নদী মেরে ইটভাটার রমরমা|339590|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
নদী মেরে ইটভাটার রমরমা

নদী মেরে ইটভাটার রমরমা

দেশজুড়ে নির্বিচারে নদী-খাল-জলাশয় ভরাট আর দখল-দূষণের খবর শিরোনাম হচ্ছে নিয়মিতই। এর বিপরীতে নদী-জলাশয় দখলমুক্ত করার খবর কমই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ২০১৯ সালে তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’, ‘আইনি ব্যক্তি’ ও ‘আইনি সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় প্রকাশের পর আশা করা হয়েছিল, দেশের বেদখল হওয়া নদী-খাল-জলাশয় উদ্ধার এবং সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটছে না। এদিকে দেখা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব বাণিজ্যিক কর্মকা-ের কারণে নদীগুলোতে দখল ও দূষণ চলছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে অবৈধ ইটভাটা। সহজে ভালো মাটি তোলার সুযোগ এবং পরিবহনের সুবিধার কারণে নদী ও নদীর প্লাবনভূমি এলাকাগুলোতে গড়ে উঠছে একের পর অবৈধ ইটভাটা। নদী ও রাষ্ট্রীয় খাসজমি দেখাশোনার দুর্বলতার কারণে ইটভাটার মালিকরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন যে, কেবল অবৈধ ইটভাটা বসিয়েই তারা ক্ষান্ত হচ্ছেন না, ইট পরিবহনের জন্য নদীর বুক চিরে রাস্তাও তৈরি করা হচ্ছে। এতে নদী ও প্লাবনভূমি কেন্দ্রিক কৃষিজ আবাদ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ছে।

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘নদীর বুক চিরে রাস্তা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিকটবর্তী পদ্মার একটি শাখা নদীতে অবৈধ ইটভাটার মালিকদের রাস্তা নির্মাণের খবর তুলে ধরা হয়। সরেজমিন প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, পশ্চিম বাহিরচর এলাকা থেকে ২৫ কিলোমিটার ঘুরে শাখা নদীটি আবার মূল পদ্মায় মিলিত হয়েছে পাবনা সদরের চরশ্রীকৃষ্ণপুরে। বর্ষায় নদীটি বেগবান থাকলেও শীতে হাঁটুসমান পানি থাকে। পানি কমে আসার সুযোগ নিয়ে ইটভাটায় মাটি নেওয়ার জন্য এই শাখা নদীটির বুক চিরে রাস্তা বানিয়েছেন ইটভাটার মালিকরা। পাবনা সদরের হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চরভগীরথপুর গ্রামে নদীতে এই রাস্তা দেখা গেছে। সেখান থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরেই চরশ্রীকৃষ্ণপুর। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই এলাকায় বেশ কিছু অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। ফসলের জমিতে করা ওই সব ইটভাটার একটিরও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। ইটভাটার মালিকরা থানা ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রতিবছরই পদ্মার এই শাখা নদী থেকে মাটি কেটে নেন। আর এবার নদীর ওপারে জয়েনপুর মৌজা থেকে মাটি কাটার পরিকল্পনা করেছে। সেই মাটি ট্রাকে করে আনার জন্যই নদীতে রাস্তা বানিয়েছেন তারা। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন এমন অবৈধ ইটভাটার দখল-দূষণ-ভরাট বন্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

পাবনার পদ্মা অববাহিকায় নদী এবং নদীর প্লাবনভূমির খাসজমি দখলের মচ্ছব এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, অবৈধ ইটভাটার মালিকরা দখল ও ভরাটের বিষয়টি স্বীকার করতেও দ্বিধা করছেন না। নদীতে রাস্তা তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে আলোচ্য একটি ইটভাটার মালিক জুয়েল প্রামাণিক সোমবার দেশ রূপান্তরকে টেলিফোনে বলেন, ‘আমরা নদীর ওপর রাস্তা করছি। কারণ নদীর ওপারে জয়েনপুর থেকে মাটি কাটব। রাস্তা বানানোর কাজ শেষ হলে মাটি কাটা শুরু হবে।’ অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদীটি এলাকার মানুষের

কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা নদীর পানি সেচকাজে ব্যবহার করে থাকেন। এক মৎস্যজীবী আক্ষেপ করে বলেন, এই নদীতে চিংড়ি, টেংরা, বোয়ালসহ নানা ধরনের মাছ পাওয়া যেত। তখন ভগীরথপুর ঘাটে প্রতিদিন সকালে মাছ কিনতে মানুষ ভিড় করত। এখন আর নদীতে আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। স্থানীয়রা বলছেন, যারা নদীর মাটি তুলে নিচ্ছে এবং নদীতে রাস্তা বেঁধেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে উল্টো বিপদে পড়তে হয়। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, ইউএনও এবং থানার ওসিও সবই জানেন কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেন না।

এমন দুঃখজনক বাস্তবতায় আরও জানা গেছে, পাবনায় ২১৮টি চালু থাকা ইটভাটার মধ্যে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনসহ বৈধ কাগজপত্র রয়েছে মাত্র ৬টির। বাকি ২১২টি ভাটা চলছে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে। অথচ ২০১৩ সালের ইটভাটা সংক্রান্ত আইনে বলা আছে, ফসলি জমি বা আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু আইন না মেনেই গড়ে উঠেছে ইটভাটা। কয়লার পরিবর্তে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ইট তৈরির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির ওপরের উর্বর মাটি। পরিবেশবিদরা বলছেন, ইটভাটা পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি কৃষিজমিও শেষ করে দিচ্ছে। দেশে ইটভাটার অনুমোদন আছে ২ হাজারের মতো, বেআইনিভাবে চলছে ৬ হাজারের বেশি। এই পরিস্থিতি পাবনাসহ সারা দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে নদী ও পরিবেশ বাঁচাতে সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রশ্ন হলো, উচ্চ আদালতের রায় এবং জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের কর্মপরিধি বাস্তবায়নে সরকার কেন জেলা প্রশাসনগুলোকে এ বিষয়ে তৎপর করার পদক্ষেপ নিচ্ছে না?