চামড়ার দূষণে বিপন্ন নদী ও মানুষ|331340|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
চামড়ার দূষণে বিপন্ন নদী ও মানুষ

চামড়ার দূষণে বিপন্ন নদী ও মানুষ

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পের ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেওয়া আর একটা পরিবেশবান্ধব ও মানসম্মত চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার কাজ স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়ে গেল। গত দুই দশক ধরে টানাহেঁচড়া করেও এখনো এই সংকটের কোনো সুরাহা হলো না। ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-বিসিক। ট্যানারি মালিকদের অনীহা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের এপ্রিলে আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগের কারখানাগুলোকে হেমায়েতপুরে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় কম সক্ষমতার। তার ওপর গত ছয় বছরে সেটাও পুরোপুরি চালু করা যায়নি। এর ফল হয়েছে ভয়াবহ। আগে হাজারীবাগের ট্যানারির দূষণে বুড়িগঙ্গা মারা যাচ্ছিল, এখন হেমায়েতপুরের ট্যানারির দূষণে ধলেশ^রী ও বংশী মৃতপ্রায়। শুধু নদীই নয়, চামড়া শিল্প নগরীর লাগাতার দূষণের কারণে শিল্পাঞ্চলটির আশপাশের বসতির মানুষ এরই মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগসহ নানারকম রোগে ভুগছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, চামড়া শিল্প নিয়ে এরকম  দায়িত্বহীনতা আর কতদিন চলতে থাকবে?

শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘দূষণে ধুঁকছে ৩ লাখ মানুষ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরীর অত্যন্ত ক্ষতিকর দূষণের কারণে ওই অঞ্চলের মানুষ এবং নদী-খাল-জলাশয়সহ পুরো প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়। শিল্প নগরীর ব্যবস্থাপনায় কোনো উন্নতি না হওয়ায় এখনো ট্যানারির বিষাক্ত সব বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে পাশের ধলেশ্বরী ও বংশী নদী। তারপরও কর্তৃপক্ষ খরচ বাঁচাতে অনেক সময় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) বন্ধ রেখে তরল বর্জ্য সরাসরি ফেলেছে নদীতে। মাঝেমধ্যে সিইটিপি ব্যবহার করা হলেও তা থেকে যে পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে, তাতেও থাকছে মাত্রার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক। যা নদীটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি নদী তীরবর্তী জনপদগুলোর কৃষিনির্ভর কমপক্ষে তিন লাখ মানুষের জীবন-জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। শুধু নদী দূষণই নয়, মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ট্যানারি শিল্পের বিষাক্ত গ্যাস ও দুর্গন্ধ বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে যাচ্ছে পাশের মানিকগঞ্জের সিংগাইরের ধল্লা ও জামির্ত্তা ইউনিয়নের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। এতে করে শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সেখানকার মানুষ।

লক্ষ করা দরকার, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারায় সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি সম্প্রতি বিসিক-এর চামড়া শিল্পনগরীটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করলেও দৃশ্যপট একটু পাল্টায়নি। অন্যদিকে, চামড়া শিল্পনগরীর দূষণ থেকে বংশী নদী রক্ষায় ২০১৯ সালের শেষের দিকে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিল। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বংশী নদীর দখল বন্ধ করতে এবং দখলদারদের চিহ্নিত করে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনোপক্ষই যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। ফলে নদীটির উভয়পাড়ের শত শত বিঘা জমি ধীরে ধীরে দখল হয়ে গেছে। জাতীয় নদী কমিশন বলছে, ২০১৭ সালে কমিশনের পক্ষ থেকে ১৩৩ জন দখলদারের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকায় রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ছোট কারখানা ব্যবসায়ী, পোশাক তৈরি কারখানার মালিক ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু তখন তালিকাটি আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্ট অন্য সব কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের একার পক্ষে তেমন কিছুই করা সম্ভব হয়নি। এদিকে, ওই আদেশ পালন না করায় সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজিসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।

প্রশ্ন হচ্ছে, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের উদ্যোগ ও নির্দেশ এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও হেমায়েতপুরে বিসিক-এর চামড়া শিল্পনগরীর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ দূষণ কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না? কেন ধলেশ^রী ও বংশী নদী রক্ষায় দূষণ বন্ধ ও দখলদারদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না? অথচ সরেজমিনে ঘুরে স্পষ্ট দিবালোকেই দেখা যাচ্ছে, সাভার ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী হরিণধরা এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা ট্যানারির বর্জ্যে দূষিত নদীটির পানির রং কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া সাভারের কর্ণপাড়া খাল দিয়ে বিভিন্ন শিল্প-কারখানার ও সাভার পৌরসভার ডাম্পিংয়ের বর্জ্য এবং তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের বাসাবাড়ির গৃহস্থালি বর্জ্য এসে পড়ছে নদীটিতে। আর এই বর্জ্য ধলেশ্বরী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আড়াই কিলোমিটার দূরের বংশী নদীতেও। এতে করে প্রায় সময়ই নদী দুটির মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মরে ভেসে ওঠে। একই সঙ্গে চামড়া পরিশোধনের রাসায়নিক বর্জ্য বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মানবদেহে শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার ও চর্মরোগের সৃষ্টি করছে। দেশে চামড়া শিল্পের এই সব ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্যবস্থাপনার ভুল, দূরদর্শিতার অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতা ও দুর্নীতির কারণেই এই শিল্প খাতের ধারাবাহিক পতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। আর চামড়াশিল্পের দূষণে নদী-জলাশয়-প্রতিবেশসহ বিপন্ন হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকাও। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকেই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।