পাটের স্যানিটারি প্যাড স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ কমাবে|331342|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
পাটের স্যানিটারি প্যাড স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ কমাবে
ফারহানা সুলতানা

পাটের স্যানিটারি প্যাড স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ কমাবে

ফারহানা সুলতানা আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সহকারী বিজ্ঞানী। তার জন্ম পঞ্চগড়ে। পড়াশোনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ^বিদ্যালয়ে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনেও পড়াশোনা করেছেন এডোলসেন্ট হেলথ নিয়ে। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। পাটের সেলুলোজভিত্তিক স্যানিটারি প্যাড তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবনের প্রস্তাবের জন্য তিনি চতুর্থ ইনোভেশন পিচ প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড পুরস্কার জিতেছেন আমেরিকান সোসাইটি ফর ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (এএসটিএমএইচ) থেকে। পাট থেকে স্যানিটারি প্যাড তৈরির বিষয়ে তার গবেষণা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : শুরুতেই আপনাকে অভিনন্দন জানাই। মাসিক ব্যবস্থাপনাকে নারী ও পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে পাট থেকে স্যানিটারি প্যাড ও প্যাড তৈরির মেশিন নিয়ে আপনারা কাজ করছেন। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো পেয়েছেন সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার। আপনাদের গবেষণা কাজের শুরুর কথা জানতে চাই।

ফারহানা সুলতানা : ধন্যবাদ। বাংলাদেশের বেশিরভাগ নারী কাপড় ব্যবহার করে পিরিয়ডের দিনগুলোতে। আমাদের সামাজিক-পারিবারিক বাস্তবতায় নারীদের মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এখন অতীতের তুলনায় নারীদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে বদলেছে সত্য, কিন্তু পিরিয়ডের দিনগুলোতে নিজেকে গুটিয়ে রাখার চেষ্টা থেমে যায়নি। এটা বেশ কয়েকটি কারণে হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছেওইদিনগুলোতে তারা কী ধরনের প্যাড ব্যবহার করে, প্যাডগুলো তার হাতের নাগালে কতটা সহজে পাওয়া যায়, এসব বিষয় নারীর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

শহরের নারীরা বাজারে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া প্যাড ব্যবহার করে, কিন্তু গ্রামে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীরা প্যাড ব্যবহারের সুযোগ পায় না। তারা তখন কাপড় ব্যবহার করে। এই কাপড় আবার তারা পরিবারের লোকজনের চোখের আড়ালে রাখতে চায়। এটা করতে গিয়ে গোয়ালঘর থেকে শুরু করে বাড়ির অন্ধকার জায়গায় রেখে দেয়। এতে করে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। নারীরা জরায়ুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। আবার শহরের বা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা এগিয়ে থাকা নারীরা বাজারে কিনতে পাওয়া যায়এমন স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব প্যাড দ্রুত পচনশীল নয়। তাই এটি পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এসব চিন্তা থেকেই মাসিক ব্যবস্থাপনাকে নারী ও পরিবেশবান্ধব করার ক্ষেত্রে পাট দিয়ে স্যানিটারি প্যাড ও প্যাড তৈরির মেশিন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ শুরু।

এই কাজে ড. মোবারক আহমেদ খান (বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা) স্যারের সঙ্গে সমন্বয় করে পাটের সেলুলোজভিত্তিক ডিসপোজেবল প্যাড তৈরি করে এর পরীক্ষা চালাচ্ছি আমরা। মিরপুরের একটি বস্তির নারীদের নিয়ে আমরা এই কাজটি শুরু করেছি।

দেশ রূপান্তর : পুরস্কার হিসেবে আপনার প্রাপ্তি জানতে চাই ...

ফারহানা সুলতানা : পুরস্কার হিসেবে পাঁচ হাজার ডলার এবং ২০২২ সালে অনুষ্ঠিতব্য পঞ্চম বার্ষিক ইনোভেশন পিচ প্রতিযোগিতার বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারব। বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আনন্দের হবে আশা করি।

দেশ রূপান্তর : যারা এখন আপনাদের তৈরি করা প্যাড ব্যবহার করছেন তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন? কেমন ফল পাওয়া যাচ্ছে?

ফারহানা সুলতানা : পাট দিয়ে তৈরি স্যানিটারি প্যাড নারীরা ব্যবহার করে আরাম পাচ্ছেন কি না, স্বাস্থ্যসম্মত কি না, এ প্যাড ব্যবহারের পর মাটিতে ফেললে তা মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কি নাএ ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা চলছে। আমাদের এ প্যাড এখনো হাতে তৈরি হচ্ছেযা মূলত মোবারক স্যার করছেন। কিন্তু অনেক সংখ্যক লোকজনকে এটি ব্যবহারের জন্য বাজারে ছাড়তে হলে তা মেশিনে বানাতে হবে। যারা এখন ব্যবহার করছেন তাদের কাছ থেকে আমরা আশানুরূপ ফল পাচ্ছি। আমরা আশাবাদী।

দেশ রূপান্তর : পুরস্কারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন বিষয়টিকে বিবেচনায় আনা হয়েছে বলে মনে করেন? 

ফারহানা সুলতানা : আমেরিকান সোসাইটি ফর ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (এএসটিএমএইচ) প্রতিবছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এবারের প্রতিযোগিতার প্রতিপাদ্য ছিল ‘মহামারী ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসম্মত বিশ্ব সম্প্রদায়’। আমরা পাট দিয়ে স্যানিটারি প্যাড তৈরির জন্য মেশিন উদ্ভাবনের প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছিলাম প্রতিযোগিতায়। এ নিয়ে ভিডিও উপস্থাপন করে জমা দিয়েছিলাম। এতে বিভিন্ন দেশের বিচারকদের পাশাপাশি অডিয়েন্স পোলের মাধ্যমে ভোটের সুযোগ ছিল। সব বিবেচনায় আমাদের প্রস্তাব প্রথম পুরস্কার লাভ করেছে।

দেশ রূপান্তর : গবেষণার ফল কখন প্রকাশ করা হবে?

ফারহানা সুলতানা: পাটের স্যানিটারি প্যাড নারীরা কতটা পছন্দ করেছেন এবং এটা কতটা স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব তদসম্পর্কিত গবেষণার অন্যান্য ফল জানুয়ারি মাসে সবার সামনে উপস্থাপন করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী। তবে এখন পর্যন্ত যে ফল পাওয়া গেছে তা ইতিবাচক। যদি অন্য কোম্পানিগুলো এ ধরনের মেশিন তৈরিতে আগ্রহ দেখায় তবে এটি দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাজে আসবেএটা গর্বের ও আনন্দের।

দেশ রূপান্তর : বাজারে প্রচলিত প্যাড থেকে আপনাদের প্যাড আলাদা কীভাবে? ঠিক কোন কোন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা?

ফারহানা সুলতানা : বাজারে বাণিজ্যিকভাবে যেসব স্যানিটারি প্যাড বিক্রি হয়, তাতে ৩ দশমিক ৪ গ্রাম প্লাস্টিক থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, জীবনব্যাপী একজন নারী প্যাড ব্যবহার করলে প্লাস্টিকের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৩ কিলোগ্রাম, যা মাটির সঙ্গে মিশে যেতে সময় লাগবে ৫০০ থেকে ৮০০ বছর। যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আবার এটি অর্থনৈতিক দিক থেকেও বেশি খরচের।

আমাদের প্রস্তাবিত পাটের প্যাড পরিবেশবান্ধব, এতে ব্যবহৃত কাঁচামাল দেশেই পাওয়া যায়, তাই সবার হাতের নাগালের মধ্যেই এটি রাখা সম্ভব। রক্ষণাবেক্ষণেও তেমন ঝামেলা নেই। একদিকে আমাদের দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও যথেষ্ট উন্নত নয়, আরেকদিকে এখন পর্যন্ত বাজারে যেসব স্যানিটারি প্যাড বিক্রি হচ্ছে, তার বেশিরভাগই পরিবেশবান্ধব নয়। ফলে, বাজারে প্রচলিত প্যাড ব্যবহৃত হওয়ার পর এ নিয়ে এক ধরনের পরিবেশ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে অনেক অর্জনের খবর আমরা জানতে পারি। তবে সে তুলনায় তার সুফল খুব কম পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভোক্তা পর্যায়ে সুবিধা পৌঁছায় না। এটা কেন হয় বলে আপনি মনে করেন?

ফারহানা সুলতানা : এর জন্য স্বদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট সকলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন এবং সঠিক নীতিমালা ও তার বাস্তবায়নও জরুরি।

দেশ রূপান্তর : আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই ...

ফারহানা সুলতানা : আমি দেশের নারীস্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই।

দেশ রূপান্তর : ধন্যবাদ, আপনাকে।

ফারহানা সুলতানা : আপনাকেও ধন্যবাদ।