'সন্ধ্যার আকাশে কুয়াশার মতো ধোঁয়া, একটার পর একটা সাউন্ড গ্রেনেড'|339779|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি, ২০২২ ১৮:২৭
'সন্ধ্যার আকাশে কুয়াশার মতো ধোঁয়া, একটার পর একটা সাউন্ড গ্রেনেড'
অনলাইন ডেস্ক

'সন্ধ্যার আকাশে কুয়াশার মতো ধোঁয়া, একটার পর একটা সাউন্ড গ্রেনেড'

গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড হামলা চালায়। অবরুদ্ধ উপাচার্যকে মুক্ত করতে পুলিশের এই হামলায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। একজন শিক্ষক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

পুলিশের হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, সাস্ট ক্যারিয়ার ক্লাবের অর্থ সম্পাদক নওরিন জামান ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন।

তিনি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রবিবার রাতে এক স্টাটাসে হামলার লোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরেছেন। তার স্টাটাসটি হুবাহু তুলে দেয়া হলো-

পুলিশের মাইর শুরু হয়ে গেছে কয়েক সেকেন্ড। পিছাইতেছি কিন্তু হাত ছেড়ে শেকল ভাঙতেছি না কারণ আমরা এক স্যারকে কেচিগেটের ভেতরে ঢুকতে দেবো বলে কথা দিয়েছি। কিন্তু এর মধ্যে লাঠিরবাড়ি পড়া শুরু হইছে। হাত ছুটে গেলো। নিজে দৌড় দেবো নাকি আগে রুমমেটরে হেঁচড়ে ফ্রন্ট লাইন থেকে বের করবো বুইঝা উঠতে না উঠতে পইড়া গেছি। উঠতে গেলাম এর মধ্যে আমার ওপর আরেকজন পড়ে গেলো। তার ওপর লাঠিরবাড়িও পড়লো যা বুঝলাম। সে আমার ওপর থেকে উঠে দাঁড়াইতে পারলে সামনে তাকায়ে দেখি ফার্স্ট ইয়ারে পাশের রুমে থাকতো যে আপু, সিট না পেয়ে হল ছাড়ছিল সে মাথায় হাত চেপে দৌড়াইতেছে। আমাকেও দৌড়াইতে হবে। উঠতে গেলাম দেখি আমার বাম পায়ের ওপর একজন পুলিশ দাঁড়ানো আর বাম পাশে মাটিতে পরে কে যেন মাইর খাইতেছে। এর মধ্যে পেছন থেকে কে যেন হ্যাচড়া টান দিলো। বাম পায়ের জুতা পুলিশের পায়ের তলায় রেখে এই প্রথম সম্বতি নিয়ে উলটা দৌড় দিলাম। সবাই সবাইকে টেনে নিয়ে আসতেছে। এলোপাতাড়ি দৌড়াইতেছে। আমি প্রায় আইসিটির ব্যাডমিন্টন কোর্টের কাছে চলে আসছি তখন পেছন ঘুরে দেখি এক আপু তখনো স্যারের সাথে দাঁড়ায় আছেন। আপুর মাথায় তখনো হয়তো ছিলো আমরা বলছি স্যারকে ভেতরে ঢুকতে দেব। এর মধ্যে আবার কে পেছন থেকে টান দিলো জানি না। আমিও চেনা অচেনা যারে পাইলাম টাইনা বের করার মতো নিয়ে আসলাম। এতক্ষণ পার হওয়ার পর মনে হইলো না খালি মাইর খাইয়া চইলা আসা যাবে না। ইট হাতে নিয়ে পেছন ঘুরে দেখি আমার বান্ধবির মাথা থেকে রক্ত পড়তেছে, চোখ আধখোলা আর ও হাঁটতেছে না। কেউ একজন ওকে কোলে করে নিয়ে আসতেছে। ইট ফেলে ওরে ধরলাম। পেছনে আকাশে তারাবাজি ফুটতেছে। সন্ধ্যার আকাশে কুয়াশার মতোন ধোয়া, একটার আগে আরেকটা সাউন্ড গ্রেনেড পড়তেছে। গোলচত্বরে গেলাম বান্ধবির পিছু নিয়ে। যে ছেলেটাকে মনে হইতো ক্যাম্পাসের সবথেকে নীতিহীন ছেলে ওই ছেলেটা একটা রিকশা খুঁইজা দিলো। হাসপাতালে যাওয়া দরকার জলদি। কিন্তু রিকশা মামা যাবে না। এক কিলোতে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়তেছে। যাবে কেমনে? পরে রিকশা ঘুরায়ে গেলো ক্যাম্পাসের মেডিকেলে।

এক পায়ে জুতা ছাড়া মেডিকেলে গিয়ে দেখি ওখানে আরো দুজন আমাদের আগে পরে আছে। ড্রেসিং করার পর বললো ‘রাগীব রাবেয়ায়’ যান টিটেনাস দেয়া লাগবে। বের হইলাম। তখনো পেছনে সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজ। আকাশের কাকগুলাও আমাদের মতো কোন দিক যাবে, কত জোড়ে কা কা করবে না বুইঝা এলোপাতাড়ি মাথার ওপর দিয়া উড়তেছে। রিকশা নিয়া নতুনবাজারের দিক থেইকা বের হইলাম। পথে অচেনা ভাইদের যাদের পাইলাম সবাই হেল্প করলো। রাগীব রাবেয়ায় যাওয়ার পর আরো দুজনকে পাইলাম ইনজুরড। আমার পেসেন্ট যেহেতু মাথায় আঘাত পাইছে; বললো ওসমানীতে আনতে। ওসমানী গিয়ে শুনলাম এমার্জেনসিতে নাকি আরো ছয়জন আসছে আমাদের আগে। এদের মধ্যে একজনের কাহিনী এমন ‘ভাই লাঠির বাড়ি আর ধাওয়া খাইতে খাইতে কোনদিক যাবেন না বুইঝা লেকের মধ্যে লাফ দিছে। এরপর লেক সাঁতরায়ে অপর পাড়ে যাওয়ার পর কয়েকজন ওনাকে ধরে উঠাইছেন। এরপর থেকে আর কথা বলতেছেন না।’ আমি আমার রোগী নিয়ে সার্জারি ওয়ার্ডে গেলাম। শুনলাম সজল ভাইরে নাকি এই হাসপাতালের আইসিইউতে নিতে হইছে। আরেকটু পর আমার আরেক বান্ধবী আসলে হিজাব পেঁচায়ে, যারে আমি আগে কখনোই হিজাব পরতে দেখি নাই। বুঝলাম মাইক হাতে নিয়ে স্লোগান দিলে পরে এমনে হিজাব পরতে হয়। পাশ করে বের তো হইতে চাই। ফেইসমার্ক তো চাই না। ফ্রেন্ড লিস্টে থাকা, এলাকায় থাকা আমার অসম্ভব শ্রদ্ধার স্যারদের কাছ থেকে হিজাব পরে পালাইতে তো মনে হয় এই মেয়েটাও কখনো চায় নাই।

হ্যাঁ অনেকজন স্যার দেখতে আসছেন হাসপাতালে। একজন টাকা পয়সাও দিয়ে গেছেন। আমার ডিপার্টমেন্টের স্যারও আসছেন। ধন্যবাদ। শুধু শুরুটা না হইলেই পারতো। এখন অনেক হয়ে গেছে। আন্দোলন চলছে, চলবে।