রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ|332138|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ

রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ

দেশে রেলপথের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং বা রেলক্রসিংগুলো সড়কপথের যাত্রী ও সাধারণ পথচারীদের জন্য ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ২ হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার রেলপথে রেলক্রসিং আছে ২ হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৮টি ক্রসিংই অনুমোদনহীন। অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন এসব রেলক্রসিংয়ের মধ্যে আবার ২ হাজার ১৭০টিতে কোনো গেট নেই, নেই কোনো গেটম্যান। অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ ক্রসিংই অরক্ষিত! বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, দেশে গত প্রায় তিন বছরে রেল দুর্ঘটনায় সারা দেশে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং যত মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছে তার ৮৯ শতাংশই এসব অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে। রেলওয়ের হিসাব বলছে, ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৮৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১১১ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে রেলক্রসিংয়ে ঘটা ৯৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৯৯ জন। তাদের প্রায় সবাই ক্রসিং পার হতে যাওয়া বাস, মাইক্রোবাস ও ছোট যানবাহনের আরোহী। অবশ্য রেলক্রসিং পারাপারের সময় যেসব পথচারী প্রাণ হারায়, সেই হিসাব রেল কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে না! বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘৮৫ শতাংশ রেলক্রসিংই অরক্ষিত, বাড়ছে মৃত্যু’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

রেলওয়ের অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলোতে এমন হতাহতের ঘটনা প্রতি বছরই বাড়ছে। সর্বশেষ চার দিনেই চারটি রেলক্রসিংয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ছয়জন। এদের মধ্যে গত শনিবার চট্টগ্রামে তিনজন, রবিবার নরসিংদীর রায়পুরায় একজন এবং মঙ্গলবার ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় দুজন নিহত হয়েছেন। আর সোমবার নাটোরের এক রেলক্রংসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় একটি ট্রাক দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও কোনো প্রাণহানি হয়নি। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক এসব দুর্ঘটনার সবগুলোই ঘটেছে ‘গেটম্যানের অবহেলায়’ অথবা গেটম্যান নেই এমন অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন রেলক্রসিংয়ে। অবশ্য রেলওয়ের উদাসীনতার পাশাপাশি এসব দুর্ঘটনার শিকার বাহনের চালকদেরও দায় আছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে যে, বাংলাদেশ রেলওয়ে তাহলে রেলক্রসিং দুর্ঘটনা রোধে কী করছে? দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার একক বৃহত্তম অবকাঠামোর অধিকারী এবং ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলাদেশ রেলওয়ে যে এ বিষয়ে নির্বিকার সেটা বোঝা যেতে পারে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল অবধি দেশে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ৮ হাজার তদন্ত কমিটিও হয়েছে। বেশিরভাগ কমিটিই সুপারিশসহ প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য কারণে ৯০ শতাংশ প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটলেও রেলক্রসিংগুলো নিরাপদ করার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকারে নেই। রেলওয়ের সামগ্রিক উন্নয়নে গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলোতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকাও ওপর বরাদ্দ থাকলেও রেলক্রসিং উন্নয়নে প্রকল্প আছে মাত্র ১০০ কোটি টাকার। প্রকল্পটির মেয়াদও শেষ। তাহলে প্রকল্প শেষে রেলক্রসিং সুরক্ষিত হলো না কেন? আর অনুমোদনহীন রেলক্রসিং বন্ধ করতেই বা রেলওয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের পাশাপাশি এসব দুর্ঘটনার নেপথ্যে অননুমোদিত সংযোগ সড়ক এবং সড়কপথের যানবাহনের চালক এবং সাধারণ পথচারীদের সচেতনতারও অভাব রয়েছে।

উল্লেখ্য, রেলপথের পুনরুজ্জীবন এবং বাংলাদেশ রেলওয়েকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়ে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে রেলপথ মন্ত্রণালয় নামে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। কিন্তু আগে-পরে মিলিয়ে সবশেষ গত ১১ বছরে রেলপথের উন্নয়নে সরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও লোকসান কমেনি বাংলাদেশ রেলওয়ের। গত অর্থবছরে শুধু রেলের পরিচালনেই লোকসান বা অপারেটিং লস হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। লক্ষ করা দরকার, বাংলাদেশ রেলওয়েতে এখন ৪১টি প্রকল্প চলমান। যেখানে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১ হাজার কোটি টাকার সংস্থান হবে বিদেশি ঋণ থেকে। কিন্তু এই প্রকল্পগুলো শেষ হচ্ছে না। চলছে মোটামুটি একই চক্রে। দেখা যাচ্ছে প্রকল্প গ্রহণ এবং মাঝপথে গিয়ে প্রকল্প সংশোধন আর নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না করে বাস্তবায়নের সময় বাড়িয়ে ব্যয় বৃদ্ধির এক দুষ্টচক্রে ঢিমেতালে চলছে রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। অন্যদিকে, এসব কারণে রেলওয়ের মহাপরিকল্পনাও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। রেলের এসব প্রকল্পের চক্রে যদি কেউ লাভবান হয়, তারা হলো দেশি-বিদেশি ঠিকাদার, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট রেলের কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী তদবিরকারী চক্র। আর ক্ষতি যা হওয়ার তা হচ্ছে জনগণের। কেননা, করের বোঝা আর বিদেশি ঋণের সব বোঝা সবই শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়। যাত্রীসেবার মান বাড়ছে না, স্টেশন, রেললাইন, রেলসেতুর সংস্কার হচ্ছে না, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ছে না। কিন্তু রেলপথে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। এই দায় অবশ্যই রেলমন্ত্রীকে নিতে হবে।