ঘুষ-তদবিরের অভিযোগ ছাড়াই তিন হাজার কনস্টেবল নিয়োগ|332227|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
ঘুষ-তদবিরের অভিযোগ ছাড়াই তিন হাজার কনস্টেবল নিয়োগ
সরোয়ার আলম

ঘুষ-তদবিরের অভিযোগ ছাড়াই তিন হাজার কনস্টেবল নিয়োগ

সুকন চন্দ্র পাল। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। তার বাবা বাবুল পাল একজন কৃষক। অভাব-অনটনের সংসার তাদের। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে সংসার চালান। উঁচু-লম্বা হওয়ায় পুলিশের চাকরির প্রতি ঝোঁক ছিল তার। ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় চাকরি হবে না ধরে নিয়েই দাঁড়িয়ে যান চাঁদপুর পুলিশ লাইনে। নিয়োগ পরীক্ষায় সুকন শারীরিক মাপ, ফিটনেস, লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষায় পাস করেন। কোনো তদবির বা অর্থ ছাড়াই পেয়ে যান স্বপ্নের চাকরিটি।

জয়পুরহাটের আদিবাসী সজল খালকোর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। নিজের ঘরবাড়ি না থাকায় সোনাপুর গুচ্ছগ্রামে সরকারি আশ্রয় প্রকল্পে বসবাস করেন। অন্যদের মতোই সজলও কোনো তদবির বা অর্থ ছাড়াই পেয়ে যান চাকরি। তার খরচ হয়েছে মাত্র ১৩৩ টাকা। এ দুজনের মতোই ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলায় তিন হাজার পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন। আইজিপি কঠোর থাকায় সব জেলাতেই ১৩৩ টাকাই খরচ হয়ে প্রার্থীদের। তার মধ্যে রিকশাচালক, কৃষক, চা-শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, পান দোকানদার, রাজ ও কাঠমিস্ত্রি, নাপিত, পুরোহিত ও গার্মেন্টস চাকুরে পরিবারের সন্তানরাও এবার পেয়েছেন স্বপ্নের চাকরি। চাকরি পেতে তাদের ধরতে হয়নি কোনো দালাল বা তদবিরবাজকে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার স্বচ্ছতার মধ্যেই কনস্টেবল পদে চাকরি সম্পন্ন হয়েছে। তদবিরবাজদের প্রতিরোধ করতে কঠোর মনিটরিং করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। এমনকি মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতাদের ‘আবদারও’ আমলেই নেয়নি পুলিশ। উল্টো যাদের বিষয়ে তদবির হয়েছে তাদের প্রার্থিতা বাতিলও করা হয়েছে।

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা প্রকোপের কারণে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় পুলিশকে উন্নত দেশের আদলে উপযোগী পুলিশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করেছি। এবারের কনস্টেবল নিয়োগ সে প্রক্রিয়ারই অংশ। এজন্য বর্তমান নিয়োগবিধি সংশোধন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মেধা ও শারীরিকভাবে অধিক যোগ্য প্রার্থীদের কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোনো তদবিরই কাজে আসেনি। স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ হয়েছে। অনেক মেধাবী ও গরিবের সন্তানরা এবার পুলিশে চাকরি পেয়েছে তা খুবই আনন্দদায়ক। ভবিষ্যতে এসআই এবং সার্জেন্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরাই নিয়োগ পাবেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, সংশোধিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী কনস্টেবল নিয়োগের অন্যতম লক্ষ্য ছিল, মেধা ও শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকে অধিকতর যোগ্য প্রার্থী নিয়োগ করা। ৬৪ জেলাতেই এতে সাড়া পড়েছে। কোনো ধরনের তদবির ও অর্থের লেনদেন ছাড়াই স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। দিনমজুর, কৃষক, ভ্যানচালকসহ নানা পেশায় জড়িত সন্তানদের মধ্যে বেশিরভাগই চাকরি পেয়েছেন। মাত্র ১৩৩ টাকা ফি দিতে হয়েছে তাদের। পিআরবি পরিবর্তন করায় সাত ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়। তার মধ্যে প্রথম ধাপে প্রাথমিক বাছাই, দ্বিতীয় ধাপে শারীরিক মাপ এবং ফিজিক্যাল অ্যানডুরেন্স টেস্ট, তৃতীয় ধাপে লিখিত পরীক্ষা, চতুর্থ ধাপে মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষা, পঞ্চম ধাপে প্রাথমিক নির্বাচন, ষষ্ঠ ধাপে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সপ্তম ধাপে চূড়ান্তভাবে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্তকরণ। প্রার্থীদের দৌড়, পুশ আপ, লং জাম্প, হাইজাম্প, ড্র্যাগিং এবং রোপ ক্লাইম্বিংও যাচাই করা হয়েছে। পিআরবি সংশোধন শেষে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং প্রার্থীদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত করতে খাগড়াছড়িতে এপিবিএনের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ভিডিও ধারণ করা হয়। সেটি পুলিশের ফেইসবুক পেজসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার করা হয়। গবেষণার ভিত্তিতে টাঙ্গাইল জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পিটিসি টাঙ্গাইলে ‘মক’ নিয়োগ পরীক্ষারও আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থীদের নতুন নিয়মে নিয়োগ পরীক্ষায় অভ্যস্ত করতে শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য সারদায় পুলিশ একাডেমি, এপিবিএনসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ইভেন্টসমূহের অনুশীলন ইভেন্ট পরিচালনা করে শারীরিক সক্ষমতা যাচাই পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। অনলাইনে আবেদন গ্রহণ এবং ওয়েব বেইজড স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা ডিজিটালাইজেশন করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, কনস্টেবল নিয়োগে তদবির-বাণিজ্য ঠেকাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। কোনো ধরনের অর্থ ছাড়াই নিয়োগ সম্পন্ন করতে পুলিশের সবকটি রেঞ্জ ডিআইজি ও এসপিদের কঠোর হুঁশিয়ারি দেন আইজিপি। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একজন এআইজি ও একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে তদারকি টিম গঠন করা হয়। নিয়োগ পরীক্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিমগুলো সবকটি জেলায় সফর করেন। আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করার নির্দেশনাও ছিল। নির্দেশনা পেয়ে এসপিরা ঘোষণা দেন, সরকারি ফি ছাড়া প্রার্থীদের আর কোনো টাকা লাগবে না। তারা জানিয়ে দেন, পুলিশে চাকরি পেতে কোনো দালাল বা তদবির করতে হবে না। দালাল ধরে কেউ প্রতারিত হবেন না। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই পুলিশে চাকরি হবে।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন ছাড়াই নিয়োগ হয়েছে। বেকার, দিনমজুর, কৃষক, রিকশাচালক, গাড়ির ড্রাইভার ও এতিম পরিবারের সন্তানরা চাকরি পেয়েছেন। কোনো তদবির আমলে নেওয়া হয়নি। নিয়োগ পেতে কাউকে দালালও ধরতে হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশে সর্বশেষ ২০১৮ সালে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ হয়। ওই সময়কার আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেন। তার আমলেও কনস্টেবল নিয়োগ স্বচ্ছতা ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদ নানা উদ্যোগ নেন। এবারই প্রথম লিখিত পরীক্ষার খাতা পুলিশ সদর দপ্তর মূল্যায়ন করে।

জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার মাসুম আহাম্মদ ভূঁইয়া বলেন, গরিব অসহায় পরিবারের সদস্যরা ঘুষ-তদবির ছাড়াই পুলিশের চাকরি পেয়েছেন। কোনো তদবির শুনিনি। যারা তদবির করবে তাদের আইনের আওতায় আনার কথা বলেছিলাম। বাছাই পর্ব, মেধা, লিখিত পরীক্ষা ও যোগ্যতা মূল্যায়ন শেষে ফল ঘোষণা করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, আগে টাকা ছাড়া পুলিশে চাকরি হতো না। দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা ও অভিযোগের শেষ ছিল না। প্রতিবারই দায়িত্বশীলদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলে কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতির কলঙ্ক কালিমা লেপে গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশে কনস্টেবল নিয়োগকে ঘিরে দুর্নীতির লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরেন আইজিপি। টিমওয়ার্কের মাধ্যমেই নিয়োগে পুলিশের চিরায়ত ভাবমূর্তি সংকট কাটিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রী-এমপি বা অন্য কোনো ব্যক্তির ‘আবদার’ রাখা হয়নি। উল্টো তদবির করায় অনেকের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।

চাকরি পাওয়া চাঁদপুরের ইমন হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল পুলিশে চাকরি করার। মাত্র ১৩৩ টাকায় চাকরি হওয়ায় পরিবারের স্বপ্নপূরণ হয়েছে। আগে শুনতাম পুলিশে টাকা ছাড়া চাকরি হয় না। কিন্তু যোগ্যতা ও মেধার মাধ্যমেই চাকরি হয়, যার প্রমাণ আমরা। চাকরি পাওয়া আরেক প্রার্থী জানান, মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে পুলিশের বিতরণ করা লিফলেট ও পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছিলাম এবার বিনা পয়সায় পুলিশে চাকরি হবে। কিন্তু বিশ্বাস হয়নি। এক দিন জুমার নামাজে খুতবার আগে একজন পুলিশ অফিসার বিনা পয়সায় যোগ্যতার ভিত্তিতে পুলিশে চাকরি হবে বলে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্য শুনে আবেদন করি। যা আজ বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। ধরতে গেলে বিনা পয়সায়ই চাকরি হয়েছে আমার। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিসহ প্রশাসনের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।