বঙ্গোপসাগরের পথে রওনা সপ্তম নৌবহর|332216|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
বঙ্গোপসাগরের পথে রওনা সপ্তম নৌবহর
এহ্সান মাহমুদ

বঙ্গোপসাগরের পথে রওনা সপ্তম নৌবহর

৯ ডিসেম্বর রণক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী যখন পলায়নপর অবস্থায় রয়েছে, সেই সময়ে ‘ফাইনান্সিয়াল টাইমস’ একটি সংবাদ প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করার জন্য জুলফিকার আলি ভুট্টো অবিলম্বে রাওয়াপিন্ডি থেকে নিউ ইয়র্ক রওনা হয়েছেন। ৯ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন অপেক্ষমাণ মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। পরে জানা যায় যে, এই নৌবহরে পারমাণবিক অস্ত্রও ছিল। প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রয়োজন হলে তা ব্যবহারের নির্দেশও দিয়েছিলেন। এমন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের বিরুদ্ধেই সোভিয়েত ইউনিয়ন সতর্কতা নিয়েছিল। একদিক দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ২০টি যুদ্ধজাহাজ পাঠায় সপ্তম নৌবহরকে চমকে দিতে। অপরদিকে, চীনের সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে চীনকে ভাবিয়ে তুলতে।

এছাড়া মার্কিন নৌবহরকে পাড়ি দিতে হবে বঙ্গোপসাগরের ৪-৫ দিনের যাত্রাপথ। সপ্তম নৌবহর যখন যাত্রা শুরু করে তখন অর্থাৎ ৯-১০ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত বাহিনীর অগ্রাভিযানের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী দ্রুত পশ্চাদ্পসরণে ব্যস্ত। ৯ ডিসেম্বরে চাঁদপুর ও দাউদকান্দিতে পাকিস্তানি দখলের অবসান হয়। এই দিন কুমিল্লা ও উত্তরবঙ্গ থেকেও পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। ৯ ডিসেম্বর ঢাকাতেও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব ও গভর্নর মালিক সসৈন্য পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

৯ ডিসেম্বর মেঘনা অববাহিকায় মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসার পরে ঢাকায় প্রবেশের পথ পরিষ্কার হয়। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাক জেকব। তিনি তার স্মৃতিকথা বিষয়ক গ্রন্থ সারেন্ডার অ্যাট ঢাকায় লিখেছেন : ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে আমাদের বাহিনী মেঘনার তীরবর্তী প্রধান তিনটি পয়েন্ট আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি ও চাঁদপুরে পৌঁছে যায় এবং মেঘনা নদীর গুরুত্বপূর্ণ বিস্তৃতির ওপরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বদিক থেকে ঢাকার প্রবেশপথ এর ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে এই দিন থেকে। ঢাকা তখন বিমান হামলা, ব্ল্যাক আউট, কারফিউ ও সাইরেনসহ এক আতঙ্কের শহর। সেই সময়ের ঢাকার বিবরণ পাওয়া যায় জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলিতে : আমার সারা শরীর শিরশির করছে। কারফিউ মোড়া এই অবরুদ্ধ শহরে ব্ল্যাকআউটের কালো কাগজ মোড়া এই কবরের মতো ঘরে বাস করতে করতে, স্বাধীন বাংলা বেতার আর চরমপত্র শুনে শুনে কোনোমতে মনোবল খাড়া রাখি। যতই দিন যাচ্ছে মনে হচ্ছে আর পারছি না। এর মধ্যেও এ ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতির কথাবার্তা নিঃসন্দেহে সারা শরীরে জীবনীশক্তি প্রবাহিত করে দিচ্ছে।

(সূত্র: সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: একটি জাতির জন্ম, লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব; দি মেমোয়ার্স অব নিক্সন)