তিন ভাইবোনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও ট্রেনের নিচে|332242|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০
তিন ভাইবোনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও ট্রেনের নিচে
নীলফামারী সংবাদদাতা

তিন ভাইবোনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও ট্রেনের নিচে

রেললাইনের ধারে রেলওয়ের একখণ্ড জমিতে গড়ে তোলা ছোট্ট ঘরে বসবাস রেজোয়ান-মজিদা দম্পতির। নীলফামারী সদরের কুন্দপুকুর ইউনিয়নের মনসাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রেজোয়ান আলী (৩০) পেশায় রিকশাচালক। স্ত্রী মজিদা বেগম (২২) স্থানীয় একটি পরচুলা কারখানার শ্রমিক। দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে তাদের সংসার। সন্তানদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে দিনভর হাড়ভাঙা শ্রম কোনো দিন ক্লান্ত করতে পারেনি এই দম্পতিকে। স্বপ্ন ছিল তিন সন্তান লেখাপড়া শিখবে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ধরবে পরিবারের হাল। তখনই সার্থক হবে তাদের জীবন। এমন স্বপ্নের তাড়ায় প্রতিনিয়ত ছুটে চলছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই চুরমার করে দিল সব স্বপ্ন।

গতকাল বুধবার সকাল ৮টার দিকে বাড়ির পাশে খেলার সময় মনসাপাড়া বউবাজার রেলসেতুর ওপর ট্রেনে কাটা পড়ে  মারা গেছে তাদের দুই মেয়ে লিমা আক্তার (৮) ও সিমু আক্তার (৪) এবং ছেলে মো. মোমিনুর রহমান (৩)। তাদের বাঁচাতে গিয়ে মনসাপাড়া গ্রামের সালমান ফারাজি ওরফে শামীম (৩০) নামে এক যুবকও ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান।

প্রত্যক্ষদর্শী ও মনসাপাড়া গ্রামের একাধিক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, নিহত তিন শিশুর বাড়ির পাশে খালের ওপর একটি রেলসেতুর সংস্কারকাজ চলছিল। তাদের বাবা রেজোয়ান আলী ও মা মজিদা বেগম গতকাল সকালে সন্তানদের দাদা-দাদির কাছে রেখে কাজে চলে যান। এরপর রেলসেতুর সংস্কারকাজের ইট নিয়ে তাদের বাড়ির পাশে একটি ট্রলি আসে। ট্রলিটি সেখানে আটকা পড়লে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতে রেজোয়ান-মজিদা দম্পতির তিন সন্তান তা দেখতে যায়। সেখানে গিয়ে তারা খেলতে শুরু করে। এ সময় চিলাহাটি থেকে ছেড়ে আসা রকেট মেইল নামে একটি ট্রেন খুলনার দিকে যাচ্ছিল। ঘন কুয়াশার কারণে বেশি দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। আর ট্রলির শব্দের কারণে ট্রেনের শব্দও বোঝা যায়নি। ট্রেন আসতে দেখে সেতু সংস্কারকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাহারাদার সালমান ফারাজি বাচ্চাদের রক্ষা করতে এগিয়ে যান। তিনি শিশু মোমিনুরকে কোলে নিয়ে রেললাইন থেকে লাফ দেওয়ার আগেই ট্রেনের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন। লিমা ও সিমু ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আশপাশের লোকজন সালমান ও মোমিনুরকে উদ্ধার করে নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাদের মৃত্যু হয়।

ট্রেনে কাটা পড়ে তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। পরে সকাল ১০টার দিকে চিলাহাটি থেকে ছেড়ে আসা খুলনাগামী আন্তঃনগর রূপসা এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উত্তেজিত গ্রামবাসী ট্রেনটি আটকে বিক্ষোভ শুরু করেন। খবর পেয়ে নীলফামারীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এর ঘণ্টাখানেক পর ট্রেনটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

দুর্ঘটনার পর দুপুর ১২টার দিকে তিন শিশুর লাশ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামের লোকজন সেখানে ভিড় জমান। মা মজিদা বেগম একসঙ্গে তিন সন্তানকে হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। শিশুদের বাবা রেজোয়ানও আহাজারি করতে করতে পাগলপ্রায়। সন্তান হারানোর শোকে বিমর্ষ রেজোয়ান পলকহীন চোখে তাকিয়ে ছিলেন একটি ছোট চৌকিতে একসঙ্গে শোয়ানো তিন সন্তানের লাশের দিকে। তিনি প্রলাপ করতে করতে জানান, আগের দিন রাতে তার তিন ছেলে-মেয়ে আবদার করেছিল পরদিন সকালে তারা হোটেলে পরোটা খাবে। সকালে স্বামী-স্ত্রী কাজে বের হওয়ার আগে তিন সন্তানকে নিয়ে হোটেলে গিয়ে পরোটা ও ডিম ভাজি খাওয়ান। এরপর তারা কাজে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরই ট্রেনে কাটা পড়ে তিন সন্তানের মারা যাওয়ার খবর পান।

রেজোয়ান কান্নায় ভেঙে পড়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুই এলা কী করিম, কেমন করি বাঁচি থাকিমো হামরা। মোর তামান (সব) স্বপন যে শ্যাষ হইল।’

রেজোয়ানের স্ত্রী মজিদা সন্তানদের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে।

 দুর্ঘটনার পর মনসাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, শোকের মাতম। একই সময়ে চার লাশের শোক যেন বহন করতে পারছিলেন না গ্রামের মানুষ। গ্রামবাসী জানান, লেখাপড়ার জন্য বড় মেয়ে লিমা আক্তারকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন রেজোয়ান-মজিদা দম্পতি। অন্য দুই সন্তানকেও স্কুলে ভর্তি করতে প্রস্তুতির কমতি ছিল না তাদের। তারা দুজনে স্বপ্নের জাল বুনছিলেন সন্তানদের নিয়ে।

প্রতিবেশী কফিল উদ্দিন (৭০) বলেন, ‘সন্তানদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের বাবা-মায়ের। তাদের বড় করার লক্ষ্যে হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েই চলছিল দুজনই। সন্তানদের নিয়ে তাদের আনন্দের কমতিও ছিল না। কিন্তু হঠাৎ একটি ট্রেন দুর্ঘটনা ভেঙে দিল পরিবারটির স্বপ্ন।’

মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন শামীম: তিন শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত সালমান ফারাজি শামীম (৩০) গ্রামের মানুষের যেকোনো বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। গ্রামের কেউ অসুস্থ হওয়ার খবর এলেই তাকে নিয়ে ছুটতেন হাসপাতালে। সেই শামীম গতকাল সকালে তিন শিশুকে ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে নিজের জীবন বিপন্ন করেও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেন প্রায় কাছাকাছি। এ সময়ও তিন শিশু খেলছিল রেললাইনে। রেললাইনের পাশে দাঁড়ানো শামীম ওই তিন শিশুর বিপদ দেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন রক্ষায়।

শামীমের ভায়রা জেলা শহরের নিউ বাবুপাড়ার আক্রাম হোসেন জানান, শামীম একসময় ঢাকায় এফডিসিতে চাকরি করতেন। সেখানে চাকরির সুবাদে কয়েকটি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। সেখান থেকে দুই বছর আগে বাড়িতে এসে সংসার দেখাশোনা করছিলেন। এরই মধ্যে রেলপথের সেতুর সংস্কারকাজ শুরু হলে তাকে ওই কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

তিনি বলেন, ‘শামীম অত্যন্ত ভদ্র স্বভাবের ছেলে। মানুষের উপকার করা তার নেশা। এলাকার যেকোনো মানুষের বিপদে তাকে এগিয়ে যেতে দেখেছি। গ্রামের কোনো মানুষ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া নেশায় পরিণত হয়েছিল তার।’

শামীমের মামি রুমি আক্তার জানান, প্রায় সাত বছর আগে সুমি আক্তারকে (২৬) বিয়ে করেছিল শামীম। তাদের ঘরে মিত্তাহুল জান্নাত নামে ছয় বছরের এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। তার বাবা আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন অনেক আগে। স্ত্রী, সন্তান এবং মা চিনু বেওয়াকে নিয়ে তার পরিবার।

এদিকে নীলফামারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদ মাহমুদ এবং নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন নাহার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহত তিন শিশুর পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা এবং শামীম হোসেনের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা ও শুকনো খাবার, কম্বল সহায়তা হিসেবে দেন।

সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুর রহমান জানান, নিহত চারজনের মরদেহ স্বজনরা তাদের নিজ নিজ বাড়ি নিয়ে যান। পরিবারগুলোর পক্ষে কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।