করোনা মহামারী থেকে মুক্তি মিলতে পারে ‘শিগগিরই’|339932|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ১০:১৪
করোনা মহামারী থেকে মুক্তি মিলতে পারে ‘শিগগিরই’
অনলাইন ডেস্ক

করোনা মহামারী থেকে মুক্তি মিলতে পারে ‘শিগগিরই’

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারী দুই বছর ধরে দৃশ্যত গোটা বিশ্বে এক ধরনের স্থবিরতার সৃষ্টি করেছে। কবে মুক্তি মিলবে এই মহামারী থেকে- এ নিয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা মানুষের।

অবশেষে বিজ্ঞানীরা আশা দিচ্ছেন, ‘হয়তো খুব শিগগিরই।’

বিজ্ঞানীদের অনেকে মনে করেন, করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে এবং তার ফলে এটি দিনে দিনে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এছাড়াও সারা বিশ্বে লোকজনকে টিকা দেওয়ার কারণে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা।

এসব থেকে ধরে নেওয়া যায় মহামারীর সময় ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছে- এমনটাই দাবি করা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইতোমধ্যেই কভিড মহামারী ‘শেষ হয়ে যেতে শুরু’ করেছে। এটি যে এখন শেষ পর্যায়ে তার লক্ষণ স্পষ্ট।

ভাইরাসটি কি একেবারেই উধাও হয়ে যাবে- এমন প্রশ্নে তারা বলছেন, কোনো সন্দেহ নেই যে কভিড থাকবে, কিন্তু সেটা ‘প্যান্ডেমিক’ হিসেবে নয়, থাকবে ‘এন্ডেমিক’ হিসেবে।

যুক্তরাজ্যে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অধ্যাপক জুলিয়ান হিসকক্স বলেছেন, ‘বলা যায় যে এরকম পরিস্থিতিতে আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। বলতে পারেন মহামারী শেষ হতে শুরু করেছে; অন্তত যুক্তরাজ্যে। আমার মনে হয়, ২০২২ সালে আমাদের জীবন প্যান্ডেমিকের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।’

করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট দুর্বল হচ্ছে ওমিক্রনই তার অন্যতম লক্ষণ। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই ভ্যারিয়েন্ট যত বেশি ছড়াবে, ভাইরাসটি ততোই দুর্বল হয়ে পড়বে। এর মধ্য দিয়েই অবসান ঘটবে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকটের।

অবশ্য বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর মনে করেন না যে খুব শিগগিরই বর্তমান মহামারীর অবসান হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত একশ’ বছরে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের প্যান্ডেমিক পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সেসব মহামারী এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। সেই বিবেচনায় হয়তো বলা হচ্ছে যে, এটাই হয়তো শেষ বছর। কিন্তু এখানে অন্য প্রশ্নও রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দুটো সম্ভাবনা আছে। আমরা ওমিক্রনের যত মিউটেশন দেখছি, সেটি আবার ততোই সংক্রমিত হচ্ছে। যখনই ভাইরাস ব্যাপক ট্রান্সমিশনে থাকে, তখন ভাইরাসের আরও বেশি মিউটেশনের সম্ভাবনা থাকে। তখন হয়তো ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।’

‘আবার শক্তিশালীও হতে পারে। এ কারণে প্যান্ডেমিক শেষ হয়ে যাচ্ছে কি-না সেটা বলার জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে’ যোগ করেন এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘যেখানে এখনো প্রতিদিন ২০/২৫ লাখের ওপর রোগী হচ্ছে এবং পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, সেখানে কোনো ভ্যারিয়েন্ট দুর্বল হয়ে যাচ্ছে- এই ভবিষ্যদ্বাণী করার মতো সময় এখনো আসেনি।’

তবে আশাবাদী হওয়ার পেছনে মূল কারণ দু’টি- একদিকে ভাইরাসের দুর্বল হয়ে পড়া এবং অন্যদিকে ভাইরাসের হোস্ট অর্থাৎ মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত দুই বছরে পৃথিবীর ৩২ কোটিরও বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং এর হাত থেকে রক্ষা পেতে বহু মানুষ টিকা নিয়েছে। ফলে তাদের দেহে ভাইরাসটি প্রতিরোধ করার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এটিকে প্রতিরোধের জ্ঞানও তৈরি হয়েছে মানুষের দেহে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর সামনে দু’টি সম্ভাবনা- হয় কভিড পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাবে, যেমনটা পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে ইবোলো ভাইরাসের বেলায় হয়েছে। অথবা এটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে আমাদের মধ্যে দীর্ঘসময় ধরে সাধারণ সর্দি-কাশি, এইচআইভি, হাম, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মার মতো রয়ে যাবে।

ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ভাইরোলজিস্ট ড. এলিজাবেটা গ্রোপেলি বলেছেন, ‘আমি খুব আশাবাদী যে আমরা খুব শিগগিরই এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছাবো যেখানে ভাইরাসটি ছড়াতে থাকবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে রক্ষায় আমাদের কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সাধারণ লোকজনের খুব একটা অসুবিধা হবে না।’

মহামারী বিশেষজ্ঞরা একটি রোগকে তখনই ‘এন্ডেমিক’ রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন, যখন সেই রোগের মাত্রা স্থিতিশীল থাকে এবং বোঝা যায় এর পর কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কিন্তু যখন কোনো একটি রোগ হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে অতি দ্রুত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিকে তারা বিবেচনা করেন ‘প্যান্ডেমিক’ রোগ হিসেবে।

ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের মহামারী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আজরা গানি বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুত এন্ডেমিক পর্যায়ে চলে যাব। মনে হচ্ছে অনেক সময় লাগছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে মাত্র এক বছর আগে লোকজনকে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এই টিকার কারণে আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারছি।’

তবে এই পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে যদি এমন কোনো নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটে যা মানুষকে গুরুতর অসুস্থ করে দিতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা মনে রাখা জরুরি যে ‘এন্ডেমিক’ রোগ সবসময় দুর্বল হয় না।

‘কিছু এন্ডেমিক রোগ আছে যেগুলোতে আক্রান্ত হয়ে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হয়’ বলেন অধ্যাপক গানি।

তবে অধ্যাপক হিসকক্স মনে করেন, পরিস্থিতি আবারও খুব বেশি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা নেই।

তিনি বলেন, ‘নতুন ভ্যারিয়েন্ট কিংবা পুরোনো ভ্যারিয়েন্ট যা কিছুই আসুক না কেন, বেশিরভাগ মানুষই যখন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে তাদের সামান্য একটু সর্দি-কাশি হবে, সামান্য মাথাব্যথা করবে, এবং তারপরেই আমরা ঠিক হয়ে যাব।’

চীনের উহান শহরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়। পরের বছর এটি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়লে স্থবির হয়ে যায় সার্বিক জনজীবন।