সে। সোহেল শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিল, যে তালিকায় নাম থাকা সন্ত্রাসীরা যে কোনো মুহূর্তে তার ক্ষতি করতে পারে।’

তালিকা পাওয়ার পর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা- জানতে চাইলে আরফানুল হক রিফাত বলেন, ‘আমরা আলাপ-আলোচনা করেছিলাম। তবে এত দ্রুত এমন কিছু ঘটে যাবে তা স্বপ্নেও চিন্তা করিনি।

এলাকাবাসী ও সোহেলের সাথে যারা নিয়মিত থাকেন এ রকম কয়েকজন জানান, সন্ত্রাসী শাহআলম কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না। এক সময় জামায়াত করতেন। সব সময় সীমান্ত এলাকায় থাকতেন। মাদক ব্যবসাই ছিল তার মূল পেশা। নানা রকম অস্ত্র ছিল তার কাছে। ভয়ে এলাকার মানুষ তার সাথে কথা বলত না। যেকোনো ছোটখাটো ঘটনায় প্রকাশ্যে অস্ত্র বের করত। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি গ্রুপ ছিল শাহআলমের।

এলাকাবাসী বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে সোহেল এ বিষয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই, একজন অপরাধীর বিচার আল্লাহ করেছেন। 

সোহেল ও আওয়ামী লীগ কর্মী হরিপদ সাহাকে গুলি করে খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি শাহ আলম বৃহস্পতিবার ভোর রাতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

কাউন্সিলর সোহেল হত্যার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন শাহআলম। কিলিং মিশনে নেতৃত্বও দেয় সে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শাহআলমের নাম আসে।

এর আগে গত ২৯ নভেম্বর দিবাগত গভীর রাতে মামলার ৩ নম্বর আসামি মো. সাব্বির রহমান ও ৫ নম্বর আসামি সাজন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

গত ২২ নভেম্বর বিকেলে কাউন্সিলর সোহেল নিজ কার্যালয়ে বসে রাজনৈতিক কর্মীদেরকে নিয়ে একটি বৈঠক করছিলেন। এ সময় কার্যালয়ে ঢুকে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। গুলিতে হরিপদ সাহা নামে কাউন্সিলরের এক সহযোগীও নিহত হন। এছাড়া এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ আরও ৫ জন কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।