এবার আমরণ অনশনে শিক্ষার্থীরা|340285|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
এবার আমরণ অনশনে শিক্ষার্থীরা
আবদুল্লা আল মাসুদ, শাবিপ্রবি

এবার আমরণ অনশনে শিক্ষার্থীরা

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেছেন। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে তারা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বসে অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। কর্মসূচিতে ৯ জন ছাত্রী ও ১৫ জন ছাত্র অংশ নিয়েছেন। আর অনশনকারীদের ঘিরে রেখে তাদের কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করে অবস্থান নিয়েছেন আরও কয়েক শ ছাত্র-ছাত্রীরা।

এর আগে গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে অনশনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তারা সারা রাত ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে গতকাল সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান এবং আমরণ অনশন কর্মসূচিতে বসে তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক শিক্ষকের একটি প্রতিনিধিদল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে যান। এ সময় চলমান আন্দোলনে শিক্ষকদের সংহতি আছে কি না, এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেন, যদি উত্তর হ্যাঁ হয় তাহলে আন্দোলনকারীরা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলবেন। এর আগে কোনো কথা বলবেন না তারা। গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত শিক্ষকরা আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেননি। তাই শিক্ষার্থীরাও তাদের কথা বলার সুযোগ দেননি। শিক্ষকরা তখনো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি ছাড়াও শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো হলো- শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ‘ব্যর্থ’ প্রক্টরিয়াল বডি ও ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে হওয়া ‘হয়রানিমূলক’ মামলা প্রত্যাহার এবং ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল।

তবে গতকাল সকালে সাংবাদিকরা উপাচার্যকে তার পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা তিনি মেনে নেবেন। এ ঘটনায় উপাচার্যের যদি কোনো দোষ থেকে থাকে তাহলে তদন্ত কমিটি গঠন হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে তারা তাদের ফিরিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধিরা গালিগালাজ সহ্য করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করছে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার যে ঘটনা ঘটেছে সেটিতে আমি খুবই মর্মাহত। যখন তাদের দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলে আসবে, তখন কে বা কারা পুলিশের ওপর এ হামলা করে তা খতিয়ে দেখা হবে।’

এদিকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্যের অভিযোগ এনে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি অংশ। এ সময় তাদের হাতে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগসংবলিত নানা প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে।

এ সময় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. লায়লা আশরাফুন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষক। আমরা সম্মানের জন্য কাজ করি এবং সম্মানের জন্যই এ পেশায় এসেছি। আমরা চাষাভূষা নই যে আমাদের যা খুশি তা-ই বলবে। আমরা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বিলং করি। আমরা কেমন শিক্ষার্থী তৈরি করছি যে আমাদের নিয়ে যা খুশি তা-ই বলবে।’

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এই অধ্যাপক বলেন, ‘এটি আমরা জানি না। এ হামলা কে বা কারা করেছে, এটি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। রাষ্ট্র এ তদন্তের কাজ করতে পারে।’

গত শনিবারের ওই ঘটনায় ভুল স্বীকার করে সৈয়দ মুজতবা আলী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ আরফিন খান বলেন, ‘আমাদের একটা ভুল হয়ে গেছে। আপনারা ভুলটা খতিয়ে না দেখে ভিসির পদত্যাগে চলে গেলেন। একজন ভিসি যাবেন, আরেকজন ভিসি আসবেন। এ সমস্যাগুলো সমাধান করার প্রক্রিয়ায় আসেন।’

গেটে অবস্থান নেওয়ার আগে শিক্ষকদের একাংশ উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করেন। তবে শিক্ষকদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু শিক্ষক এসব কথা বলছেন। অথচ তারা ভিসির কুরুচিপূর্ণ অডিও ক্লিপ নিয়ে কোনো মন্তব্য করছেন না। তারা আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ১০-১৫ জন শিক্ষক প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন।

ক্যাম্পাসের উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিন্ডিকেট নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল সকালে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা নিশ্চিত করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও কর্মকর্তাদের লাঞ্ছনার অভিযোগ করেছেন বিশ^বিদ্যালয়ের ৬ অনুষদের ডিন। গতকাল এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ করেন তারা।

বিবৃতিতে লাঞ্ছনার কথা উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘বিভিন্ন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় মাননীয় উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী লাঞ্ছিত হওয়ায় আমরা মর্মাহত।’ তবে শিক্ষার্থীরা কখন, কোথায়, কীভাবে তাদের লাঞ্ছিত করেছেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে ভৌত বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রাশেদ তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লাঞ্ছিত শব্দের ব্যাখ্যা ডিকশনারিতে দেখে নিন।’ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ডিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, তারা লাঞ্ছিত বলতে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলাকে বুঝিয়েছেন। তবে, শিক্ষার্থীরা কখন, কোথায়, কীভাবে লাঞ্ছিত করেছেন, এর কোনো উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

গত রবিবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পথ আটকিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে উদ্যত হয়েছেন বলে এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ সময় উপাচার্য ও তার সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা, কর্মচারীরা প্রাণ রক্ষার্থে কোনোক্রমে আইসিটি ভবনে আশ্রয় নেয় বলে দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বিবৃতি দেয় প্রশাসন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও গতকাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ও উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। পুলিশের দাবি, কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য পুলিশ অবস্থান করছে। প্রশাসনের অনুমতি পেলে তারা চলে যাবে।

জাবি ছাত্রীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ শাবিপ্রবি ভিসির কুশপুত্তলিকা দাহ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ছাত্রীদের নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন করা হয়। পরে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন তারা।

শাবিপ্রবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে গত বৃহস্পতিবার আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েকশ ছাত্রী। শনিবার সন্ধ্যার দিকে ছাত্রলীগ হলের ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায়। পরের দিন বিকেলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা ও তাদের লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্যের পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা।