ছাত্র আন্দোলন : ঘন আঁধারে আলোর আশা|331155|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
ছাত্র আন্দোলন : ঘন আঁধারে আলোর আশা
রাজেকুজ্জামান রতন

ছাত্র আন্দোলন : ঘন আঁধারে আলোর আশা

দেশে গণতন্ত্রহীনতা, অর্থনীতিতে লুণ্ঠন, কর্মহীন মানুষের অসহায়ত্ব, দুর্বৃত্তদের আধিপত্য, দ্রব্যমূল্যের আঘাত, গণমানুষের অধিকারহীনতা, নির্বাচনী সহিংসতা, শ্রমিকের মজুরি ও চাকরির অনিশ্চয়তা, নারীর নিরাপত্তাসহ কত বিষয় নিয়ে আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে কিছু কিছু আন্দোলন আশা জাগায়। কারণ আন্দোলন করতে গিয়ে তো মানুষ চেনে তার প্রতিপক্ষকে, আর শিখতে থাকে কীভাবে আন্দোলন করতে হয়। এই আন্দোলনকারীদের অংশগ্রহণ, দাবি উত্থাপন এবং আন্দোলন পরিচালনা দেখে সামগ্রিক হতাশার মধ্যেও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ভাড়া নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন তেমনি এক আশাজাগানিয়া আন্দোলন।

২০১৮ সালে শুরু হয়েছিল নিরাপদ সড়কের আন্দোলন। কয়েক দিনের সেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যায়। শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষতা। কেউ আইন ভেঙে রেহাই পাবে না এই দৃঢ় মানসিকতা থাকলে শৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় তার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিল তারা। এবারের আন্দোলনে তাদের ৯ দফা এখন ১১ দফায় পরিণত হয়েছে। একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, শিক্ষার্থীরা ভেবেছে অনেক বিষয় নিয়ে। তাদের দাবিগুলো ১. সড়কে নির্মম কাঠামোগত হত্যার শিকার নাঈম ও মাইনুদ্দিনের হত্যার বিচার করতে হবে। তাদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গুলিস্তান ও রামপুরা ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় পথচারী পারাপারের জন্য পদচারী-সেতু নির্মাণ করতে হবে। ২. সারা দেশে সব গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ পাস সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। হাফ পাসের জন্য কোনো সময় বা দিন নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে না। বর্ধিত বাসভাড়া প্রত্যাহার করতে হবে। সব রুটে বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। ৩. গণপরিবহনে ছাত্রছাত্রী এবং নারীদের অবাধ যাত্রা ও সৌজন্যমূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ৪. ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্সবিহীন চালককে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গাড়ি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে বিআরটিএর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. সব রাস্তায় ট্রাফিক লাইট, জেব্রা ক্রসিং নিশ্চিত করাসহ জনবহুল রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৬. বাসগুলোর মধ্যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা বন্ধে এক রুটে এক বাস এবং দৈনিক আয় সব পরিবহন মালিকের মধ্যে তাদের অংশ অনুয়ায়ী সমানভাবে বণ্টন করার নিয়ম চালু করতে হবে। ৭. শ্রমিকদের নিয়োগ ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করতে হবে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করতে হবে। চুক্তি ভিত্তিতে বাস দেওয়ার বদলে টিকিট ও কাউন্টারের ভিত্তিতে গোটা পরিবহনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার ও টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে। ৮. গাড়িচালকের কর্মঘণ্টা একনাগাড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি হওয়া যাবে না। প্রতিটি বাসে দুজন চালক ও দুজন সহকারী রাখতে হবে। পর্যাপ্ত বাস টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। পরিবহন শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৯. যাত্রী-পরিবহন শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে সড়ক পরিবহন আইন সংস্কার করতে হবে এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ১০. ট্রাক, ময়লার গাড়িসহ অন্যান্য ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে। ১১. মাদকাসক্তি নিরসনে গোটা সমাজে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। চালক-সহকারীদের জন্য নিয়মিত ডোপ টেস্টের ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের এই দাবিগুলো বিবেচনায় নিলে একটা সামগ্রিক সমাধানের পথে পা ফেলা যাবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আন্দোলন আর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে শিক্ষার্থীরা হাফ পাসের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিল। তারা বিআরটিএ ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন চলাকালে পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষে খন্দকার এনায়েত উল্যাহ শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু দাবি মানার পাশাপাশি তারা এমন কিছু শর্ত দিয়েছেন যা বাস্তবায়ন করতে গেলে জটিলতা আরও বাড়বে। ফলে শিক্ষার্থীরা মালিক পক্ষের ঘোষণা মেনে নেয়নি। তারা বলেছে, শর্তসাপেক্ষ ঘোষণা মানবে না এবং ১১ দফা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তাদের আশঙ্কা, মালিক পক্ষের মৌখিক ঘোষণার স্থায়িত্ব নেই, এর ওপর নির্ভর করা যায় না। তাই শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু মৌখিক ঘোষণা দিলে হবে না; এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করতে হবে। শুধু ঢাকায় নয়, হাফ পাসের দাবিতে ঢাকার বাইরেও শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি পালন করেছে। সড়কে একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হচ্ছে। এর প্রতিকার চায় তারা। আর কোনো মায়ের বুক যাতে খালি না হয়, সেটাই তারা চায়।

একটা বিষয় পরিষ্কার যে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন আর হাফ পাসের মধ্যে সীমিত নেই। অন্যদিকে, হাফ পাসের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালেই ঢাকায় তিনটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি গুলিস্তানে চাপা দেয় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে। উত্তর সিটি করপোরেশনের আরেকটি ময়লার গাড়ি পান্থপথে সংবাদকর্মী আহসান কবীর খানকে চাপা দেয়। আর রামপুরায় দুই পরিবহনের দুটি বাস প্রতিযোগিতা করে চালাতে গিয়ে মাইনুদ্দিন ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীকে চাপা দেয়, সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। জানা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের গাড়ি যারা চালাচ্ছিলেন, তারা কেউ সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সধারী চালক নন। তারা বৈধ প্রতিষ্ঠানের অবৈধ গাড়িচালক!

বলা হয়েছে, সরকারি বাসে হাফ ভাড়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ)। কিন্তু বেসরকারি বাস মালিকদের হাফ ভাড়া ঘোষণার বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হবে না। তাহলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কীভাবে আশ্বস্ত হবে? তারা দাবি তুলেছে প্রজ্ঞাপনে অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রজ্ঞাপনের দাবিতে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। হাফ ভাড়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে মালিক সমিতি। শিক্ষার্থীদের নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অর্ধেক ভাড়ার সুবিধা দেওয়া হবে। সরকারি, সাপ্তাহিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌসুমি ছুটির সময় অর্ধেক ভাড়া কার্যকর হবে না। এর ফলে কিছু নতুন জটিলতা তৈরি হবে। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির বিষয়টা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বার্ষিক ছুটির তালিকা অনুযায়ী, সাপ্তাহিক ছুটি বাদে বছরে স্কুল-কলেজে ৮৫ দিনের ছুটি থাকে। বছরে ৫২টি শুক্রবার রয়েছে। সেই হিসেবে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৩৭ দিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে। বছরে তিনটি পরীক্ষার জন্য ৩৬ দিন সময় নির্ধারণ করা রয়েছে। সে সময় শ্রেণিভেদে আরও কিছুদিন ছুটি পায় শিক্ষার্থীরা। আবার রাজধানীসহ দেশের বড় বড় বেসরকারি স্কুল-কলেজে সাপ্তাহিক ছুটি থাকে দুদিন। সে ক্ষেত্রে ৮৫ দিনের সরকারি ছুটিসহ তাদের বছরে ছুটি থাকে ১৮৯ দিন। এসব স্কুল-কলেজ ৩৬৫ দিনের মধ্যে খোলা থাকে ১৭৬ দিন। স্বায়ত্তশাসিত বলে এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা করে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল। সে ক্ষেত্রে একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে কিছু ভিন্নতা হয়। তবে সাধারণত গড়ে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটিসহ কমপক্ষে ১৩৭ দিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকে।

ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কেন অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হবে না জানতে চাইলে মালিক সমিতির সভাপতি বলেন কারণ ঢাকার ছাত্রছাত্রীরা তাদের দাবির জন্য আন্দোলন করেছিল। তার অর্থ কী দাঁড়ায়? সারা দেশে আন্দোলন হলে তখন সারা দেশে তা কার্যকর হবে? এর মধ্য দিয়ে সারা দেশে বিক্ষোভ তৈরির পথ খুলে রাখা হলো নাকি?

বিআরটিএর চেয়ারম্যান বলেছেন, বেসরকারি খাতের হাফ ভাড়া নিয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করার সুযোগ নেই। তা ছাড়া পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে মিডিয়ার সামনে অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটা সবাই জেনেও গেছে। সম্ভবত তিনি আশা করছেন এই ঘোষণা পরিবর্তিত হবে না। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। কত ঘোষণা এবং আশ্বাস যে বেমালুম ভুলে যাওয়া যায় তার দৃষ্টান্ত তো কম নেই। আর বিআরটিএর এই ব্যাখ্যা কতটা যৌক্তিক এ ব্যাপারে আইনজীবীদের ব্যাখ্যা হলো, ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণীত হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, ভোক্তারা যেন অতিরিক্ত দামের শিকার না হন, তা দেখার দায়িত্ব সরকারের। সরকারের সংস্থা হিসেবে জনগণের স্বার্থরক্ষায় পরিবহন মালিক সমিতিকে তাদের ঘোষণা লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়কে দিতে বাধ্য করতে পারে বিআরটিএ। এই লিখিত ঘোষণাকে বিবেচনায় নিয়ে বিআরটিএ প্রজ্ঞাপন জারির ব্যবস্থা নিতে পারে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও তাদের আশঙ্কা জানিয়ে বলেছে, দুই মাস পর যে এই ভাড়া কার্যকর থাকবে তার নিশ্চয়তা কী! তাই প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। এই যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে এলো তাদের ধমক দিয়ে, মেরে, মামলা দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু এর ফলাফল বর্তমানের জন্য কিংবা ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে কখনোই ভালো হবে না। ছাত্ররা ঘরে থাকো, তোমাদের কাজ পড়াশোনা করা এই উপদেশ দেওয়া ভালো। কিন্তু ছাত্ররা যখন বাইরে অনিয়ম আর অরাজকতা দেখে, দেখে তার শিক্ষার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে, খেয়াল করে বাবা-মার চিন্তাক্লিষ্ট মুখ আর নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ, যখন দেখে মুনাফা শিকারির অসহায় শিকারে পরিণত হচ্ছে মানুষ তখন প্রতিবাদী হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এই প্রতিবাদী তরুণরাই তো অতীতে আশার আলো জ্বালিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তারাই দেশবাসীর ভরসা। তাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে, মামলা দিয়ে দমনের পথে না গিয়ে তাদের সেøাগানের ভাষা শোনা দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]