আসাম-কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যার আশঙ্কা জেনোসাইড ওয়াচের|339714|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি, ২০২২ ০৯:৫২
আসাম-কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যার আশঙ্কা জেনোসাইড ওয়াচের
অনলাইন ডেস্ক

আসাম-কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যার আশঙ্কা জেনোসাইড ওয়াচের

জেনোসাইড ওয়াচ-এর প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যান্টন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভারতের আসাম এবং কাশ্মীরে মুসলিমরা গণহত্যার শিকার হতে পারেন। তিনি নরেন্দ্র মোদি সরকারের অধীনে ভারতের পরিস্থিতিকে মিয়ানমারের সঙ্গে তুলনা করে ভারতে মুসলিমদের ওপর আসন্ন গণহত্যার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

ডক্টর গ্রেগরি স্ট্যান্টন ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যার বিষয়েও কয়েক বছর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল আয়োজিত ‘কল ফর জেনোসাইড অফ ইন্ডিয়ান মুসলিম’ শীর্ষক কংগ্রেসনাল ব্রিফিংয়ে স্ট্যান্টন বলেন, ভারতের আসাম রাজ্য এবং ভারত-শাসিত কাশ্মীরে গণহত্যার কিছু প্রাথমিক ‘লক্ষণ এবং প্রক্রিয়া’ দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সতর্ক করছি যে, ভারতে গণহত্যা ঘটার বেশ সম্ভাবনা রয়েছে’।

১৯৯৯ সালে গঠিত জেনোসাইড ওয়াচ গণহত্যা প্রতিরোধে নিবেদিত একটি বিশ্বব্যাপী সংস্থা। ডক্টর স্ট্যান্টন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টির জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা অধ্যয়ন এবং প্রতিরোধের একজন প্রাক্তন গবেষণা অধ্যাপক।

স্ট্যান্টন বলেন, গণহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি প্রক্রিয়া এবং মুসলিমদের প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুসৃত নীতির সঙ্গে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির অনেক মিল রয়েছে।

মোদির নীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হল ২০১৯ সালে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা বাতিল। এর মধ্য দিয়ে কাশ্মীরিদের ৭০ বছর ধরে ভোগ করে আসা স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়েছেন মোদি। একই বছর মোদি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনও করেন। যে আইনে ভিনদেশের হিন্দুসহ সব ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়, কিন্তু মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়। এই আইনের ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসামে এসে বসতি স্থাপন করা মুসলিমদের ওপর গণহত্যার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারেও ঠিক এভাবেই রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার খড়্গ নেমে এসেছিল। প্রথমে তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয় এরপর তাদের ওপর সহিংসতা এবং গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘ভারতেও এখন একই ধরনের প্রক্রিয়া চলছে’।

স্ট্যান্টন বলেন ১৯৮৯ সালে তিনি রুয়ান্ডার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুভেনাল হাবিয়ারিমানাকে সতর্ক করেছিলেন যে, ‘আপনি যদি আপনার দেশে গণহত্যা প্রতিরোধে কিছু না করেন তবে পাঁচ বছরের মধ্যে এখানে একটি বড় গণহত্যা ঘটতে চলেছে’।

এরপর ঠিকই ১৯৯৪ সালে ৮ লাখ তুতসিকে হত্যা করেছিল হুতুরা।

স্ট্যান্টন বলেন, ‘আমরা ভারতে এটা হতে দিতে পারি না’।

জেনোসাইড ওয়াচ ২০০২ সাল থেকেই ভারতে একটি গণহত্যার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। সেবার গুজরাটে তিন দিনের দাঙ্গায় এক হাজারেরও বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তখন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি এবং তিনি কিছুই করেননি। আসলে অনেক প্রমাণ রয়েছে যে, তিনি নিজেই সেই গণহত্যাকে উৎসাহিত করেছিলেন’।

সম্প্রতি উত্তর ভারতে একটি হিন্দু ধর্ম সভায় মুসলিম গণহত্যার আহ্বান প্রসঙ্গে বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক অধিকার কর্মী, লেখক এবং ভারতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক প্রধান আকার প্যাটেল আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনগুলোকে ‘খুব গুরুত্ব সহকারে’ নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ভারতের নাগরিক সহিংসতার ইতিহাস থেকেই প্রমাণ মেলে যে, কোনো রাজ্যের কর্তৃপক্ষ এমন কিছু করে যা সহিংসতাকে (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) উসকে দেয় বা তারা সহিংসতা বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট কাজ করে না’।

‘আমি মনে করি ভারত সরকারের এটিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত... ভারতে যখন এই ধরনের কথা বলা হয় এবং রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে কিছুই করে না তখন বাইরের লোকেরা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়’।

ভারতের সাবেক তথ্য কমিশনার এবং নয়াদিল্লি ভিত্তিক শিক্ষাবিদ এম এম আনসারিও এই খবরকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভয়টা খুবই খাঁটি’।

আরও অনেক বিশেষজ্ঞও মুসলিম বিক্রেতা এবং ব্যবসায়ীদের ওপর হিন্দু আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের নিন্দা করেছেন।

গত নভেম্বরে হিন্দু কট্টরপন্থীরা ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যিনি মোদির অধীনে যে ধরনের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বিকাশ লাভ করেছে তাকে আইএসআইএল (আইএস আইএস বা আইএস) এর মতো ইসলামি ‘চরমপন্থী গোষ্ঠীর’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

গত মাসে সোশ্যাল মিডিয়ায় গণহত্যা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারে হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের আহ্বান জানানোর কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর সুপ্রিম কোর্ট উত্তরাখণ্ড রাজ্যে এই ঘৃণার বক্তব্যের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আল জাজিরায় লেখা একটি মতামত নিবন্ধে ভারতের অধিকার কর্মী এবং শিক্ষাবিদ অপূর্বানন্দ বলেন, ‘বিজেপির নেতৃত্বে ভারত বিশ্বের মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তারা ভারতে শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাস এবং এমনকি ব্যবসাকে অপরাধ গণ্য করার জন্য আইন পাস করা হচ্ছে’।

তবে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের মুখপাত্র সৈয়দ জাফর ইসলাম জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘ভারতকে যেভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে এখানে এমন কোনো জিনিসের অস্তিত্ব নেই’।

তিনি বলেন, ‘প্রথমত তারা যে ধারণা তৈরি করেছে তা বাস্তবিকভাবে ভুল। মিডিয়ায় হাইলাইট করা অনেক ঘটনা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে থাকে’।

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে সহিংসতার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে তবে তা শুধু একটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বা অন্যান্য বিরোধের মতো নানা কারণে আমরা কখনো কখনো একে অপরের ওপর আক্রমণ করি। এই আক্রমণগুলো শুধুমাত্র হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে ঘটে না, হিন্দুদের মধ্যেও ঘটে’।

ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মুসলমান। আর হিন্দুরা এখনো জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ।

মোদির বিজেপি এবং এর আদর্শিক বাবা-মা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) হিন্দুদের ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরণের বিষয়ে সতর্ক করেছে এবং ভারতে ধর্মীয় ‘জনসংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতা’ প্রতিরোধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অর্থাৎ, হিন্দুদের মুসলিম বা খ্রিষ্টান হওয়া ঠেকাতে বলেছে।

মোদির বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর কট্টরপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের নিপীড়নের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু মোদির সরকার সেসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।