মানসিক রোগমুক্তিতে সম্মোহন|340249|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
মানসিক রোগমুক্তিতে সম্মোহন
তৃষা বড়ুয়া

মানসিক রোগমুক্তিতে সম্মোহন

সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ পারিপার্শ্বিক নানা চাপে থাকেন আজকের নারীরা। ভুগতে হয় উদ্বেগে, বিষণ্নতায়। ওষুধ যে সব সময় মানসিক এসব রোগ সারায়, তা নয়। বিকল্প হিসেবে অনেকে হিপনোথেরাপিরও শরণাপন্ন হন। চিকিৎসার এ পদ্ধতি ব্যাপক পরিচিতি না পেলেও মানসিক যন্ত্রণা লাঘবে এর অবদান উড়িয়ে দেওয়া যায় না। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া 

সম্মোহন

আজকের যুগের নারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণœতায় ভোগার হার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের অনেকে মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা ও ভুল বা ক্ষতিকর কাজ বারবার করা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারেন না, যাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) বলা হয়। মানসিক এসব সমস্যা একপর্যায়ে তাদের নিদ্রাহীন রাত কাটানোর দিকে ঠেলে দেয়। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে নারীদের একাংশ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আবার কেউ বা সাইকোথেরাপিস্টের কাছে যান। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধপত্র খেয়ে বা সাইকোথেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলে সবাই কি আরোগ্য লাভ করেন? নিয়ম করে ওষুধপত্র খেয়ে কাজে না দিলে বা কয়েক সেশনে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় সাইকোথেরাপিস্টের সঙ্গে শেয়ার করে সুফল না পেলে সে ক্ষেত্রে কী করা যেতে পারে? দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যায় ভোগা নারীদের তখন বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হয়। আত্মীয়স্বজন বা অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক, সাইকোথেরাপিস্টরাই তাদের বিকল্প পথ বাতলে দেন আর তা হলো হিপনোসিস বা সম্মোহন। হিপনোসিসের কার্যকারিতা নিয়ে অবশ্য অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। এ পদ্ধতি অবলম্বন করে মানসিক রোগমুক্তি আদৌ ঘটে কি না এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। বলতে গেলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা সাইকোথেরাপির মাধ্যমে যখন মানসিক রোগ থেকে রেহাই মেলে না, তখনই শেষ আশ্রয় হিসেবে হিপনোথেরাপিস্টের কাছে যাওয়া হয়। পশ্চিমা বিশ্বে এটির মাধ্যমে সুস্থ হওয়া মানুষের সংখ্যা অবশ্য নেহাতই কম নয়।

হিপনোথেরাপি

নিউ ইয়র্কের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রেনা ফারগুসন জানান, হিপনোথেরাপি বা সম্মোহনের মাধ্যমে রোগীকে একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এ অবস্থায় নিশ্চিন্ত ও প্রশান্ত বোধ করেন তিনি। এ সময় পরামর্শ বা নির্দেশনার প্রতি তিনি সাড়া দেন বেশি। রেনা ফারগুসন বলেন, ‘ঘোরের ভেতর থাকার সময় রোগী তার প্রতিদিনকার দুশ্চিন্তা, অবদমন ও আমিত্ব প্রকাশ করে ফেলেন। যেসব বিষয় তাকে পীড়া দিচ্ছে বা সমস্যার মূল কারণ, রোগীকে তুলনামূলক কম যন্ত্রণা দিয়ে সহজে সেসব বিষয় সামনে চলে আসে। রোগী একপর্যায়ে নিরুদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, তার সাবধান ও সতর্ক হওয়ার চেষ্টা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি তখন আরও বেশি কার্যকরভাবে নির্দেশনা মেনে চলার পর্যায়ে চলে যান।’

হিপনোথেরাপির সেশন সাধারণত রোগীর সঙ্গে কথা বলে শুরু হয়। এরপর থেরাপিস্টের রুমে থাকা আরামদায়ক চেয়ারে তাকে বসতে বলা হয়। সঙ্গে একটি কম্বলও দেওয়া হয়। এরপর হিপনোথেরাপিস্ট তাকে কয়েকটি বাক্য বারবার বলতে থাকেন। একপর্যায়ে রোগী ভাবনাহীন হয়ে পড়েন। তখন তার সামনে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য তুলে ধরা হয় যাতে সেসব তিনি কল্পনা করেন। এরপর ধীরে ধীরে রোগীকে ওই ভাবনাহীন অবস্থা থেকে বের করে আনা হয়। পুরো সেশন এক থেকে দুই ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সেশন চলাকালে হিপনোথেরাপিস্ট ও রোগীর কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। হিপনোথেরাপিস্টের কাছে পরবর্তী সেশনে যাওয়ার আগে রোগীকে বাড়িতে বসে সেই অডিও শুনতে বলা হয়। 

মানবদেহে সম্মোহন ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে সম্মোহনের সময় মস্তিষ্কে তিন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। এগুলো হলো সম্মোহিত ব্যক্তির শারীরিক ক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ভিন্নভাবে সাড়া দেওয়া, তার কর্মকাণ্ডের সচেতনতা কমে যাওয়া ও মনোনিবেশ করার ক্ষমতা বেড়ে যাওয়া যাতে অন্য দুশ্চিন্তা তাকে বিক্ষিপ্ত করার সুযোগ না দেয়।  

ইতিহাস

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে জার্মান চিকিৎসক ফ্রানজ আন্তন মেসমার ‘অ্যানিমেল ম্যাগনেটিজম’ নামে এক তত্ত্ব দাঁড় করান। এই তত্ত্বে বলা হয়, সব জীব ও জড়ের মধ্যে প্রাকৃতিক এক ধরনের বল আদান-প্রদান হয়। অদৃশ্য ও চুম্বকীয় সেই বলের মাধ্যমে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। মেসমারের এই তত্ত্বকে পরে তার নামানুসারে মেসমেরিজম বলা হয়। এখান থেকেই মেসমেরিজম শব্দের উৎপত্তি। মেসমারের অ্যানিমেল ম্যাগনেটিজম তত্ত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকায় এক দশক পর তা প্রত্যাখ্যান করে চিকিৎসক সমাজ। তবে প্রত্যাখ্যান করা হলেও সে সময় অনেক চিকিৎসক লক্ষ করেন, অ্যানিমেল ম্যাগনেটিজম ব্যবহার করে মানসিক রোগীদের অনেকটা সুস্থ করে তুলছেন মেসমার। এই চিকিৎসকদের একজন হলেন স্কটল্যান্ডের চক্ষুবিশেষজ্ঞ জেমস ব্রেইড। সম্মোহন শব্দের তিনিই স্রষ্টা। নিদ্রার গ্রিক শব্দ থেকে সম্মোহন শব্দটি নেওয়া হয়। আধুনিক বিজ্ঞান পরে প্রমাণ করে, সম্মোহনের সঙ্গে নিদ্রার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে নিদ্রা ও সম্মোহনের মধ্যে একটি বিষয়ের মিল রয়েছে। তা হলো, উভয় ক্ষেত্রে ব্যক্তির মনোযোগ তার সমস্যার চেয়ে সমস্যা সমাধানের দিকে বেশি থাকে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রিয়ান চিকিৎসক জোসেফ ব্রুয়ার তার এক হিস্টেরিয়া রোগীর সফল চিকিৎসা করে সবার নজর কাড়েন। ওই রোগীর শৈশবের আবেগ ও ঘটনা সম্পর্কে ধারণা পেতে সম্মোহনের আশ্রয় নিয়েছিলেন ব্রুয়ার। তারই এক সহকর্মী ছিলেন নিওরোলজিস্ট ও সাইকো-অ্যানালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। সম্মোহন নিয়ে কাজ করার সময় মানুষের অচেতন অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিক আবিষ্কার করেন ফ্রয়েড। সম্মোহনের আধুনিক চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মিল্টন এরিকসন। অচেতন অবস্থায় রোগীর সঙ্গে সৃজনশীলভাবে কথা বলায় দক্ষ ছিলেন তিনি। সে সময়ের অন্য বিশেষজ্ঞের মতো রোগীর লক্ষণ শনাক্তে আগ্রহ ছিল না এরিকসনের। বরং রোগীর আত্মরক্ষার চেষ্টা থামিয়ে তাকে রোগের লক্ষণ থেকে মুক্ত করার দিকেই বেশি ঝোঁক থাকত তার।

মানুষকে পাল্টায় না

সম্মোহনের মাধ্যমে অসুস্থদের সারিয়ে তোলার চল এখনকার সৃষ্টি নয়, বরং হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষের রোগমুক্তিতে এ পন্থা ভূমিকা রেখে আসছে। আধুনিক বিজ্ঞানে ব্যবহারের আগে প্রাচীন মিসর ও ভারতে সম্মোহনের মাধ্যমে মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হতো। মিসরের হায়ারোগ্লিফিক ও ভারতীয় বিভিন্ন পুথিতে এমনটাই বলা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আজকের যুগেও হিপনোসিসকে ‘হাতুড়ে বিজ্ঞান’ হিসেবে দেখা হয়। মানুষকে সুস্থ করার এই তরিকাকে মূলধারার চিকিৎসা পদ্ধতি খুব একটা পাত্তা দেয় না। এ ছাড়া সম্মোহিত মানুষকে দিয়ে জোর করে বিব্রতকর বা ক্ষতিকর কিছু করানো যেতে পারে এই আশঙ্কার জায়গা থেকে হিপনোথেরাপি এখনো মানুষের আস্থার জায়গায় সেভাবে যেতে পারেনি। এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রেনা ফারগুসন বলেন, ‘হিপনোথেরাপি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভ্রান্ত ধারণা হলো এটি রোগীর সত্তা পরিবর্তন করে ফেলে। তিনি যা নন, রাতারাতি তা বনে যান। আসল বিষয় হচ্ছে, নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ কখনোই হারিয়ে ফেলেন না সম্মোহিত ব্যক্তি। ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করানো সম্ভব নয়। দুঃখের বিষয়, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও হিপনোথেরাপি নিয়ে এসব ভুল ধারণা ছড়িয়ে বেড়ান, যা ঠিক নয়। তাদের নেতিবাচক প্রচারের কারণে হিপনোথেরাপি যে উচ্চতায় যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের এই শাখার বিস্তার এত বছরেও সেভাবে হয়নি।’

গবেষণার ফল

মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থা যেমন উদ্বেগ-ট্রমা, দীর্ঘস্থায়ী অসুখ যেমন ইরিটেবল বাওল সিনড্রোম (পেটের ব্যাধি) থেকে শুরু করে আরও নানা ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসায় সম্মোহন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এ নিয়ে সম্প্রতি কয়েকটি গবেষণাও হয়েছে। গবেষণার ফলে দেখা গেছে, হিপনোথেরাপি নেওয়ার পর গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭১ শতাংশ রোগীর ইরিটেবল বাওল সিনড্রোমের (আইবিএস) লক্ষণের উন্নতি হয়েছে। আর তাদের মধ্যে ৮১ শতাংশ আইবিএস থেকে দীর্ঘ মেয়াদে মুক্তি পান। এ ছাড়া ধূমপান ছেড়ে দেওয়া, ওজন কমানোর মতো মানুষের আরও বেশ কিছু স্বভাবগত পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে হিপনোথেরাপি। আরেক গবেষণা পর্যালোচনায় জানা গেছে, হিপনোথেরাপির সঙ্গে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (এক ধরনের সাইকোথেরাপি, যা চিন্তা ও আচরণের পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে মানসিক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে) এক করে চিকিৎসা করানো হলে ব্যক্তি তার ওজন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে সক্ষম হন। কেবল কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি নিয়ে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এতটা সুফল পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ব্যথানাশক হিসেবেও কাজ করে হিপনোথেরাপি। সার্জারির সময় জেনারেল অ্যানেসথিসিয়ার বিকল্প সম্মোহন হতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টার। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ৫০ জনের মধ্যে মাত্র একজন রোগীর সার্জারির সময় জেনারেল অ্যানেসথিসিয়ার দরকার পড়েছিল।

সবার জন্য নয়

সম্মোহন কী সবার জন্য? সবাই কি এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে সাড়া দেন? এক পরিসংখ্যান বলছে, হিপনোথেরাপি নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ সম্মোহনের সময় বেশ ভালোই সাড়া দেন, প্রায় ১০ শতাংশ ব্যক্তিকে সম্মোহন করা একেবারেই সম্ভব নয় আর বাকিরা এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেন। হিপনোথেরাপির মানুষকে সুস্থ করে তোলার সম্ভাবনা থাকলেও সবার ক্ষেত্রে কিন্তু এই চিকিৎসা প্রযোজ্য নয়। যেমন : হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রমে থাকা লোকদের হিপনোথেরাপি নিতে সুপারিশ করা হয় না। এ ছাড়া ডিসোশিয়েটিভ ডিসঅর্ডারে (এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা, যাতে রোগী চিন্তা, স্মৃতি, আশপাশের পরিবেশ, কর্মকাণ্ড ও পরিচয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও ধারাবাহিকতা সব সময় ধরে রাখতে পারেন না) ভোগা ব্যক্তিদেরও হিপনোথেরাপি নিতে বলা হয় না কারণ হিপনোথেরাপিস্টের কাছে গেলে ডিসোশিয়েটিভ ডিসঅর্ডারের রোগীদের মধ্যে ভুল স্মৃতি দানা বাঁধার আশঙ্কা থাকে।

ম্যাজিক নয়

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, হিপনোথেরাপি দ্রুত রোগ সারায় না। মানবদেহে এটি কাজ করতে সময় নেয়। তাই মানসিক সমস্যা নিয়ে হিপনোথেরাপিস্টের কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুস্থ হওয়ার আকাক্সক্ষা না করাই শ্রেয়। এই চিকিৎসা পদ্ধতি তাৎক্ষণিক ফল দেয় না। ফল পেতে বেশির ভাগ রোগীকে কয়েকটি সেশনে থাকা লাগে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ফারগুসন বলেন, ‘হিপনোথেরাপি ম্যাজিকের মতো কাজ করে না। হিপনোথেরাপিস্টকে রোগীর বিশ্বাস করা জরুরি। আর তা স্বাভাবিকভাবেই ২/১ সেশনে সম্ভব নয়। আস্থার সম্পর্ক হলেই শুধু সম্মোহন কাজ করে, অন্যথায় নয়।’ 

কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে হিপনোথেরাপি কাজ করতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লেগে যায়। এমনই একজন ইলানা কাপলান। বিষণœতা ও অনিদ্রায় দীর্ঘদিন ভোগেন তিনি। কাপলান বলেন, ‘টানা দেড় বছর সেশনে যেতে হয়েছিল আমাকে। নিজের বিষয়ে হিপনোথেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আমার সেশন। এক দিন আমাকে হেলানো এক আরামদায়ক চেয়ারে শুয়ে পড়তে বলা হয়। একই সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের হালকা বাজনা শোনানো হয়। সম্মোহনের পর্যায়ে চলে গেলে আমার হিপনোথেরাপিস্ট আমাকে কয়েকটি লেখা কয়েকবার পড়ে শোনান। সে সময় অদ্ভুত এক প্রশান্তির ছোঁয়া পাই। এভাবেই চলতে থাকে।’ সেশন শেষে ঘরে ফিরে হিপনোথেরাপিস্টের সঙ্গে কথোপকথনের অডিও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন কাপলান। সেশন শুরুর দেড় মাসের মধ্যে রাতে টানা ঘুম হয় তার। এরপরের তিন মাসে বিষণœতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে কাপলানের। আরও ছয় মাস পর মানসিক রোগের সব লক্ষণ কমতে শুরু করে তার। কাপলান বলেন, ‘ভেবেছিলাম, সুস্থ হতে বেশি সময় লাগবে না আমার। বাস্তবে তা ঘটেনি। একবারে নয় বরং কয়েক মাস অন্তর অন্তর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছিল।’

অপপ্রচার

হিপনোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষের কম-বেশি ধারণা রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই ঠিক নয় বা অপপ্রচার বলে জানায় আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল হিপনোসিস। এমনই বহুল প্রচারিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হলো রোগীর সামনে হিপনোথেরাপিস্টের পকেট ঘড়ি দোলানো। আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল হিপনোসিসের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেশনে কোনো ঘড়ি দোলানো হয় না। হিপনোথেরাপির সেশনে রোগীকে ধীরে ধীরে পরামর্শ দেন চিকিৎসক। সেশন শেষেও সেসব পরামর্শ ঠিকই মনে থাকে রোগীর।

কীভাবে পাবেন

উন্নত বিশ্বে সাধারণত মানসিক রোগের চিকিৎসক বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা তাদের পরিচিত রোগীদের হিপনোথেরাপিস্টের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার সুপারিশ করেন। এ ছাড়া হিপনোথেরাপিস্টদের ওয়েবসাইট বা তাদের পর্যালোচনা পড়েও অনেকে তাদের শরণাপন্ন হন। হিপনোথেরাপিস্টদের একাংশ আবার ফোনেও বিনামূল্যে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ফোনে রোগী তার লক্ষণ জানালে হিপনোথেরাপিস্ট এ ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দেন। এ বিষয়ে রোগীর উদ্দেশে কাপলানের পরামর্শ, ‘এমন হিপনোথেরাপিস্ট বেছে নেওয়া উচিত যিনি আপনার সমস্যা বুঝে সমাধানের পথ বের করতে আগ্রহী। আমার হিপনোথেরাপিস্ট উদ্বেগ, বিষণœতা ও অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি) বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।’  হিপনোথেরাপিকে রোগ থেকে মুক্তির অত্যন্ত কার্যকর উপায় বলতে রাজি নন কাপলান। তবে তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন মানসিক অসুখে ভোগেন তিনি। অসুখ থেকে মুক্তি পেতে সম্মোহন তার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। প্রয়োজন পড়লে এখনো মাঝেমধ্যে হিপনোথেরাপিস্টের কাছে যান তিনি। কাপলান বলেন, ‘অসুখের শুরুতেই আমার হিপনোথেরাপি নেওয়া উচিত ছিল। তাহলে আরও আগে সুস্থ হয়ে যেতাম। যাদের মানসিক অসুখ রয়েছে, তাদের অবশ্যই একবার হিপনোথেরাপিস্টের কাছে যাওয়া উচিত।’