কাজীদার শোকে সাবিনা ইয়াসমিন|340443|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০
কাজীদার শোকে সাবিনা ইয়াসমিন
মাসিদ রণ

কাজীদার শোকে সাবিনা ইয়াসমিন

করোনাকালে অনেক প্রিয়জন হারিয়েছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। এক একজন কাছের মানুষ হারিয়ে তিনি বেদনাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। সব দুঃখ একপাশে রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি আবারও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গত বছরের শেষের দিকে তিনি লম্বা সংগীত সফরও সেরেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানের নিউ ইয়র্ক, অস্টিন, মেরিল্যান্ডসহ ফোবানা সম্মেলন, ঢালিউড অ্যাওয়ার্ড ও চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে অংশ নেন। সব আয়োজন সেরে দেশে ফেরেন গত সপ্তাহে। কদিন যেতে না যেতেই আবার দুঃখ ভর করল তাকে। এবার হারালেন একেবারে পরিবারের সদস্যকে। গত বুধবার না ফেরার দেশে চলে গেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন। কাজীদা নামে পরিচিত এই লেখক সম্পর্কে সাবিনা ইয়াসমিনের বড় বোনের স্বামী। অভিভাবকতুল্য এই মানুষটি হারিয়ে তিনি গভীর শোকে আচ্ছন্ন।

স্মৃতিচারণ করলেন প্রিয় দুলাভাইকে নিয়ে, ‘বড় আপার সঙ্গে দুলাভাইয়ের বিয়ে হয় ১৯৬৩ সালে। আমি তখন বেশ ছোট। আমার বড় নিলুফার ইয়াসমিনও খুব একটা বড় না। আমাদের দুই বোনের কাছে তিনি বাবার পরে বড় ভাইয়ের মতো। আমাদের খুব আদর যতœ করতেন।’

সাহিত্যিক হিসেবে তাকে সবাই জানেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি কেমন ছিলেন? জানতে চাইলে এই বিখ্যাত শিল্পী বলেন, ‘তিনি ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন। আপাদমস্তক ভদ্র মানুষ। লেখালেখির পাশাপাশি তার নানা ধরনের শখ ছিল। খুব ভালো ফটোগ্রাফি করতেন। ছোটবেলায় আমাদেরও ছবি তুলে দিতেন। এই শীতের সময় শিকারে যাওয়ার শখ ছিল তার। তিনি ভোজনরসিকও ছিলেন। খাবারের জন্য সব আয়োজন করে আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমরা রান্নাবান্না করে একসঙ্গে খেতাম। গতকাল যখন তাকে শেষ বারের মতো দেখতে তার বাড়িতে গিয়েছিলাম, বারবার সেই পুরনো স্মৃতিগুলো মনে হচ্ছিল। তাকে দাফন করতে নেওয়ার পর আমি ঘরে ঘিরেছি। এক এক করে সব কাছের মানুষকে হারাতে হচ্ছে। মনটা বড্ড খারাপ।’  

তার কোনো বই পড়ে পেছনের গল্প জানার ইচ্ছে হতো কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে আমি তো খুব ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার পাশাপাশি গান করতাম। একটু বড় হতে না হতেই গানের ভীষণ ব্যস্ততা শুরু হলো। অন্যদের মতো আমি কাজের বাইরে অবসর পেতাম না। তাই তার লেখা খুব পড়তে পারিনি। যা দু একটা পড়েছি আমার খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছে। তবে তা নিয়ে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ কিংবা আলোচনা-সমালোনার সময় সুযোগ হয়নি।’

করোনার প্রভাব আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় সাবিনা ইয়াসমিন এখন ঘরেই সময় কাটাচ্ছেন। সারা দিন নিজের ঘরের নানা ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে দিনের কোনো একটা সময় তিনি ঠিকই রেখে দেন নিজের জন্য। সেই সময়ে তার প্রধান কাজ হলো রেওয়াজ করা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রেওয়াজ না করলে গান গাইব কীভাবে? চারাগাছ যেমন ঠিকমতো পানি না দিলে পরিচর্যা না করলে শুকিয়ে যায়, কণ্ঠও তাই। এজন্য আমি কোনোদিন রেওয়াজ করতে ভুলি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন গানের ব্যস্ততার জন্য দম ফেলার সময় পেতাম না, তখনো অল্প সময়ের জন্য হলেও আমি রেওয়াজ করতাম। কারণ তখন দিনের বেশিরভাগ সময়ই গানের রেকর্ডিং কিংবা স্টেজ, রেডিও, টেলিভিশনে গাইতে হতো। এই যে নানা ধরনের গানে নিয়মিত কণ্ঠ দেওয়া, সেটিও তো এক ধরনের চর্চা। তবে সারগামের সঙ্গে কণ্ঠের চর্চার কোনো বিকল্প নেই।’

এ প্রসঙ্গে তিনি তরুণ শিল্পীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এখনকার বেশিরভাগ শিল্পীকেই দেখি নাম করার জন্যই মনোযোগ। সারা দিন টিভিতে, স্টেজে গাইতে মরিয়া হয়ে থাকে। কিন্তু তাদের কণ্ঠ শুনলে বোঝা যায়, অতটা তৈরি না। তারা যে অল্প বিস্তর শিখে এসে গান করছে তা স্পষ্ট। হয়তো সুযোগ হয়নি। কিন্তু সেই খামতি পূরণ করার জন্য হলেও এখন অনেক বেশি রেওয়াজ করা দরকার। শাস্ত্রীয় সংগীতে দখল আনা দরকার। তবেই তো তার মৌলিক গানগুলো পূর্ণতা পাবে।’

নতুন প্রজন্মের মধ্যে আরেকটি বিষয় এই শিল্পীকে কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, ‘এখন শিল্পীরা নিজেদের গান সেভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ। তাই আমাদের গানই বেশি গায়। তবে তার চেয়ে খারাপ লাগে, যখন দেখি দু একজন বাদে কেউই গানের মূল শিল্পী, সুরকার বা গীতিকারের নামটা পর্যন্ত উল্লেখ করে না। এটা খুবই খারাপ দিক। এ বিষয়ে তাদের যত্নশীল হতে বলব।’